কেন পরিবর্তন জরুরি সার নীতিমালায়

নিউজ ডেস্কঃ

গাছের খাদ্যের জন্য যে ১৭টি মৌলিক উপাদান প্রয়োজন, তার মধ্যে ১৪টি মাটি থেকে আহরণ করে। উফশী শস্যের জাত ও নিবিড় চাষাবাদের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নাইট্রোজেন সারের। তারপর যথাক্রমে ফসফেট, পটাশ ও সালফার। পৃথিবীজুড়ে রাসায়নিক সারের প্রায় ৭০ শতাংশ নাইট্রোজেন বাহক সারই ইউরিয়া।

বাংলাদেশে বিভিন্ন সারের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৫০ লাখ টন। ২০১৬ সালে বাংলাদেশে ইউরিয়ার চাহিদা ছিল ২০ দশমিক ৮ লাখ টন, যার বিপরীতে দেশে উৎপাদন হয়েছিল প্রায় ৩ লাখ টন। ২০১৫ সালে ইউরিয়ার চাহিদা ছিল ২০ দশমিক ৭০ লাখ টন, যার বিপরীতে দেশে উৎপাদন হয়েছিল প্রায় নয় লাখ টন (গ্যাস সরবরাহসাপেক্ষে, ঢাকা ট্রিবিউন ২০১৬)।

নাইট্রোজেন ব্যতীত জমিতে অন্যান্য উপাদানও সমান গুরুত্বপূর্ণ, তাই সার প্রয়োগ করতে হয় পরিমিত ও সুষম মাত্রায়। সার প্রয়োগের তথ্য-উপাত্ত থেকে দেখা যায়, বিভিন্ন সার প্রয়োগের যে মাত্রা বিএআরসি নির্দিষ্ট করে দিয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার চেয়ে অনেকাংশে কম মাত্রায়, ক্ষেত্রবিশেষে একক সার মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার আবার অনেক ক্ষেত্রে কিছু সার একেবারেই ব্যবহার করা হয় না।

অন্যদিকে বাংলাদেশের ৮৫ শতাংশ জমিতে নাইট্রোজেন সংকটাপূর্ণ মাত্রারও নিচে। ফসফেট সারের সমতা কিছুটা সংকটাপূর্ণ মাত্রার কাছাকাছি থাকলেও এমওপি সারের মাত্রা একেবারেই নিম্ন পর্যায়ে। ফলে উৎপাদিত ফসলের গুণগত মান যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি জমির উর্বরা শক্তির ওপরও ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে। সুষম সারের ব্যবহার তাই বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য।

সারের অসম ব্যবহার রোধে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ: সারের এই অসম ব্যবহার রোধে সরকার ১৯৯৮ সালে ডাই অ্যামোনিয়াম ফসফেট বা ডিএপি সারের প্রচলন করে। এ সারে নাইট্রোজেনের পরিমাণ ১৮ শতাংশ এবং ফসফেটের পরিমাণ ৪৬ শতাংশ। ডিএপি মূলত ফসফেট সারের বিকল্প হিসেবে বাজারে সমাদৃত। তাছাড়া নাইট্রোজেন সারের সম্পূরক হিসেবেও বিবেচিত হয়। কিন্তু নাইট্রোজেনকে একক সার হিসেবে ব্যবহারের একটি অসুবিধাজনক দিক হলো, মাটিতে প্রয়োগের পর বিশেষ কিছু ভৌত, রাসায়নিক (বাষ্পীভবন প্রক্রিয়া অন্যতম) ও অনুজৈবিক বিক্রিয়ার ফলে ইউরিয়াবাহিত নাইট্রোজেনের প্রায় ৭০-৭৫ শতাংশ খাদ্য হিসেবে গাছের ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।

নাইট্রোজেনের এই অপচয় রোধে গুটি ইউরিয়া মাটিতে দুই থেকে পাঁচ সেন্টিমিটার গভীরে পুঁতে ব্যবহারের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এটা শ্রমঘন ও কষ্টসাধ্য, তাই প্রয়োগের দিক থেকে কার্যকর হয়ে ওঠেনি। এছাড়া সরকার সুষম সার ব্যবহারের লক্ষ্যে ‘এনপিকেএস’ মিশ্র সারের প্রচলন করে। মিশ্র সার হচ্ছে কতগুলো মৌলিক একক সারের ভৌত মিশ্রণ, যেখানে কোনো প্রকার রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটানো হয়নি। বেসরকারি পর্যায়ে মিশ্র সার উৎপাদনের জন্য সরকার বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনাসহ ভর্তুকির ব্যবস্থা করে। কিন্তু এনপিকেএসের উৎপাদন প্রণালি এতটাই সরলীকরণ যে উৎপাদিত এ সার গুণগত মানের দিক থেকে খুবই নিম্ন। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সরকার পরবর্তী সময়ে নাইট্রোজেন ও ফসফেটের যৌগ মিশ্রণ ডিএপির ন্যায় এমএপি ভর্তুকির আওতায় বিচূর্ণ অবস্থায় এনপিকেএস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমদানি করার অনুমতি দেয় এবং মিশ্রণের আনুপাতিক হারও বেঁধে দেয়।

