ঝড়ে পড়া আম নিয়ে বিপাকে চাষীরা, প্রয়োজন জরুরী উদ্যোগ

সাইদুর রহমান ও শরফ উদ্দিন

সুপার সাইক্লোন আম্পানের তাণ্ডবে দেশের বিভিন্ন স্থানে আমের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ে গাছ থেকে পড়ে গেছে অনেক আম। আম্পান পরবর্তী দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাঝারি ঝড়ে বেশকিছু এলাকার অধিকাংশ আমই পড়ে গেছে। এসব আম নিয়ে বিপাকে পড়েছেন চাষীরা। একে তো করোনার চাপ তার উপর আম্পানের নারকীয় তান্ডব। এ যেন মরার ওপর খাঁড়ার ঘা।

চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে, করোনায় আক্রান্ত হলে তা থেকে রেহাই পাবার মূল হাতিয়ার হলো শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যা দিয়ে করোনাকে পরাজিত করা যায়। এ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য পুষ্টিগুণ সম্পন্ন খাদ্য গ্রহণে ব্যাপক প্রচার চালানো হচ্ছে। বাংলাদেশে নানা ধরণের দেশী ফলমূল রয়েছে যার মধ্যে আম, কলা, আনারস, তরমুজ, পেয়ারা, বড়ই, প্রভৃতি অন্যতম যেগুলো থেকে প্রচুর পরিমাণ পুষ্টি পাওয়া সম্ভব।

বাঙালির নিকট বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মধুমাস হিসেবে পরিচিত। এ মাসে প্রচুর দেশী ফল বাজারে আসবে। তবে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে পছন্দের ফল হলো আম যাকে ফলের রাজা বলা হয়। আমে প্রচুর পুষ্টিগুন রয়েছে। প্রতিদিন জনপ্রতি ২০০ গ্রাম করে আম খাওয়ার প্রয়োজন থাকলেও আমরা গ্রহণ করি মাত্র ৮২ গ্রাম। মে মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে পর্যায়ক্রমে বাজারে আসা শুরু হয়েছে সাতক্ষীরা অঞ্চলের গোবিন্দভোগ আম দিয়ে। এর পরই বাজারে আসবে গোপালভোগ, হিমসাগর, খিরসাপাত, ল্যাংড়া, বারি আম-২, ফজলি, বারি আম-৩, বারি আম-৪ এবং আশ্বিনা আম দিয়ে মৌসুম শেষ হবে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ, রংপুর, মেহেরপুর, সাতক্ষীরা এবং পার্বত্য জেলাগুলোসহ ২৩ জেলায় বানিজ্যিকভাবে আম চাষাবাদ হয়ে থাকে এবং উল্লেখিত জেলাগুলোর ৪১,৬৭৬ হেক্টর এলাকায় ১২.৮৮ লক্ষ মেট্রিক টন আম উৎপাদন হয় যার বাজারমূল্য আনুমানিক ১০-১২ হাজার কোটি টাকা (বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, ২০১৯)। আম্পানে মোট আম উৎপাদনের প্রায় ১৫-২৫ শতাংশ ঝরে পড়ে গেছে। বেশি ক্ষতি হয়েছে সাতক্ষীরা, খুলনা ও নাটোর জেলায়। বিবিএস এর মতে আম্পানে পড়া আমের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২.৫ লক্ষ মেট্রিক টন। তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অনুমান প্রায় ৪ লক্ষ মেট্রিক টন আম ঝরে পড়ে গেছে। যার ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ১০০-১৬০ কোটি টাকা। উক্ত আম বাজারজাত করা নিয়ে বাগান মালিক ও আম ব্যবসায়ীরা এখন দিশেহারা এবং উদ্বিগ্ন।

বিভিন্ন জেলায় উৎপাদিত পাকা আম সারা দেশে বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, ফেনী, কুমিল্লায় বাজারজাতকরণ করা হয়ে থাকে। আম উৎপাদনের পর তা সংগ্রহ করে স্থানীয় আড়তে জমা করা হয় এবং সেখান থেকে এজেন্ট বা কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ট্রাক, বাস, ট্রেন, কাভার্ডভ্যান, ভডভডি ও খোলা ভ্যানে করে আমের বাজার তথা বিভিন্ন জেলায় পৌঁছানো হয়। তবে সবচেয়ে বেশি আম পৌছানো হয় রাজধানী ঢাকায়। করোনার কারণে গণপরিবহণ বন্ধ থাকায় ঝরে পড়া আম বাজারজাতকরণে অসুবিধা হচ্ছে। আম প্রক্রিয়াজাত করা বড় বড় কোম্পানীগুলোও করোনার দোহাই দিয়ে আম্পানে পড়া আম ক্রয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে না।

