কৃষি সম্ভাবনার গবেষণায় জোর প্রধানমন্ত্রীর

নিউজ ডেস্কঃ

দেশের মানুষের খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি রপ্তানি বাড়াতে অঞ্চলভিত্তিক কৃষি সম্ভাবনা ধরে গবেষণায় জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, কৃষি উৎপাদন বাড়াতে হবে। খাদ্যের জন্য যেন হাত পাততে না হয়। খাদ্যের যেন অভাব না হয়। অন্য দেশকে যেন সাহায্য করতে পারি। জাতির জনকের স্বপ্ন যেন পূরণ করতে পারি। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রফতানি করতে পারি সেভাবে উৎপাদন করতে হবে।

গতকাল গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল প্রকাশিত ‘১০০ কৃষি প্রযুক্তি অ্যাটলাস’ এর মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি বলেন, ‘গবেষণাকে আমরা সব থেকে বেশি গুরুত্ব দিই। আমি এখনো মনে করি, গবেষণাকে আরো বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে খাদ্য চাহিদা বাড়ার বিষয়টি তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, আমাদের মাটি খুব উর্বর। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বলতেন, ‘আমার মাটি এত উর্বর যে সেখানে একটা বীজ পড়লেই একটা গাছ হয়, গাছে ফল হয়। তাহলে এদেশের মানুষ না খেয়ে কষ্ট পাবে কেন।’ সেই চিন্তা থেকেই তিনি সমস্ত পদক্ষেপ নিতেন। এর জন্যই গবেষণা একান্তভাবে প্রয়োজন।

তিনি বলেন, অল্প খরচে বেশি উৎপাদন কীভাবে হবে তার জন্য গবেষণা দরকার। কোন এলাকায় কোন ফসল ভালো হয় তার ম্যাপিং করাটাও জরুরি। আমি সারাদেশে ১০০ শিল্পাঞ্চল করছি। এসব অঞ্চলে কৃষিপণ্য কাঁচামাল হিসেবে কীভাবে ব্যবহার করা যায় তা দেখতে হবে। কৃষিতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। রফতানিযোগ্য পণ্য উৎপাদন করতে হবে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও আভ্যন্তরীণ বাজার বাড়াতে হবে। এরপর বিদেশে রফতানি করতে হবে। আমাদের যেহেতু কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি তাই এর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

করোনার মধ্যেও কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখতে ও ফসল ঘরে তুলতে সরকার ও আওয়ামী লীগ সহযোগিতা করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা বোরো ধানের একটা দানাও নষ্ট হতে দেইনি। কৃষিপণ্য পরিবহনের জন্য ট্রেনের বিশেষ বগি, ডাক বিভাগের গাড়ির ব্যবস্থা করে দিয়েছি। ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা কৃষি ঋণের জন্য বরাদ্দ দিয়েছি। ১৬২১টি কৃষক পরামর্শ কেন্দ্র করা হয়েছে।

কৃষি বিষয়ক গবেষণায় সাফল্যের জন্য বিজ্ঞানীদের ধন্যবাদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিজ্ঞানীদের জন্য কিছু করা দরকার। এটা কীভাবে করা যায় তার জন্য আপনাদের পরামর্শ চাই। আমি সবকিছু করতে চাই। খাদ্য উৎপাদন যে বাড়ছে এটা গবেষণার ফসল। গবেষণা ছাড়া কোনও উপায় নাই। আমরা আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি চাই।

তিনি বলেন, গবেষণার সঙ্গে যারা জড়িত, এটা দীর্ঘ সময় ধরে করতে হয়। সরকারি চাকরির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও গবেষণা শেষ হয়ে যায় না। তবে গবেষণাটা কীভাবে চালিয়ে যেতে পারেন সেটা ভাবতে হবে। আমি বিভিন্ন সময়ে এ বিষয়ে কথা বলেছি, কিন্তু কোনও সুরাহা হয়নি। কারণ গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থার পিয়ন-আর্দালিসহ সবাইকে তো আর সেই সুযোগ দেওয়া সম্ভব না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চাকরির বয়সসীমা বাড়িয়েছি। ইনস্টিটিউটগুলোতে কীভাবে আরও সুযোগ দেওয়া যায় তার পরামর্শ চাই আপনাদের কাছে।