এমএপি ডিএপির ন্যায় আরেকটি যৌগ, যেখানে নাইট্রোজেনের পরিমাণ ১৮ শতাংশের জায়গায় ১১ শতাংশ আছে। ফসফেটের পরিমাণ উভয় জায়গায় ৪৬ শতাংশ। সরকার ৭ শতাংশ কম নাইট্রোজেনের জন্য আরো প্রায় ৭ টাকা কেজিতে ভর্তুকি দিয়ে এনপিকেএস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎপাদনে সহায়তা দিয়েছে। এমএপি ও ডিএপির ন্যায় আরো অনেক নাইট্রোজেন ও ফসফেটের সংমিশ্রণে উত্পন্ন যৌগ সার আন্তর্জাতিক বাজারে প্রচলিত, যা কিনা সহজলভ্য উপাদান ও সংক্ষিপ্ত উৎপাদন প্রণালি অবলম্বনে তৈরি করা যায়।

নাইট্রোজেন ও ফসফেটের সমন্বয়ে গঠিত এনপি যৌগ সার: Grande Paroisse ফ্রান্সের বিখ্যাত কোম্পানি, ইউরিয়া, রক ফসফেট ও সালফিউরিক অ্যাসিডের রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে এ রকম এক যুগান্তকারী যৌগ সার উদ্ভাবন করেছে; যা কিনা ইউরিয়াকে ফসফেটের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, কোনো রকম ঝামেলা ছাড়াই। ফলে ফসফেটের সঙ্গে থাকা এই অনুবন্ধি ইউরিয়া-নাইট্রোজেন ধীরগতিতে অবমুক্ত হয় বিধায় গাছ দীর্ঘ সময়ের জন্য তা পেতে পারে। উদ্ভাবিত এই নতুন যৌগ সারের রাসায়নিক বিশ্লেষণ: ২০:১০:০+১৫CaO+৭S। এ যৌগ সারকে খুব সহজেই অন্য পুষ্টি উপাদান যেমন ‘এমওপি’র সঙ্গে সংযুক্ত করা যায়। পরিবর্তিত যুক্ত সার কোনো প্রকার দলা পাকায় না এবং উৎপাদনের পর এর প্রতিটি পুষ্টি উপাদানের গুণগত মান অক্ষুণ্ন থাকে। নতুন উদ্ভাবিত বাংলাদেশে এই যৌগ সারের নাম ‘এনপি কম্পাউন্ড’ দেয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যার নাম ‘ইউরিয়া সুপার ফসফেট’ বা ইউএসপি।

কৃষি মন্ত্রণালয় ২০১৮ সালের ২৮ জানুয়ারি জাতীয় সার প্রমিতকরণ কমিটির সভায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের সুপারিশের ভিত্তিতে এনপি কম্পাউন্ড নামে রাসায়নিক সারটির অনুমোদন দেয়। ওই আদেশের পরিপ্রক্ষিতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারি এনপি কম্পাউন্ড রাসায়নিক সারটি উৎপাদনের লাইসেন্স দেয়।

এনপি কম্পাউন্ড সার কী? এনপি কম্পাউন্ড সার হচ্ছে ইউরিক নাইট্রোজেনের সঙ্গে লো গ্রেড রক ফসফেটের রাসায়নিক বন্ধনে উৎপাদিত একটি রাসায়নিক যৌগ সার। এ সার খুব সংক্ষিপ্ত পদ্ধতি অবলম্বন করে উৎপাদন করা যায়। এটি উৎপাদনের পর সারের মধ্যে কোনো প্রকার মুক্ত ইউরিয়া থাকে না বিধায় গুদামজাত করার পর এটা জমাট বাঁধে না। এনপি কম্পাউন্ড সার প্রস্তুত করার পর অন্য যেকোনো পুষ্টি উপাদান বিভিন্ন আনুপাতিক হারে এর সঙ্গে সংযুক্ত করা যায় এবং এতে সারের কোনো উপাদানের গুণগত মানের পরিবর্তন হয় না। উৎপাদন প্রক্রিয়া পরিবেশবান্ধব, কেননা উৎপাদনের সময় এখান থেকে জিপসাম উত্পন্ন হয় না।

এনপি কম্পাউন্ড সার থেকে ফায়দা: ৩০ শতাংশ পর্যন্ত নাইট্রোজেন বা ইউরিয়া সারের ব্যবহার কমানো সম্ভব; অম্লবিরোধী সার; ক্যালসিয়াম ও সালফার এ দুটির সহজলভ্যতা; এনপি কম্পাউন্ড সার ব্যবহার করে ৫ শতাংশ ফলন বেশি পাওয়া গেছে।