আম প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে না আসলে ব্যক্তি পর্যায়ে উক্ত আমের মাত্র ১০-১৫ শতাংশ দিয়ে আচার, আমসত্ত, আমচুর তৈরি আর কিছু হয়তো তরিতরকারিতে ব্যবহার হবে। বাকী ৮৫-৯০ শতাশ আমই পঁচে যাবে। আর তাই বাগান মালিকদের মাথায় বাজ পরার মতো অবস্থা হয়েছে। এ অবস্থা নিরসনে তারা সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করছে। যথাবিধি ব্যবস্থা দ্রুত গ্রহণ করতে না পারলে এসব আম নষ্ট হয়ে যাবে, ক্ষতিগ্রস্থ হবে চাষী ও আম ব্যবসায়ীরা।

ঝড়ে পড়া আম ট্রাকপ্রতি এক থেকে দেড় হাজার টাকাতেও বিক্রি করতে পারছেন না কেউ কেউ। আম উৎপাদনকারীরা দাবি করেছেন, সরকার যদি তড়িৎ গতিতে ফল প্রক্রিয়াজাতকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে ঝড়ে পড়া আমগুলো কিনে নেয়ার ব্যবস্থা করতে পারে তাহলে তাদের দুর্দশা কিছুটা হলেও কমবে। বিশেষ এই পরিস্থিতিতে এই বিপুল পরিমান আমের সুরাহা করতে হলে আম প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসার ব্যবস্থা করানোর বিকল্প কিছু নেই।

 

 

ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে স্থানীয় প্রশাসন একটি স্থান নির্বাচন করে আম উৎপাদনকারীদের আহ্বান জানাতে পারে সেখানে ঝড়ে পড়া আম নিয়ে যেতে এবং ফল প্রক্রিয়াজাতকারী শিল্পগুলোকে সেখানে ডাকতে পারে সেই আমগুলো কিনে নেবার জন্য। এছাড়া অনলাইনে প্লাটফরম তৈরি করে আম বিক্রি করা যেতে পারে।

শহরের মানুষ কাঁচা পাঁকা উভয় আমই ক্রয় করে থাকেন। স্থানীয় শহরগুলোতে সরবরাহ করতে পারলেও কিছুটা আর্থিক অর্জন হবে।

এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার কৃষি মন্ত্রনালয়ের নেতৃত্বে একটি কমিটি করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। উক্ত কমিটিতে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের একজন মেম্বর-ডিরেক্টর, বাংলাদেশ কৃষি গবেষনা ইনস্টিটিউটের ফল গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক, আম বিশেষজ্ঞ, আম ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি, আম বাগান মালিক সমিতির প্রতিনিধি, আম প্রক্রিয়াজাতকারীদের প্রতিনিধি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি সদস্য হিসেবে থাকতে পারেন। উনারা একত্রে বসে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে আম প্রক্রিয়াজাতকারীদেরকে উক্ত আম ক্রয়ের ব্যবস্থা করাতে পারে। কোম্পানীগুলো এ আম ব্যবহার করে আমের জুস, আচার এবং অন্যান্য দ্রব্য প্রস্তত করতে পারবে।

করোনাকালীন আম প্রক্রিয়াজাতকারীদের আম পরিবহণের অনুমতিসহ বাড়তি কোন সুবিধার প্রয়োজন হলে সরকার তাতে সহযোগিতা করতে পারে। প্রতিবছরই কিছুনা কিছুপ্রাকৃতিক দুর্যোগে আম ক্ষতিগ্রস্থ হয় এবং সেগুলো সংরক্ষণের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে কিছুদিন সংরক্ষনের জন্য হিমাগার তৈরি করা যেতে পারে। এবছর বাকি আম শিঘ্রই বাজারে আসবে সেজন্য আম ব্যবসায়ীরা যেন স্বাস্থ্য বিধি মেনে নির্বিঘ্নে আম সংগ্রহ ও পরিবহণ করতে পারে তারজন্য সরকারের আশু ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। এছাড়া আম পরিবহণের গাড়িগুলো চলাচলে অনুমতি দেয়া, আমের আড়ত ও এজেন্ট এবং কুড়িয়ার সার্ভিসগুলো চালু রাখার ব্যবস্থা করা আবশ্যক। অন্যথায় উল্লেখিত জেলাগুলোর ক্ষতিগ্রস্ত বাগান মালিক এবং আম ব্যবসায়ীদেরও বিশেষ প্রণোদনা প্রদানের যৌক্তিক দাবী উঠবে।

এছাড়া দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা হিসেব আমের সংরক্ষনাগার ও বিপণন ব্যবস্থা উন্নত করা এবং রপ্তানি বাড়ানো প্রয়োজন। প্রক্রিয়াজাত কৃষির জন্য বিশেষায়িত অধিদপ্তর করে অঞ্চলভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প কারখানা বাড়ানো যেতে পারে। প্রকৃতির প্রতিকুলতার সাথে লড়াই করে টিকে থাকতে হলে যথাযথ ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা আগে থেকেই আমাদের গ্রহণ করতে হবে।

লেখকদ্বয়ঃ

ড. মোঃ সাইদুর রহমান, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ এর কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক

এবং

ড. মোঃ শরফ উদ্দিন, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা
কেন্দ্রের ফল বিভাগের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা।

  •  
  •  
  •  
  •