বেনসন-গোল্ডলিফে মিলেছে আরও ‘বিষ’

নিউজ ডেস্ক:

‘ধূমপানে বিষপান’- এই কথাটি বেশ প্রচলিত। কিন্তু থেমে নেই ধূমপান। এবার এই বিষের সিগারেটের তামাকে আরও বেশি বিষের সন্ধান মিলেছে। বহুল প্রচলিত বেনসন অ্যান্ড হেজেস, গোল্ডলিফসহ দেশে বিক্রিতে শীর্ষে থাকা ছয় প্রতিষ্ঠানের সিগারেটের তামাকে উচ্চ মাত্রায় সীসা, ক্যাডমিয়াম ও ক্রোমিয়ামের মতো ক্ষতিকর পদার্থ পাওয়া গেছে। সবচেয়ে বেশি মাত্রায় পাওয়া গেছে ডার্বি ও হলিউড সিগারেটে।

সরকারি সংস্থা নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ দুটি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সিগারেটের নমুনা পরীক্ষা করে এমন ভয়াবহ তথ্য পেয়েছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমনিতেই ধূমপানে স্বাস্থ্যের অনেক ক্ষতি হয়। সেখানে সীসা, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়ামের মতো পদার্থ পাওয়ায় ক্ষতির মাত্রা আরও বাড়বে। শুধু ধূমপায়ীদের নয়, স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে অধূমপায়ীদেরও। ক্যান্সার, হৃদরোগ ও লিভারে সমস্যা বেশি দেখা দেবে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সিগারেটের নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে ও জনগণকে সচেতন করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে চিঠি দিয়েছে।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মাহবুব কবির স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, দেশে উৎপাদিত সিগারেটের তামাক পরীক্ষা করে প্রতি কেজিতে দশমিক ৪৯ থেকে ১০০ দশমিক ৯৫ মিলিগ্রাম লেড বা সীসা, দশমিক ৪০৫ থেকে ১ দশমিক ৩৭ মিলিগ্রাম ক্যাডমিয়াম ও দশমিক ৮২ থেকে ১ দশমিক ৪৯ মিলিগ্রাম ক্রোমিয়াম পাওয়া গেছে। সিগারেটের তামাকে উপস্থিত এসব ভারী ধাতু ধূমপায়ী ও পরোক্ষ ধূমপায়ীদের জন্য কী মাত্রায় ক্ষতিকর তা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্ধারণ করা অতি আবশ্যক। এ বিষয়ে জনগণকে সতর্ক করাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয় চিঠিতে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নাজমানারা খানুম চিঠি পাওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করে ঢাকা টাইমমকে বলেন, ‘আমরা চিঠি পেয়েছি। যেহেতু সিগারেট খাদ্যপণ্য নয়, তাই এটি আমাদের আওতায় পড়ে না। আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ করেছি। তারা বিষয়টি দেখবে। কারণ সচেতন মানুষ হিসেবে এমন ভয়াবহ চিত্র দেখে আমরা চুপ করে থাকতে পারি না।’

জানা গেছে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশের (বিএটিবি) উৎপাদিত ডার্বি, হলিউড, স্টার, গোল্ডলিফ ও বেনসন এবং জাপান টোব্যাকোর নেভি ব্র্যান্ডের সিগারেট সংগ্রহ করে গত ৮ জানুয়ারি ঢাকার পরমাণু শক্তি কেন্দ্রের অ্যানালাইটিক্যাল কেমিস্ট্রি ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার জন্য পাঠায় নিরাপদ খাদ্য র্কর্তৃপক্ষ। পরে গত ১৫ জানুয়ারি ল্যাব টেস্টের রিপোর্ট তৈরি করেন ওই ল্যাবের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও কোয়ালিটি ম্যানেজার ড. শামশাদ বেগম কোরেশি।

মূলত দেশে উৎপাদিত তামাক পাতায় এসব ভারী ধাতুর উপস্থিতি থাকায় তা দিয়ে উৎপাদিত সিগারেটেও এসব ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া গেছে।

একই ব্রান্ডের সিগারেটের নমুনা পরীক্ষা করা হয় বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) ও ওফেন রিচার্জ ল্যাবরেটরি লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানে। তাদের পরীক্ষায় প্রায় একই ধরনের প্রতিবেদন পায় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ।

কোন সিগারেটে কী মিলেছে

ডার্বিতে বিসিএসআইআরের পরীক্ষায় সীসা পাওয়া গেছে ১০০.৯৫ এমজি/কেজি, আর ক্যাডমিয়াম ০. ৪০৫। ভারী ধাতুর সহনীয় মাত্রা ০.০২ এমজি/কেজি।

পরমাণু শক্তি কমিশনের পরীক্ষায় সীসা পাওয়া গেছে ০.৯২ এমজি/কেজি। ক্যাডমিয়ামের সহনীয় মাত্রা ০.০৬ হলেও ডার্বিতে পাওয়া গেছে ১.০৩।

আর ওফেন রিচার্জ ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষায় প্রতি কেজিতে সীসা পাওয়া গেছে ২.১৫ এমজি। যার সহনীয় মাত্রা হলো ০.০১। এই প্রতিষ্ঠানটি গবেষণায় ক্যাডমিয়াম পেয়েছে ০.৫৮। যার সহনীয় মাত্রা হলো ০.০০১।

