বগুড়ার দুর্গম চর যেন লাল মরিচের গালিচা

বগুড়া প্রতিনিধি:
বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার যমুনা নদীর দুর্গম চর রাঙাচ্ছে লাল মরিচ। চরের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে মরিচের খেত। চরে মসুর ডাল, মাষকলাই ও ভুট্টা চাষ হলেও এবার মরিচের চাষ গত ১০ বছরের রেকর্ড ছাড়িয়েছে। ভালো ফলন পেয়ে খুশি চরাঞ্চলের মরিচচাষিরা। তবে তাঁদের অভিযোগ, চর থেকে কম দামে মরিচ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন ব্যাপারীরা। এতে লাভের বড় অংশই যাচ্ছে ব্যাপারীদের পকেটে।

সারিয়াকান্দি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহাদ্জ্জুমান বলেন, উপজেলায় এবার সাড়ে চার হাজার হেক্টর জমিতে মরিচ চাষ হয়েছে। এর ৮০ শতাংশই চাষ হয়েছে চরাঞ্চলে। এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় মরিচের রেকর্ড পরিমাণ ফলন হয়েছে। মরিচ ছাড়াও প্রায় দুই হাজার হেক্টর জমিতে মসুর ডাল ও মাষকলাই চাষ হয়েছে।

সম্প্রতি সরেজমিন সারিয়াকান্দিতে যমুনা নদীর দুর্গম বোহাইল, চর মাঝবাড়িতে দেখা গেছে, খেতজুড়ে মরিচ আর মরিচ। খুব সকাল থেকেই খেতের মরিচ তোলার উৎসব চলছে। পুরুষের সঙ্গে নারীরাও কাঁচা মরিচ তুলে বাঁশের ডালা, প্লাস্টিকের বালতিতে ভরছেন। খেত থেকে তোলা এসব মরিচ বস্তায় ভরার পর পাইকার-ব্যাপারীরা এসে দরদাম করে কিনে নিচ্ছেন। দিনভর খেত থেকেই চলছে মরিচের কেনাবেচা।

দিন শেষে ঘোড়ার গাড়িতে করে এসব মরিচ নেওয়া হচ্ছে খেয়াঘাটে। এরপর নৌকায় করে তা যমুনার ডান তীরে এনে নেওয়া হচ্ছে বগুড়া শহরসহ বিভিন্ন পাইকারি বাজারে। আবার কিছু মরিচ ব্যাপারীদের হাত ঘুরে যাচ্ছে সিরাজগঞ্জের কাজীপুর, টাঙ্গাইল, জামালপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। অনেক চাষি বিঘা চুক্তিতে খেতের মরিচ বিক্রি করে দিচ্ছেন। সোনাতলা উপজেলার খাটিয়ামারির চর ঘুরে দেখা গেছে, দুর্গম চরের খেতজুড়ে শুধু মরিচ আর মরিচ।

কৃষকেরা জানান, বেশির ভাগ কৃষক খেতেই মরিচ পাকিয়ে শুকানোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বোহাইল চরে গিয়ে দেখা গেল, বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠজুড়ে কৃষকদের কর্মযজ্ঞ। কিষান-কিষানিরা ব্যস্ত খেত থেকে কাঁচা মরিচ তুলতে।

চরের কৃষক নাজিম মণ্ডল দুই পুত্রবধূ লাকি বেগম ও সাবিনা বেগমকে সঙ্গে নিয়ে মরিচ তুলছিলেন। তিনি বলেন, ‘আজক্যাই ৮-১০ মণ মরিচ উঠপি। ফলন খুব ভালো হইচে। খেত দেইখ্যা মন শান্তি। বিঘায় ২৫ মণ ফলন হবি।’ তিনি আরও বলেন, ‘ফলন ভালা, কিন্তু দামডা তো হেইবার কম। ৬০০-৭০০ টেহা মণ। গেলবার আচিল ১২০০-১৪০০ টেহা মণ। ১৫ হাজার টেহা বিঘা চুক্তিতে কেউ কেউ মরিচসহ ব্যাপারীদের কাছে খেত বিক্রি করছেন। ব্যাপারীরা খেতত থ্যাকে কম দামে মরিচ কিনিচ্চে। হামাকেরে লাভ, ব্যাপারীরা চুষে খাচ্চে।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বগুড়া জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক প্রতুল চন্দ্র সরকার বলেন, জেলায় গত ১০ বছরের মধ্যে এবার সবচেয়ে বেশি পরিমাণ জমিতে মরিচের আবাদ ও ফলন হয়েছে। এ বছর জেলায় আট হাজার হেক্টর জমিতে মরিচের আবাদ হয়েছে। ফলন ধরা হয়েছে ১৫ হাজার মেট্রিক টন।

খেত থেকে ১০ মণ মরিচ তুলে পাশের বোহাইল ছোট বাজারে নিচ্ছিলেন চর বোহাইলের কৃষক আবদুস সাত্তার। তিনি বলেন, ‘হাল-চাষ, সার-কীটনাশক, সেচ-নিরানি, কামলার মজুরিসহ বিঘায় ৬ হাজার টেহার মতোন খরচ পড়চে। বিঘায় ফলন হচ্চে ২৫-৩০ মণ।’

চর মাঝবাড়ির কৃষক বাচ্চু মিয়া বললেন, কাঁচা নয়, খেতে মরিচ পাকিয়ে টোপা মরিচ চরে শুকিয়ে বাজারে বিক্রি করতে চান তিনি। এতে খরচ বেশি হলেও কাঁচা মরিচের চেয়ে লাভও বেশি। ‘টোপা (পাকা) মরিচে বিঘাপ্রতি খরচ হয় গড়ে ২৫ হাজার টেহা। ফলন হয় গড়ে ৩০-৩২ মণ। গতবার টোপা মরিচ গড়ে ১০০০-১২০০ টেহা মন দরে বিক্রি হয়েছে।’

বোহাইল চরের বাদশা মিয়া বলেন, ‘বিভিন্ন কোম্পানির লোকজন চরত অ্যাসে হামাকেরে কাছ থ্যাকে মরিচ কিনলে হামাকেরে লাভ বেশি হতো।’

  •  
  •  
  •  
  •