করোনা ভাইরাস সংক্রমনঃ আমরা কতটা প্রস্তুত

মোঃ নূরন্নবী ইসলাম

বাংলাদেশে ইতোমধ্যে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত তিন জনকে সনাক্ত করা হয়েছে। বিশ্বের ১০০ টির ও বেশি দেশ এটিতে আক্রান্ত হয়েছে। পরাক্রমশালী প্রায় সবগুলো দেশেই এটি ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে ইরান, ইতালি, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ায় ভাইরাসটি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এটি মোকাবেলায় ৮ বিলিয়ন ডলারের ফান্ড গঠন করেছে। অস্ট্রেলিয়া ১৬০ কোটি ডলার বরাদ্দ করেছে। এর পরেও উন্নত দেশগুলো এটি মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছে। কেননা ভাইরাসটি অতিমাত্রায় সংক্রামক । এতো উন্নত হওয়া সত্ত্বেও পরিস্থিতি বিবেচনায় অনেক দেশেই জরুরী অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে । ইতোমধ্যে এটিকে বৈশ্বিক মহামারী ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। বাংলাদেশেও এটির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশের মতো অত্যান্ত জনবহুল একটি দেশে এটি মোকাবেলা কতটা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। অবকাঠামোগত, অর্থনৈতিক, সামাজিক অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে আমাদের। এটি মোকাবেলায় এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিষেধক নেই। এটির চিকিৎসা এখন পর্যন্ত আইসোলেশন, অবজারভেশন ও ইমার্জেন্সি হলে আইসিইউ এ ভেন্টিলেশন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। তাই এটি আমাদের দেশে ছড়িয়ে পড়লে তা হবে অত্যান্ত ভয়ের। এ ভাইরাসটি পুরো পৃথিবীতেই একটা সংকটময় পরিস্থিতি তৈরী করেছে। ডাক্তার, হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার থেকে শুরু করে সবাই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অত্যান্ত সংক্রামক হওয়ায় এটির চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত অবকাঠামো দরকার । বিশেষজ্ঞরা মতামত দিয়েছেন বাংলাদেশের সব হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করলে করোনার বিস্তার আরো মারাত্মক আকার ধারণ করবে। করোনা এমন একটি রোগ যা সব পেশা ও শ্রেণির মানুষের মধ্যে এমনকি ডাক্তার ও নার্সরাও রেহাই পাচ্ছে না এ ভাইরাস থেেেক। তাদের ব্যবহৃত চিকিৎসা উপকরনের মাধ্যমেও ছড়াচ্ছে এ ভাইরাস।

বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর অবস্থাটা আমাদের সবারই জানা। সব সময় রোগীর উপচে পড়া ভিড় থাকে সেখানে। সেক্ষেত্রে বিশেষায়িত হাসপাতালের এদের চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখতে হবে। গণমাধ্যম থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে ঢাকায় ৩ টি হাসপাতালে মোট ৪০০ বেড প্রস্তুত রাখা হয়েছে আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য। ১৭ কোটি মানুষের দেশে ৪০০ বেড কতটা প্রস্তুতির মধ্যে পরে সেটা ভাববার বিষয়। ইতালি, দক্ষিণ কোরিয়াতে আমরা দেখেছি কত দ্রুত এ ভাইরাস ছড়িয়ে পরছে। আমাদের সীমিত সক্ষমতায় সর্বোচ্চ কত হাজার মানুষকে সঠিকভাবে আইসোলেশনে রেখে ট্রিটমেন্ট দেয়া সম্ভব সেটি ও ভাববার বিষয়। তাই ফোকাস যে জায়গাটিতে গুরুত্ব দেয়া জরুরি সেটি হলো প্রতিরোধ। আমাদের সব মহল থেকে শক্ত প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরী করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে সরকারকে। সংক্রমণের হার বেড়ে গেলে চিকিৎসার মাধ্যমে এটি কে মোকাবেলা করা সক্ষমতা আমাদের নেই, অবকাঠামোগত সীমাদ্ধতা, সীমিত ডাক্তার ও হেলথ সার্ভিস প্রোভাইডার, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতাকে মাথায় নিয়ে আমাদের সবধরণের প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে যাতে এটি আমাদের দেশে মহামারী আকার ধারণ না করে। আমরা যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব করে ফেলি, তাহলে মহাবিপদ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে সামনে।

ইউএসএ’র মতো দেশ যেখানে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে, ইউরোপের সঙ্গে সব ধরণের যোগাযোগে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, সেখানে আমাদেরও এটিকে নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে। আরও একটি ব্যাপার লক্ষনীয়, যে পরিস্থিতিতে তারা এ সিন্ধান্তগুলো নিচ্ছে, আক্রান্ত লোকের সংখ্যা ও মৃত্যের হার বিবেচনায় এ সিন্ধান্তগুলো ইউএসএ আরও পরে নিলেও পারতো। তারা ও কিন্তু যথেষ্ট সচেতন, পর্যাপ্ত প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেয়ার পরও এটি ছড়াচ্ছে। এ ছাড়াও তাদের সক্ষমতার বিষয়টিও আমাদের উপলবিাধর বিষয়। সময়ের একফোঁড় অসময়ের দশফোঁড় এটি বোধহয় বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় সত্য।

