একজন আগামী দিনের কৃষিবিদের খোলা চিঠি

ফিরোজ কবির কিরণ:
গত চার বছর আগে ২০১২ সালে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বি.এসসি.এজি(অনার্স) কোর্সে ভর্তি হয়েছিলাম বাংলাদেশের কৃষি ক্ষেত্রকে কিছু দেয়ার জন্য। মোটামুটিভাবে একজন কৃষিবিদ হয়ে বেড়িয়ে যাব আর কয়েকদিন পরেই। কিন্তু যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের একজন ছাত্র হিসেবে যাত্রা শুরু করি তখন শুরুতেই প্রচন্ড হোঁচট খাই। যখন দেখি বাংলাদেশের স্বনামধন্য বীজ, সার, এবং কীটনাশক কোম্পানিগুলো একটা পর্যন্ত লিফলেটও দেয় না আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে। শুধু দেখি কয়েকটা রঙ বেরঙের পোস্টার ঝুলে আমাদের ডিপার্টমেন্টের ল্যাবগুলোতে। তাদের উৎপাদিত পণ্যের নাম মুখস্থ করা ছাড়া কোন চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা নেই।

তত্ত্বীয় ক্লাস বাদে ব্যবহারিক ক্লাসেও তাত্ত্বিক পড়ালেখার ছড়াছড়ি। আমি শুধুমাত্র আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলছি তার মানে এই নয় যে, শুধু এখানেই এইরকম করুণ অবস্থা।ভালভাবে অনুসন্ধান করলে দেশের বেশিরভাগ কৃষি বিষয়ক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেই মোটামুটিভাবে একই সমস্যা চোখে পড়বে। বাংলাদেশের অন্যান্য কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ না হলেও, তবে এটা জানি যে, বাংলাদেশের একটা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়েও এবং কৃষিপ্রধান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও চার বছর মেয়াদী বি.এসসি.এজি (অনার্স) কোর্সের কারিকুলামে কোন ইন্টার্নশীপ নামক শব্দটা নাই। শুধু আছে মাঠ ও গবেষণাগার পরিদর্শন নামক একটা বিষয়।

কেন আমরা কি টেকনিক্যাল গ্রাজুয়েট নই? বাংলাদেশে মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং, ভেটেরিনারি ইত্যাদি সেক্টরে ইন্টার্নশীপ/ইন্ডাস্ট্রিয়াল এটাচমেন্ট রাখা হলেও আমাদেরটা এড়িয়ে যাওয়া হয় সব সময়। তবুও আশাবাদী হই, যখন দেখি প্রস্তাবিত খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্সে ইন্টার্নশীপ দেয়ার ব্যবস্থা থাকবে।তবুও বাংলাদেশের স্বল্প সম্পদ আর অনেক বাধাবিপত্তি পেড়িয়ে এদেশের গবেষকরা পুরো বিশ্বকে মাঝে মাঝে চমকে দেয়।প্রচন্ড কষ্ট পাই যখন দেখি একজন কৃষি গ্রাজুয়েট চার বছর মেয়াদী বি.এসসি.এজি(অনার্স) কোর্স কমপ্লিট করার পরও অনেক কৃষিবিদ নামের সামনে এই সম্মানজনক কৃষিবিদ বিশেষণটা লিখতে ভুলে যান। কিন্তু ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার কিন্তু কখনোই সেটা ভুলেন না। অনেক উচ্চশিক্ষিত মানুষগুলোও মনে করে কৃষিবিজ্ঞান মানবিক শাখার একটি বিষয়।

মাঝে মাঝে তাই বিব্রতকর অবস্থাতেও পড়তে হয়।কেন আমরা বাংলাদেশের প্রতিটা কৃষিবিদ যদি বাড়ির সামনে যদি কৃষিবিদ অমুক,কৃষিবিদ তমুক নামক একটা সাইনবোর্ড ঝুলায় রাখতেন। তাহলে বাংলাদেশের কৃষিশিক্ষার সূচনালগ্নের এতবছর পরেও একজন কৃষিবিদ হয়েও মানুষকে বোঝানো লাগতো না, কৃষিবিদের কাজ আসলে কি?