কৃষকের জন্য ন্যায্য মূল্যের ব্যবস্থা করা, কৃষি গবেষণায় সুযোগ সুবিধা দেওয়া, কৃষিভিত্তিক সংস্থাগুলোর জনবল কাঠামো পুনর্গঠন করে সয়ংসম্পূর্ণ করা, কৃষিতে প্রণোদনার নতুন প্যাকেজ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এসবের উল্লেখ করেন সরকারপ্রধান।

শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতাকে হত্যার দীর্ঘ ২১ বছর পর সরকার গঠন করেছিল আওয়ামী লীগ। তার আগে গবেষণা ছিল ‘উপেক্ষিত’। আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর গবেষণার ওপর গুরুত্ব দেয়। কৃষি নিয়ে গবেষণা যত বাড়বে, তত বেশি কৃষিপণ্য উৎপাদন করা যাবে। কৃষির উন্নয়নে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথাও অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, আমাদের কৃষিপণ্য যাতে মানসম্মত করা যায়, সেজন্য পরীক্ষাগার আরও তৈরি করা দরকার। সেই সাথে আমাদের অঞ্চলভিত্তিক পরীক্ষাগার নির্মাণ করা প্রয়োজন। দেশের মাটির উর্বরতা এবং পরিবেশ বিবেচনা করে আমাদের কোন অঞ্চলে কোন ফসল সবচেয়ে ভালো এবং বেশি উৎপাদন হয় এবং উন্নত মানের উৎপাদন হতে পারে, তারও একটা জোনম্যাপ করা দরকার। এই ম্যাপিংটা খুব বেশি প্রয়োজন। দেশীয় বাজারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিদেশেও যেন রপ্তানি করা যায়, সেটা মাথায় রেখে কৃষি পরিকল্পনা সাজানোর ওপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রী।

আমাদের মাটির উর্বরতা, সেখানকার পানির অবস্থা এবং আবহাওয়া, জলবায়ু, পরিবেশ- এগুলো বিবেচনা করে আমাদের কোন অঞ্চলে কোন ধরনের ফসল বেশি হবে, ভালো হবে, উন্নত মানের হবে, বেশি উৎপাদন হবে, অল্প খরচে উৎপাদন হবে- তার একটা আমি মনে করি এলাকা ভাগ করে সেইভাবে আমরা যাতে উৎপাদন করতে পারি, তার উপর একটু গবেষণা করা প্রয়োজন।

সারা দেশে একশ শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগের কথা মনে করিয়ে দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আমার চিন্তা আছে এটা যে ওইসব অঞ্চলে কী ধরনের কাঁচামাল আমরা উৎপাদন করতে পারি, বিশেষ করে আমার কৃষিপণ্য, সেই কৃষিপণ্যটা কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা যায় বা কৃষি প্রক্রিয়াজাত করা যায়, যা আমি বিদেশে রপ্তানি করতে পারি। আমি যদি সেইসব অঞ্চলে সেই ধরনের বিনিয়োগের ব্যবস্থা করি দেশি -বিদেশি সব বিনিয়োগের, তাহলে কিন্ত বাংলাদেশের মানুষের আর কষ্ট থাকবে না, আর্থিকভাবেও আমরা আরো স্বচ্ছল হতে পারব, আর রপ্তানিযোগ্য পণ্য আমাদের বৃদ্ধি পাবে।

দেশের মানুষ অর্থনৈতিকভাবে ‘আরো উন্নত’ হচ্ছে এবং তাদের ‘ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, স্বাভাবিকভাবে আমি যখনই যা উৎপাদন করব, আমার এটা মনে রাখতে হবে যে আমার দেশের বাজার আরো বাড়াতে হবে, অর্থাৎ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে হবে। সেই ক্রয় ক্ষমতা বাড়লে তাদের চাহিদা যাতে আমরা পূরণ করতে পারি। দেশের চাহিদা মিটিয়ে আমরা যেন বিদেশে রপ্তানি করতে পারি, সেভাবে আমাদের পণ্য উৎপাদন করা।

করোনাভাইরাসের মহামারীর মধ্যে দেশের মানুষের জীবন ও জীবিকা স্বাভাবিক রাখা এবং দেশের অর্থনীতির চাকা গতিশীল রাখার জন্য সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা অনুষ্ঠানে তুলে ধরে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে বলেন শেখ হাসিনা।

বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এ অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক, মৎস্য ও প্রাণীসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মতিয়া চৌধুরী, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের নির্বাহী চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) শেখ মোহাম্মদ বখতিয়ার, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মেসবাহুল ইসলামসহ ঊর্ধতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

  •  
  •  
  •  
  •  
ad0.3

Tags: