একটি বিচিত্র ফসল কাসাভা

নিউজ ডেস্কঃ

কাসাভা। একটি বিচিত্র ফসল। দেখতে অনেকটা লম্বা আলুর মতো। কেউ কেউ পাহাড়ি আলুও বলেন। কেউবা বলেন শিমুল আলু। যার পাতা, ডালপালা, গাছের মূল, ছাল সবই কাজে লাগে। স্বল্প খরচে এ থেকে উৎপন্ন হয় দামি সব পণ্য। বিভিন্ন ওষুধের কাঁচামাল হিসেবেও ব্যবহার হয় এটি। দেশের বাজারে এর চাহিদা প্রচুর। চাষাবাদের জন্য রয়েছে পর্যাপ্ত জমি। কিন্তু নেই উদ্যোগ। তবুও এ নিয়ে স্বপ্ন দেখেন কৃষকরা।

সরেজমিনে হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার তেলিয়াপাড়া ঘুরে জানা যায়, যুগ যুগ ধরে পরিত্যক্ত পড়ে থাকা একরের পর একর টিলায় প্রায় তিন বছর আগে কাসাভা উৎপাদনের স্বপ্ন দেখায় দেশের বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। পরিত্যক্ত টিলায়ও যে কিছু উৎপাদন করা যায় প্রথমে তা ভাবতেই পারেননি কৃষকরা। অবশেষে শুরু করেন কাসাভা চাষ। এতে কৃষকদের শর্ত ছাড়াই ঋণ দেয়া হয়। সরবরাহ করা হয় চারাও। ১২৫ একর জমিতে শুরু হয় কাসাভা চাষাবাদ। প্রতি একরে গড়ে প্রায় ছয় মেট্রিক টন উৎপন্ন হয়। কৃষকদের প্রতি টনে খরচ হয় সাড়ে ৪-৫ হাজার টাকা। কৃষকদের জমি আর শ্রম। বাকি সবই দেয় প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। তারা আবার সেটি কিনেও নেয়। এরপর খরচের টাকা পরিশোধ করে লাভ নিয়ে যায় কৃষক। এতে শুধু কৃষক নয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য মানুষেরও। পাহাড়ি এলাকায় সাধারণ কাজ করে যেখানে দৈনিক এক থেকে দেড়শ টাকা পায়, সেখানে কাসাভা বাগানে কাজ করে পাচ্ছে দৈনিক আড়াইশ টাকা।

 

সাতছড়ির শ্রমিক মিনু কর্মকার জানান, ছেলেসহ এ বাগানে কাজ করি। ছেলে দৈনিক ২৫০ এবং আমি ১৫০ টাকা করে পাই। এখানে কাজ করে বেশ ভালোই আছি।

তিনি আরও বলেন, পরিবারের সদস্য ১০ জন। পাহাড়ি এলাকায় কাজের বেশ অভাব। এখানে মা ও ছেলে দু’জন কাজ করে যা পাই তাতে বেশ ভালোই চলে সংসার।

 

সুরমা চা বাগান এলাকার ফয়জাবাদ ডিভিশনের বাসিন্দা প্রেমানন্দ পানতাঁতী জানান, চার ছেলে মেয়েসহ ছয়জনের সংসার। দুই ছেলে ও এক মেয়ে স্কুলে পড়ে। সবার ছোট ছেলে এখনও স্কুলে ভর্তি হয়নি। এখান থেকে যা পাই তাতে বেশ ভালোই চলে।

বাগানের আরও কয়েকজন শ্রমিক জানান, এখানে কাজ না পেলে হয়তো পরিবার নিয়ে অনেক কষ্ট করতে হতো। এখান থেকে সপ্তাহে বিল পান। কখনও আবার কৃষকের বিল পাওয়া পর্যন্ত কাজ করে যান। বিল পেলে একসঙ্গে তা পরিশোধ করেন জমির মালিক।

মাধবপুর উপজেলার শাহজাহানপুর গ্রামের কৃষক মো. ফারুক চৌধুরী জানান, জমিটি যুগ যুগ ধরে পরিত্যক্ত ছিল। কিছুই ফলানো যাচ্ছিল না। বিশেষ করে সেচের অভাবে কোনো ফসল ফলানো সম্ভব হয়নি। তিন বছর ধরে ৩০ একর জমিতে কাসাভা চাষ করছি। গত বছর প্রায় তিন লাখ টাকা লাভ হয়েছে। এবারও এমন লাভের আশা করছি। সরকারিভাবে সহায়তা দেয়া হলে আরও বেশি লাভ করা সম্ভব।

