সারা বছর মিলবে বশেমুরকৃবি উদ্ভাবিত ‘উফশী লাউ’

নিজস্ব প্রতিবেদক:
গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা উদ্ভাবন করেছেন সারা বছর চাষযোগ্য জনপ্রিয় সবজি লাউ। বিইউ হাইব্রিড লাউ-১ নামে উদ্ভাবিত এই জাতটি ইতোমধ্যে কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। নতুন উদ্ভাবিত এই লাউ অল্প জমিতে চাষযোগ্য, রোগ সংক্রমণ কম এবং উৎপাদন বেশি হওয়ায় সবজির চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে দাবি করছেন বিজ্ঞানীরা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. এ কে এম আমিনুল ইসলাম দীর্ঘ ৮ বছর গবেষণার পর বিইউ হাইব্রিড লাউ-১ ও বিইউ লাউ-১ নামের লাউয়ের দুইটি নতুন জাত উদ্ভাবন করেছেন। সুস্বাদু এই লাউ ফসলের আধুনিক ও বাণিজ্যিক চাষাবাদের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে আসবে বলে দাবি করেছেন এই উদ্ভাবক। উচ্চফলনশীল এই জাত দুটির মধ্যে একটি হাইব্রিড এবং অন্যটি উন্মুক্ত পরাগায়িত (ওপি)। দুটিরই ফলনের তুলনায় অঙ্গজবৃদ্ধি খুব কম, যা আধুনিক বা স্মার্ট কৃষির জন্য একেবারে লাগসই। তাছাড়া পুং ও স্ত্রী ফুলের অনুপাত কম হওয়ায় গাছে খাদ্যের যে যোগান দেওয়া হয় সরাসরি ফলোৎপাদনে ব্যবহার হয়। এতে অন্যান্য প্রচলিত জাতের তুলনায় অপচয় কম হয় এবং ফল কম ঝরে পড়ে।

নতুন উদ্ভাবিত জাত দুটি চাষাবাদে খরচ এবং রোগ সংক্রমণের হার কম হওয়ায় অনেক চাষি এই লাউ চাষে ঝুঁকছেন। তারা বলছেন, এই লাউ পোকামাকড় দ্বারা তেমন আক্রান্ত হয় না, অন্যান্য লাউয়ের তুলনায় অধিক ফলন হয়।

উদ্ভাবক আমিনুল ইসলাম বলেন, হাইব্রিড জাতটি আলোক অসংবেদনশীল হওয়ায় সারা বছরই চাষযোগ্য, খেতে খুব সুস্বাদু এবং গ্রীষ্মকালীন স্বাদেও খুব একটা হেরফের হয় না। দেশীয় লাউয়ের মতো জনপ্রিয় হালকা সবুজ বর্ণের লাউ প্রতি গিঁটে গিঁটে ধরে। ফলের গড় ওজন ৩-৪ কেজি। বিইউ লাউ-১ জাতটির বৈশিষ্ট্য হলো এর ফলগুলো ছোট (১.০-১.২ কেজি ওজনের) যা বর্তমান আধুনিক সমাজের খুদে পরিবারগুলোর চাহিদার সঙ্গে মানানসই। সচরাচর লাউয়ের ফল বেশ বড় হওয়ায় এক বেলার জন্য কেটে রান্না করে বাকিটা পরের বেলার জন্য রেখে দিতে হয়, যার স্বাদ ও গুণাগুণ অনেক সময় নষ্ট হয়ে যায়। যা এই জাতের লাউয়ের ক্ষেত্রে এড়ানো সম্ভব।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. গিয়াস উদ্দিন মিয়া বলেন, কম জায়গায় বেশি ফলন উপযোগী এ জাত দুটো বাড়ির উঠোনে বা আঙিনায় এমনকি ভবনের ছাদেও সফলভাবে চাষ করা যাবে। দরিদ্র জনগোষ্ঠী এ লাউ চাষ করে নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে সারা বছর বাজারে বিক্রি করে সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবে।

অঙ্গজ আকৃতির দিক থেকে এই দুটি জাতের লাউগাছ ছোট হওয়ায় এবং গাছের একেবারে গোড়া থেকে ডগা অবধি ফল ধরায় এটি ছাদকৃষি বা ভার্টিক্যাল এগ্রিকালচারেও অত্যন্ত সাফল্যজনকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে। এতে সবজি উৎপাদন বহুগুণ বাড়বে বলে মনে করছেন তিনি। তিনি আশা করছেন বিএডিসির মাধ্যমে দ্রম্নত এ জাত দুইটি দেশে ছড়িয়ে যাবে।

গবেষক জানান, সারা বছর চাষযোগ্য বিইউ হাইব্রিড লাউ-১ চার মাস অন্তর অন্তর বীজ বপন করে সারা বছর চাষাবাদ করা যায়। প্রতিটি গাছে ২৫-৩০টি করে লাউ ধরে যা খেতে অত্যন্ত সুস্বাদু। তবে বিইউ লাউ-১ জাতের বীজ লাগাতে হয় সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে। চারা উৎপাদনের ৪০-৪৫ দিন পর চারা থেকে ফুল দেওয়া শুরু হয়। এতেও প্রতি গাছে ২৫-৩০টি করে লাউ ধরে। কৃষক পর্যায়ে চাষ হচ্ছে এ জাত দুইটি।

গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার টোক এলাকার কৃষক কামরুজ্জামান সবুর জানান, ১৭ শতাংশ জমিতে তিনি ওই দুই জাতের লাউ চাষ করেছেন। চলতি মৌসুমের এ সময়ে তিনি ৬০ হাজার টাকার লাউ বিক্রি করেছেন। এখন ফলন দিচ্ছে। অল্প জমিতে অল্প খরচে এ লাউয়ের ফলন অনেক বেশি। এ লাউ চাষ করে হতদরিদ্ররা সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে পারেন এবং দেশে সবজির ক্রাইসিস কমাতে ভূমিকা রাখতে পারেন।

লাউ ছাড়াও গবেষক এ কে এম আমিনুল ইসলাম চেরি টমেটো, বিভিন্ন রঙের ও আকারের উফশী শিম, ভুট্টা, বিভিন্ন আকার ও রঙের মিষ্টিকুমড়ার উন্নত জাতের লাইন নিয়ে কাজ করছেন। বর্তমানে এসব নিয়ে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্লটে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন।

  •  
  •  
  •  
  •