সরকারের লাভ: সরকারের সার আমদানির ক্ষেত্রে ভর্তুকি সহায়তা দেশেই থেকে যাচ্ছে। একসময় সার আমদানিতে বিশাল অংকের বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় রোধ করা সম্ভব হবে। কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রায় বিদেশী সার কারখানা থেকে সার আমদানি না করে দেশীয় শিল্প-কারখানাকে উৎসাহ দানসহ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। ৩০ শতাংশ পর্যন্ত নাইট্রোজেনের অপচয় রোধ করে সরকারের বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে। সঠিক সময় সারের সংগ্রহ নিশ্চিত হবে। সরকারের ‘এক প্রকার সারের’ উৎপাদনের নীতি বাস্তবায়িত হবে।

সরকারের সার উৎপাদনে নীতিমালা: কৃষি ক্ষেত্রে উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তা অব্যাহত রাখতে ইউরিয়া উৎপাদনে জোর দিতে হবে অথবা ইউরিয়া ব্যবহারকে সাশ্রয়ী করতে হবে। এজন্য দরকার নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে এমন সার ব্যবহার করা, যা কিনা ইউরিয়ার অপচয় রোধ করবে। এ ব্যাপারে গত ৩ ফেব্রুয়ারি কৃষি মন্ত্রণালয়ের নবম বৈঠকে সব রকমের সার ব্যবহার না করে সংক্ষিপ্ত পদ্ধতি অবলম্বনে, প্রয়োজনে সারের সঙ্গে অন্যান্য উপাদান সঠিকভাবে যুক্ত করে এক প্রকার সার বেছে নেয়ার পাশাপাশি ওই বিষয়ে ব্রি ও ইপসার গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে তাদের গবেষণা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সুপারিশ করা হয়।

ভর্তুকি প্রদানের নিয়মাবলি: সরকারের ২০১৫ সালের ২৯ জানুয়ারি নন-ইউরিয়া সার আমদানি, বিক্রয় ও ভর্তুকি বিতরণ-প্রদান পদ্ধতির ওপর বিধিটি হচ্ছে, ‘বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন কর্তৃক আমদানীকৃত, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন কর্তৃক উৎপাদিত এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কর্তৃক নিবন্ধিত আমদানিকারকদের মাধ্যমে নন-ইউরিয়া সার আমদানির ক্ষেত্রে ভর্তুকি কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।’ সে হিসাবে ডিএপি, এমএপি টিএসপি ও এমওপির ওপর ভর্তুকি প্রযোজ্য আছে।

বিধির ৫ নং অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে, বিএডিসি ও বেসরকারি আমদানিকারকদের ক্ষেত্রে প্রকৃত আমদানি এবং বিসিআইসি কর্তৃক প্রকৃত উৎপাদিত সারের পরিমাণের ওপর ভর্তুকি প্রযোজ্য হবে। বিধিতে আরো উল্লেখ আছে, বিসিআইসি উৎপাদিত টিএসপি ও ডিএপি সারের ক্ষেত্রে সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিসিআইসি ভর্তুকি হিসেবে অর্থ পাবে। সে হিসাবে নন-ইউরিয়া সারের ভর্তুকি মূল্য নির্ধারণ করা হয় ডিএপি কৃষক পর্যায়ে ২৫ টাকা, টিএসপি কৃষক পর্যায় ২৭ টাকা এবং এমওপি কৃষক পর্যায়ে ১৮ টাকা। বর্তমানে ডিএপিতে আরো ভর্তুকি দিয়ে তার দাম করা হয়েছে ১৬ টাকা কেজি। উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে অর্থাৎ বিধিটি জারির আগে বেসরকারি পর্যায়ে নন-ইউরিয়া সার উৎপাদনকারী কোনো প্রতিষ্ঠানকে রেজিস্ট্রেশন দেয়া হয়নি।

এমন পরস্থিতিতে বেসরকারি পর্যায়ে উৎপাদনের ক্ষেত্রে ভর্তুকির নিয়মনীতি/প্রণোদনার সঠিক দিকনির্দেশনা থাকা বাঞ্ছনীয়। আমদানিতে দীর্ঘ সময় ধরে ভর্তুকি দেয়া কোনো সময়ের জন্যই ফলপ্রসূ হয় না। বেসরকারি পর্যায়ের উদ্যোক্তারা সার কারখানায় বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত হবেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের বিনিয়োগ সুরক্ষিত না হয়। করোনা-পরবর্তী যে অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন ব্যবস্থা হতে চলেছে, সেখানে সব নির্ভরতার বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে আমদানি নির্ভরশীলতা দেশের অর্থনীতিতে কতটুকু ভারসাম্য নিশ্চিত করবে, সেটা চিন্তার বিষয়।

  •  
  •  
  •  
  •