নেভি সিগারেটে বিসিএসআইআর ভারি পদার্থ পেয়েছে ০.০২৫। আর ক্যাডমিয়াম পেয়েছে ০.৫৬৮। আর পরমাণু শক্তি কমিশনের পরীক্ষার ফল বলছে এই সিগারেটে সীসা মিলেছে যথাক্রমে ১.৭২। এর সহনীয় মাত্রা বলা হয়েছে ০.২। আর ক্যাডমিয়াম (সিডি) পাওয়া গেছে ১.০৮, যার সহনীয় মাত্রা ০.০৬। আর ওফেন রিচার্জ ল্যাবরেটরি তাদের পরীক্ষায় ভারী ধাতু পেয়েছে ২.০৬। ক্যাডমিয়াম পেয়েছে ০.৯৯।

হলিউড সিগারেটে বিসিএসআইআর সীসার অস্তিত্ব পেয়েছে ০.০৫৫। আর ক্যাডমিয়াম পেয়েছে ১.১৩২। পরমাণু শক্তি কমিশনের ফলাফলে সীসা মিলেছে যথাক্রমে ২.২৭। এর সহনীয় মাত্রা থাকার কথা ০.২। আর ক্যাডমিয়াম (সিডি) পাওয়া গেছে ১.১৪। যার সহনীয় মাত্রা হলো ০.০৬। আর ওফেন রিচার্জ ল্যাবরেটরি তাদের পরীক্ষায় ভারী ধাতু পেয়েছে ২.০৪। ক্যাডমিয়াম পেয়েছে ০.৮৬ এমজি/কেজি।

স্টার সিগারেটে বিসিএসআইআর সীসা পেয়েছে ০.০৩৭ এমজি/কেজি। আর ক্যাডমিয়াম পেয়েছে ০. ৭১৯। আর পরমাণু শক্তি কমিশনের পরীক্ষার ফল বলছে এই সিগারেটে ভারি পদার্থ রয়েছে ২.১০। আর ক্যাডমিয়াম (সিডি) পাওয়া গেছে ১.১৭। আর ওফেন রিচার্জ ল্যাবরেটরি তাদের পরীক্ষায় ভারী ধাতু পেয়েছে ২.১৩। ক্যাডমিয়াম পেয়েছে ০.৫৬।

গোল্ডলিফে বিসিএসআইআর সীসা না পেলেও ক্যাডমিয়াম পেয়েছে ০.৬৯৫। আর পরমাণু শক্তি কমিশনের পরীক্ষায় এতে সীসা মিলেছে ১.৮৩। এর সহনীয় মাত্রা থাকার কথা ০.২। আর ক্যাডমিয়াম (সিডি) পাওয়া গেছে ০.৯৫, যার সহনীয় মাত্রা হলো ০.০৬। ওফেন রিচার্জ ল্যাবরেটরি তাদের পরীক্ষায় ভারী ধাতু পেয়েছে ২.২৬ আর ক্যাডমিয়াম পেয়েছে ০.৬৪।

বেনসনে বিএসআইআর সীসা না পেলেও ক্যাডমিয়াম পেয়েছে, যার পরিমাণ ০.৮৫০ এমজি/কেজি। তবে সীসার অস্তিত্ব পেয়েছে পরমাণু শক্তি কমিশন। যার পরিমাণ ০.৪৯। আর ক্যাডমিয়াম (সিডি) পাওয়া গেছে ০.৯৩। ওফেন রিচার্জ ল্যাবরেটরি তাদের পরীক্ষায় এটিতে সীসা পেয়েছে ২.১৬ আর ক্যাডমিয়াম পেয়েছে ০.৫৪ এমজি/কেজি।

বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন

স্বাস্থ্যখাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিগারেটের তামাকে ভারি ধাতু থাকলে তা ক্যান্সারসহ হৃৎপি- ও যকৃতের রোগ সৃষ্টি করতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে থাকেন পরোক্ষ ধূমপায়ীরা।

বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির যুগ্ম সম্পাদক গোলাম মহিউদ্দিন ফারুক বলেন, ‘একটি সিগারেট তৈরিতে প্রায় ৪ হাজার ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে কিছু কিছু রাসায়নিক সরাসরি ক্যান্সার সৃষ্টির জন্য দায়ী। তামাকে যদি সীসা, ক্রোমিয়ামসহ অন্যান্য ভারি ধাতু পাওয়া যায়, তবে তা জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির মাত্রা বহুগুণ বাড়াবে।’

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশপনের চিকিৎসক সোহেল রেজা চৌধুরী ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘সিগারেটে ভারী ধাতুর উপস্থিতি থাকলে তা রক্তে মিশে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। আর ছোটদের মেধা বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। সিগারেটের নিকোটিনের সঙ্গে পাওয়া ক্যাডমিয়াম হার্টের ক্ষতি করে। ভারী ধাতু ও ক্যাডমিয়াম দুটোই ক্যান্সার তৈরির বড় কারণ হতে পারে।’

(Visited 27 times, 1 visits today)