হারিয়ে যাওয়া নীল হতে পারে দেশের অন্যত্তম অর্থকরী ফসল

মতামত
ড. মোঃ সহিদুজ্জামান

‘নীলচাষ’ শব্দটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে কোনো ইংরেজ সাহেবের হাতে চাবুক, অসহায় কৃষকের চোখে জল, নিরুপায়ের আহাজারি ও ক্ষুধার হিংস্র থাবা। এখনও বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন স্থানে সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে অনেক নীলকুঠি। নীল বিদ্রোহের পর নীল চাষ বন্ধ হলেও বাংলাদেশে, বিশেষ করে রংপুরে নীলগাছ বিলুপ্ত হয়নি। চাষিদের বিদ্রোহের মুখে নীলকর সাহেবেরা লেজ গুটিয়েছিল প্রায় ১৫০ বছর আগে। এরপর ধীরে ধীরে ইতিহাসের ঘৃণিত অংশ হয়ে গেছে খোদ ব্রিটিশ শাসকেরাই। ধুলোর নিচে চাপা পড়ে গেছে নীলকর সাহেবদের অত্যাচার। আবার বাংলাদেশের জমিতে নীলগাছ লক লক করে উঠে জানান দিচ্ছে নীল আছে আজো।

নীল সবার কাছে একটি পরিচিত রং। কম-বেশি সবাই এই রং পছন্দও করে। কৃত্রিম নীল রং থাকলেও আমি যে নীল রংয়ের কথা বলছি তা প্রকৃতি থেকে সংগৃহীত হয়। নীল হচ্ছে শীম পরিবারভুক্ত গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ। স্থানীয়ভাবে মাল গাছ, নিলিনী, রঞ্জনী, কালোকেশী, নীলপুষ্প ইত্যাদি নামে ডাকা হয়। ইংরেজিতে নীলকে Indigo এবং রোমান ভাষায় Indicum বলা হয়। বৈজ্ঞানিক নাম হচ্ছে, Indigofera Tinctoria. বাংলার ভূখন্ডে ইন্ডিগোফেরার ১৫ প্রজাতির গাছ জন্মাতো।

সরেজমিনে রংপুরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায় নীল চাষে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। নীল নিয়ে অনেকেই স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। ডা. নিখীল রায় (হরকলি, ঠাকুরপাড়া, পাগলাপীর, সৈয়দপুর, রংপুর) প্রায় ১৭ বছর ধরে বংশ পরাম্পরায় নীল চাষ ও উৎপাদন করে আসছেন। তিনি তাঁর অভিজ্ঞতা ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন পরিদর্শনরত গবেষক ও এনজিও কর্মীদের।

ইতোমধ্যে রংপুরে এবং দিনাজপুরে দুই তিনটি উপজেলার প্রায় ১০টি ইউনিয়নে সীমিত পরিসরে নীলের চাষ শুরু হয়েছে বলে জানা যায়। গড়ে উঠেছে ছোট-খাটো কারখানাও। সেই নীল দিয়ে রাঙিয়ে ব্যাগ, ফতুয়া, চাদর, নকশীকাঁথা ও বাহারি পণ্য তৈরি হচ্ছে। দেশ-বিদেশে এসব পণ্যের প্রচুর চাহিদাও রয়েছে। নীলচাষীদের আগ্রহ দেখে মনে হচ্ছে যে, হারিয়ে যাওয়া নীল নতুন রূপে অপর সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে।

নীল গাছ দেখতে অনেকটা ঝোঁপ বা ধঞ্চে গাছের মত। ১ থেকে ২ মিটার লম্বা হয়। জীবনকাল ৬ মাস। মার্চ-এপ্রিল মাসে বীজ বপন করলে  সেপ্টেম্বর- অক্টোবর মাসে গাছ মারা যায়। গাছের পাতা সবুজ কিন্তু যে ফুল হয় তা প্রথমে গোলাপী ও পরে বেগুনি রংয়ের হয়। তবে কিছু কিছু জাতের ফুল সাদা ও হলুদ রংয়েরও হয়। ফল ও বীজ সরিষার মতো। মাষ কলাইয়ের মত এক চাষ দিয়েই বীজ বপন করা যায়। বীজ বপনের তিন মাস পর গাছের পাতা কাটা যায়। ছয় মাসের মধ্যে ৩-৪ বার পাতা কাটা যায়। পাট গাছের মত নীল গাছের নরম শাখাকে পানিতে জাগ দিয়ে বিশেষ প্রক্রিয়ায় নীল রং তৈরি করা হয়।