সরকার ইতিমধ্যে গণজমায়েত নিষিদ্ধ করেছে, মুজিববর্ষের অনুষ্ঠান কে সীমিত করার সিন্ধান্ত নিয়েছে, বিমানবন্দরগুলোতে নজরদারী আগের তুলনায় বাড়িয়েছে, এগুলো প্রসংশনীয় উদ্যোগ। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে খোলা রাখার বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট ভাববার সুযোগ আছে বলে মনে করা যেতেই পারে।। কেননা এগুলো একপ্রকার গণজমায়েতের মধ্যে পড়ে। তাছাড়া অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে গণরুমে ১০০ জনের ও অধিক একসাথে থাকে। শ্রেণীকক্ষেও ১০০ জনের ক্লাস একসাথে নিতে হয়। এরকম পরিস্থিতিতে এটিকে বিবেচনায় নেয়ার দরকার। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকতেই দেশের সব স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি কে ১৫ দিনের জন্য সাময়িক বন্ধ করে অবর্জাভ করা উচিত। যদি দেশের পরিস্থিতি ভালো থাকে, তবে পুনরায় ক্লাস শুরু হবে। এতে দেশের অর্থনীতিতে বিশেষ কোন প্রভাব পড়বে না কিন্তু কোনভাবে একজন আক্রান্ত হলে যে কিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকে, সেটি ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগবে না।

সেই সাথে এয়ারপোর্ট ও স্থলবন্দরগুলোতে সর্বোচ্চ নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি । অতিদ্রত করোনা আক্রান্ত দেশসমূহে সাময়িক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা জরুরি। দেশের মানুষের নিরাপত্তার কথা ভেবে করোনা আক্রান্ত দেশগুলো থেকে যারা ফিরছেন আগামী দু সপ্তাহ কোনো বিশেষ জায়গায় তাদের কোয়ারাইন্টাইনে এ রাখা। বিভিন্ন চেক পয়েন্টগুলোতে বিদেশ থেকে আগতদের প্রপার চেকিং নিশ্চিত করা, তাদের মেডিকেল হিস্ট্রি নেয়াও গুরুত্বপূর্ণ। দেশের মিনিমাম ৫০০ ডাক্তার ও নার্স কে করোনা ভাইরাসের চিকিৎসার জন্য বিশেষভাবে প্র¯তুত রাখা। এরা শুধুু তাদের চিকিৎসায় নিয়োজিত থাকবে। এক প্রকার তারাও আইসোলেশনে থাকবে। তাদেরও আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে কেননা রোগীকে প্রথম রিসিভ তাদের করতে হয়। তাদের জন্য প্রপার প্রটেকশন সামগ্রী প্রস্তুত করে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। তাদের জন্য নিয়োজিত ডাক্তাররা অন্য রোগীদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে সংক্রমণের পসিবিলিটি বেড়ে যায় । কয়েকটি হাসপাতালকে বিশেষায়িত ঘোষণা করে আক্রান্তদের চিকিৎসা শুধু ওগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত। সবোর্”চ কত মানুষকে আমরা আইসোলেশনে চিকিৎসা সেবা দিতে পারবো, আমাদের সক্ষমতা কত এবং কোন কোন হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা হবে এগুলোর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার সময় এখনই। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের কাছে এটি প্রতিরোধের কোন বিকল্প নেই।

গতবছর আমরা ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখেছি। কতটা ভয়ানক পরিস্থিতি তৈরী হতে পারে সেটি অবলোকন করেছি। এ বছরও ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়বে বলে মত দিয়েছেন বিশেজ্ঞরা। নতুন যুক্ত হয়েছে করোনা সংক্রমন। সরকারকে একসঙ্গে দুটো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হতে পারে। যেখানে বিশ্বের পরাশক্তি দেশগুলোর সরকার হিমশিম খাচ্ছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে, সেখানে শত সীমাবদ্ধতার এ দেশে শুধু রাষ্ট্র যন্ত্রের উপর নির্ভরশীল না হয়ে প্রত্যেক নাগরিককে স্ব-স্ব অবস্থান থেকে কাজ করে যেতে হবে। নাগরিক সচেতনতাই এ দুটি সংকট মোকাবেলায় সবচেয়ে গুরুত্বর্পূণ।

লেখকঃ মোঃ নূরন্নবী ইসলাম, লেকচারার, এ্যানিমেল সায়েন্স বিভাগ
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ
ইমেইলঃ sagor.as@bau.edu.bd

(Visited 270 times, 1 visits today)