জানা যায়, দেশে কাসাভা চাষ শুরু হয় প্রায় ৩০ বছর আগে। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত বেসরকারি উদ্যোগেই এটির চাষ হচ্ছে। ব্যাপক আকারে ২০১৪ সাল থেকে এর চাষাবাদ শুরু করেছে দেশের বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। সিলেট বিভাগে ৭১৫ একর জমিতে এর আবাদ হচ্ছে। এর মধ্যে সিলেট সদরে ৭৫, কানাইঘাটে ৪০০, মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়ায় ৬৫, শ্রীমঙ্গলে ৫০ এবং হবিগঞ্জে ১২৫ একর জমি রয়েছে।

 

কাসাভা থেকে সাড়ে চার হাজার টন স্টার্চ উৎপাদন হয়, যা থেকে গ্লুকোজ, বিস্কুট, চকলেট, বার্লি, সুজি, রুটি, নুডলস, ক্রেকার্স, কেক, চিপস তৈরি হয়। বানানো হয় বিভিন্ন গার্মেন্টসে তৈরি কাপড়ে ব্যবহারের জন্য মাড়। বিভিন্ন রকম জীবন রক্ষাকারী ওষুধও তৈরি হয় এ থেকে। এর বর্জ্য থেকে জৈব সার উৎপন্ন হয়। গবাদিপশু খায় এর পাতা। গাছের ডালপালা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হয়। শিকড় ব্যবহার হয় পরবর্তী বছর চারা জন্মানোর কাজে। ফেলা হয় না কিছুই।

দেশের বাজারে কাসাভা থেকে উৎপাদিত স্টার্চের চাহিদা বছরে তিন লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন। কিন্তু উৎপন্ন হয় মাত্র ৫-৬ হাজার মেট্রিক টন। বাকি চীন, ভারত, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি হয়।

হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের জেনারেল ম্যানেজার হাসান মঞ্জুরুল হক জানান, এটি মূলত আফ্রিকান ফসল। সেখানে মানুষ এটিকে লম্বা আলুর মতো করে সেদ্ধ করে খায়। এ থেকে পণ্য উৎপাদনের অনেক সুবিধা রয়েছে। খরচও কম। রোগ বালাইয়ের ঝুঁকিও কম।

প্রাণ এগ্রো বিজনেসের ডেপুটি ম্যানেজার কৃষিবিদ মো. মহসিন হোসাইন জানান, কাসাভা চাষে পাহাড়ি জমি প্রয়োজন। এতে পানিরও প্রয়োজন নেই। ফলে একদিকে যেমন পতিত জমি কাজে লাগছে, তেমনি কৃষকও লাভবান হচ্ছে। এর ওপর নির্ভর করে চলছে অনেক পরিবার।

 

তিনি বলেন, এটি বছরে একবার তোলা সম্ভব হয়। আমরা এর ওপর কাজ করছি। যেন আরও উন্নতজাত কৃষকদের সরবরাহ করা সম্ভব হয়। বছরে যেন দুবার উৎপাদন করা যায়। যদি সরকারিভাবে উদ্যোগ নেয়া হয় তবে হয়তো আরও ভালো করা সম্ভব হবে।

সিলভান এগ্রিকালচার লিমিটেড সিনিয়র ম্যানেজার মো. আসাদুজ্জামান জানান, দেশের বাজারে বছরে সাড়ে তিন লাখ মেট্রিক টন স্টার্চের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৫-৬ হাজার মেট্রিক টন। বাকি চাহিদা আমদানি করে মেটাতে হয়।

প্রাণ এগ্রো বিজনেসের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম জানান, উঁচু জমি ছাড়া এ ফসল ফলে না। বেলে দু-আঁশ মাটি হলে ভালো হয়। পানি জমে না এমন মাটি ছাড়া এগুলো ফলে না। এটি দীর্ঘমেয়াদি ফসল। ফসল তুলতে এক বছর সময় লাগে। মাটির ঊর্বরতার ওপর নির্ভর করে এর ফলন।

  •  
  •  
  •  
  •