নীল কিন্তু শুধু রং হিসেবেই নয়, নানাক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায়। সুতি বা উলেন সিল্ক কাপড়ের রং উজ্জ্বল করার ক্ষেত্রে এর জুড়ি নাই। পাট গাছের মত নীল গাছ উৎকৃষ্ট জ্বালানি ও জৈবসার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। নীল থেকে তেলও হয়। জামা-কাপড় ব্যাকটেরিয়ামুক্ত রাখা এবং শরীর এলার্জিমুক্ত রাখার ক্ষেত্রেও নীলের ভূমিকা আছে। নীল ব্যবহারে গায়ের চামড়াও ভাল থাকে। কলপ, নীলের খৈল থেকে লোসন, সেভিং ফোম ইত্যাদিও তৈরি হয়। ভেষজ গুণ থাকায় চিকিৎসা ক্ষেত্রেও নানা অসুখে নীল গাছ ব্যবহার হয়।

নীল চাষে আর্থিক লাভ

স্থানীয়ভাবে নীল চাষকে মাল চাষ বলা হয়। পাতা থেকে নীল প্রস্তুত করা হয়। পাতা যত স্বাস্থ্যবান  হয় তত বেশি নীল পাওয়া যায়। প্রতি বিঘা জমিতে ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ কেজি (৩ বার হার্ভেস্টিং এ প্রাপ্ত মোট পরিমান) পাতা পাওয়া যায় বাজার মূল্য প্রায় ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা। এছাড়া জ্বালানী বিক্রয় করে প্রায় ৩ হাজার টাকা এবং বীজ বিক্রয় করে প্রায় ৩০০ আয় করা যায়। অর্থ্যাৎ একজন চাষী ১ বিঘা জমি থেকে বিনা খরচে প্রায় ১৫ হাজার টাকা আয় করতে পারে।

এক কেজি নীল প্রস্তুতির জন্য ২০০ থেকে ২৫০ কেজি পাতা লাগে। জনাব নিখীল রায় প্রতি কেজি নীল বিক্রি করেন ৪ হাজার টাকা দরে। উত্তমমানের নীল প্রস্তুত করা গেলে তার বাজারমূল্য প্রতি কেজি প্রায় ২০ হাজার টাকা, সেক্ষেত্রে বিঘা প্রতি ২ লক্ষ টাকা আয় করা সম্ভব। প্রতি বিঘা জমিতে তার খরচ হয় মোট ২ হাজার ৭০০ টাকা থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা, ১৪ থেকে ১৫ কেজি নীল উৎপাদনের জন্য তার আয় ৫৬ হাজার টাকা থেকে ৬০ হাজার টাকা।

নীলচাষে সেচ লাগে না। শুধু ১ থেকে ২ বার চাষ প্রয়োজন হয় এবং সার ও তেমন লাগেনা। বিঘাপ্রতি ৫ থেকে ৬ কেজি ইউরিয়া প্রয়োজন হয়। পতিত জমিতেও নীলচাষ করা যায়।

নীল নিয়ে গবেষণা

যুক্তরাজ্যের গ্লোবাল চেঞ্জ রিসার্চ ফান্ড (জিসিআরএফ) পরিচালিত প্রকল্পে নীল চাষে আর্থিক লাভ এবং মৃত্তিকা ও পরিবেশের টেকসই উন্নয়ন বিষয়ে গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম শুরু করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোঃ মফিজুর রহমান জাহাঙ্গীর। কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর ও রংপুরের শাইরা সমাজ কল্যান সংস্থার সহযোগিতায় তিনি রংপুরের বিভিন্ন অঞ্চলে গবেষণা কার্যক্রম শুরু করেছেন। প্রযুক্তি ব্যবহার করে নীল উৎপাদন ও গুনাগুন বৃদ্ধি করা সম্ভব বলে প্রাথমিক গবেষণায় প্রতীয়মান হয়।