আমাকেও প্রচন্ড ভাবায় বিষয়গুলো। আমি আসলে আমার আগামীদিনের পরিকল্পনাগুলো সবাইকে বললাম। অনেকেই নিজের পরিকল্পনা অন্যদের সাথে শেয়ার করতে চান না, পাছে তার আগে অন্যকেউ তার মেধাস্বত্ত্ব দাবি করে বসে। তবে আমি আমার স্বপ্নগুলোর কথা সবাইকেই বলতে চাই। গণপ্রজাতন্ত্রীতা বাংলাদেশ সরকারের কৃষি মন্ত্রনালয় ও শিক্ষা মন্ত্রনালয় বাংলাদেশের কৃষি গবেষণা, শিক্ষা এবং সম্প্রসারণের কাজে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে এবং আগামীতেও নিবে আশা করি। অনেক সরকারী এবং বেসরকারী সংস্থা অনেক প্রকল্পও হাতে নিচ্ছে। তবে এখানে উল্লেখ্য যে, আরডিআরএস নামক এনজিও কিছু সংখ্যক শিক্ষার্থীকে তাদের প্রকল্পগুলোতে ইন্টার্নশীপের সুযোগ দিচ্ছে।

তবে বাংলাদেশের সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি যদি স্বনামধন্য বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিম্নলিখিত উদ্যোগগুলো নিত। তবে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মত আমাদের কৃষকরাও স্বাবলম্বী কৃষকে পরিণত হত।

নিচে আমার ব্যক্তিগত কিছু মতামত দিলাম। যদি কারও কোনদিন ইচ্ছা হয়, তবে এগুলো উপরমহলে জানাতে পারেন।

১)বাংলাদেশের প্রতিটা গ্রামে একটা করে প্লান্ট ডিজিজ ক্লিনিক থাকবে। যেখানে কৃষকরা তাদের ফসলের রোগবালাই সম্বন্ধে কৃষিবিদদের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে যেত।

২) বাংলাদেশের প্রতিটা বড় বড় শহরে একটা করে অত্যাধুনিক প্লান্ট ডায়াগনস্টিক ল্যাব থাকবে। যেখানে কনসালট্যান্ট এবং বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা থাকবে, যারা কৃষকদেরকে পরামর্শ দিবেন। তাছাড়াও অত্যাধুনিক ল্যাব ফ্যাসিলিটি থাকতো, যেখানে ফসলের রোগ নির্নয়ের পাশাপাশি প্রতিনিয়ত গবেষণা হত।

৩) তাছাড়াও বাংলাদেশে একটা পূর্ণাঙ্গ টিভি চ্যানেল দরকার যেটা পুরোটাই থাকবে কৃষি ও কৃষিসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে।

তবে অত্যন্ত আনন্দের বিষয় বাংলাদেশের অনেক টিভি চ্যানেল ইতিমধ্যেই কৃষি সংবাদ নামক বিষয় রাখছে। তাছাড়াও বিভিন্ন সরকারি এবং বেসরকারি টিভি চ্যানেলে মাটি ও মানুষ, হৃদয়ে মাটি ও মানুষ, শ্যামল বাংলা ও সবুজ বাংলা নামক জনপ্রিয় অনুষ্ঠান প্রচারিত হচ্ছে।

তবে এখানে উল্লেখ্য যে, কৃষি বিষয়ক প্রিন্ট এবং অনলাইন গনমাধ্যমের ক্ষেত্রে আমরা অনেকদূর এগিয়েছি। দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অন্তঃত একটি করে কৃষিভিত্তিক দৈনিক, সাপ্তাহিক কিংবা মাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়।আর অনলাইন গনমাধ্যম সহ সকল গনমাধ্যমকে নিয়ে সরকারের পূর্নাঙ্গ নীতিমালা তৈরি করা প্রয়োজন।

৪) বাংলাদেশের প্রতিটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি সাংবাদিকতার উপর বিভিন্ন কোর্স খোলা যেতে পারে। যেখান থেকে শত শত আগামী দিনের শাইখ সিরাজ এবং নিয়াজউদ্দিন পাশার মত বিখ্যাত কৃষি সাংবাদিক জন্ম নিবে।

আমার মনে হয়, এই কাজগুলো করলে বাংলাদেশের কৃষিক্ষেত্রে যে পরিবর্তনটা হবে, সেটা আমাদের বাংলাদেশকে আগামীতে খাদ্য নিরাপত্তা দেবার পাশাপাশি কৃষকদের স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে ব্যাপক সহায়ক হবে।

_______________________________
ফিরোজ কবির কিরণ
কৃষি সাংবাদিক ও শিক্ষার্থী, হাবিপ্রবি, দিনাজপুর।
ইমেইলঃ- kiron.ag.hstu@gmail.com

Comments

comments