প্রাথমিক গবেষণায় দেখা যায়, নীলচাষের কারনে মাটির ভৌত ও জৈব রাসায়নিক গুনাগুন বৃদ্ধি পায়। ফলে নীলচাষ করার পর ঐ জমিতে আমন ধান চাষে সার কম লাগে। নীলচাষ করার পর উক্ত জমিতে তামাক চাষ করলে বা অন্য সবজী চাষ করলে উক্ত ফসলে পোকামাকড়ের আক্রমন কম হয় এবং সবজি জাতীয় ফসলের আইলে নীলচাষ করলে অন্যান্য পোকামাকড়ের প্রাদুর্ভাব কম হয়।

নীল একটি লিগিউমিনাস বা গুল্ম জাতের ফসল হওয়ায় বায়ুমন্ডল থেকে নাইট্রোজেন ফিক্স করে জমিতে নাইট্রোজেনের পরিমান বৃদ্ধি করে। নীল গাছের পাতা ঝরে পড়ে জমির জৈব পদার্থ বৃদ্ধি করে। ফলে নীলচাষের জন্য রাসায়নিকসার লাগে না বললেই চলে। কখনও কখনও শুধু সামান্য মাত্রায় ইউরিয়া সার প্রয়োগ করতে হয়। নীল ঢালু জমিতে বা পতিত জমিতে চাষ করলে তা মাটির ক্ষয়রোধ করতে সক্ষম হয়। নীল সবুজ সার হিসেবেও ব্যবহার করা সম্ভব।

আধুনিক উৎপাদন কৌশল ব্যবহার করে নীলের উৎপাদন ও পাতায় নীলের মৌলিক উপাদান ও গুনাগুন কিভাবে বৃদ্ধি করা যায় তা নিয়ে গবেষণা চলছে। কারণ মানসম্পন্ন নীল উৎপাদন করতে পারলে প্রতি কেজি নীল আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চ মূল্যে (২৫০ ইউএস ডলার) বিক্রি করা সম্ভব।

প্রাকৃতিক রং সাধারণত অস্থায়ী ও পচনশীল হয়। কিন্তু বাংলাদেশে চাষকৃত নীলে এমন কি প্রাকৃতিক উপাদন আছে যা বৃটিশদের আকৃষ্ট করেছিল সেটিও গবেষকরা খুজে দেখছেন। এছাড়া শুধু রংপুর ও দিনাজপুরেই নয় দেশের অন্যান্য জায়গায় গুনগত মানসম্পন্ন নীল উৎপাদন করা যায় কিনা সেটি নিয়েও গবেষণা চলছে। উল্লেখ্য যে, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে উৎপাদিত নীলের চেয়ে বাংলাদেশে বিশেষ করে বৃহত্তর রংপুর ও দিনাজপুরের নীল গুনে ও মানে তুলনামুলকভাবে  ভাল।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় নীল কে সরকারী কৃষি পন্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করতে পারলে এবং কৃষি জমির  নীল ও নীল থেকে উপাদিত পণ্য সরকারী অনুমোদন পেলে এটি একটি জনপ্রিয় কৃষিজাত ফসল হিসেবে পরিগণিত হতে পারে। এতে কৃষকের আয় বাড়বে এবং মাটির ভৌত ও জৈব রাসায়নিক গুনাগুন বৃদ্ধির মাধ্যমে কৃষি জমির টেকসই উৎপাদনশীতা বৃদ্ধি সম্ভব।

কৃত্রিম নীলের বিকল্প হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত উৎপাদনের অভাবে যোগান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এ সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিবেশবান্ধব এই প্রাকৃতিক  নীল হতে পারে দেশের অন্যত্তম অর্থকরী ফসল।

অধ্যাপক ড. মোঃ সহিদুজ্জামান
লেখক ও গবেষক
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
  •  
  •  
  •  
  •