এবার বিজ্ঞান গবেষণার শীর্ষে মাভাবিপ্রবি, খুবি, ঢাবি ও বাকৃবি

নিউজ ডেস্কঃ

সিমাগো-স্কপাস র‍্যাংকিং ২০২০ অনুযায়ী এবছর বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে তালিকার শীর্ষে অবস্থান করে নিয়েছে টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (মাভাবিপ্রবি), খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় (খুবি), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি)।

গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রভাব- তিনটি বিষয়কে ভিত্তি ধরে শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তালিকা করে স্পেনের সিমাগো ল্যাব ও যুক্তরাষ্ট্রের স্কপাস। সিমাগো ইনস্টিটিউশনস র‍্যাংকিংস (এসআইআর) নামে নিয়মিত প্রকাশিত এ তালিকার চলতি বছরের সংস্করণে স্থান পেয়েছে দেশের ১৯টি বিশ্ববিদ্যালয়। এর মধ্যে সবার শীর্ষে রয়েছে  মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়,  খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়,  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

জানা যায়, যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমপক্ষে ১০০টি গবেষণা বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানকেই বিবেচনায় নেয়া হয়েছে।

সিমাগো রিসার্চ গ্রুপ ও স্কপাসের জরিপের ক্ষেত্রে আটটি বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আউটপুট বা প্রতিষ্ঠান থেকে বের হওয়া প্রকাশনার সংখ্যা, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতা, প্রকাশনার গুণগত মান, স্পেশালাইজেশন ইনডেক্স বা প্রকাশনার ওপর মনোযোগ, এক্সিলেন্স হার বা প্রকাশনাগুলো শীর্ষ ১০ শতাংশ জার্নালে কী হারে প্রকাশিত হয়েছে তা। এছাড়া সায়েন্টিফিক লিডারশিপ বা প্রকাশনাগুলোর অবদান ও এক্সিলেন্স উইথ লিডারশিপ প্রকাশিত প্রকাশনাগুলো ওই প্রতিষ্ঠানের অবদানের ক্ষেত্রে কী হারে শীর্ষে রয়েছে, তা-ও বিবেচনায় নেয়া হয়েছে।

২০২০ সালের এসআইআর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিশ্বের ৭ হাজার ২৬টি প্রতিষ্ঠানের এ তালিকায় প্রথম এক হাজারের মধ্যেই রয়েছে দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো। এর মধ্যে তালিকায় স্থান পাওয়া দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সবার শীর্ষে রয়েছে টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। প্রথমবারের মতো এসআইআর তালিকায় এসেই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রথম স্থান দখল করে নিল অপেক্ষাকৃত নতুন এ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বিশ্ব র‍্যাংকিংয়ে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান ৬৯০তম।

এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আলাউদ্দিন বলেন, সিমাগো-স্কপাসের র‍্যাংকিংয়ে শীর্ষ অবস্থানে আসার খবর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের জন্য আনন্দের। আশা করছি এটি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের গবেষণা কাজে উৎসাহ জোগাবে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কাজগুলোর একটি হলো গবেষণা। আমরা এ বিষয়ে শিক্ষকদের সবসময়ই গুরুত্ব দিয়ে আসছি। শিক্ষকদের গবেষণা সহায়তাসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়। পাশাপাশি একাডেমিক কাজের অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীদের মাধ্যমেও গবেষণা করানো হয়।

এ বছর এসআইআরে স্থান পাওয়া বাংলাদেশী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়। বৈশ্বিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান ৬৯৯তম। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সুন্দরবন নিয়ে বিভিন্ন ধরনের গবেষণা প্রকল্প রয়েছে। পাশাপাশি লবণ সহনশীল ফল গাছের জাত উদ্ভাবন, পাটভিত্তিক সিমেন্ট বন্ডেড পার্টিকেল বোর্ড এবং গলদা ও রুইয়ের সঙ্গে মলা মাছ চাষের মতো বিভিন্ন উদ্ভাবন রয়েছে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের।

তালিকায় থাকা দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ব র‍্যাংকিংয়ে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান ৭৩৩তম। বিশ্ববিদ্যালয়টির বিজ্ঞানবিষয়ক নানা গবেষণা রয়েছে। কয়েক বছর আগে গরুর খুরা রোগের ভ্যাকসিন উদ্ভাবন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের একদল গবেষক। এছাড়া খাদ্যে কী পরিমাণ সেলোমিনা ব্যাকটেরিয়া রয়েছে তা নির্ণয়, পরিবেশে ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ নির্ণয়, লবণ প্রতিরোধক ধান উৎপাদন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ, ভূমিকম্প, পোলট্রি ফার্ম থেকে কী ধরনের ব্যাকটেরিয়া সরাসরি পরিবেশে প্রবেশ করেছে, তা নিয়ে গবেষণা করেছে বিশ্ববিদ্যালয়টির বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউট।

চতুর্থ অবস্থানে থাকা বাকৃবির বৈশ্বিক অবস্থান ৭৫৪তম। কৃষি, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ গবেষণায় বাকৃবির অবদান নতুন নয়। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সিস্টেমের (বাউরেস) অধীনেই গত তিন দশকে এক হাজারের বেশি গবেষণা প্রকল্প সম্পন্ন করেছে বাকৃবি। চলমান রয়েছে আরো আড়াই শতাধিক প্রকল্প। বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রথমে আলোচনায় আসে কৃত্রিম মাছের প্রজনন গবেষণার মধ্য দিয়ে। পরবর্তী সময়ে ধান কাটার যন্ত্র বা থ্রেশার মেশিন এবং ঘাস নিড়ানো ও আগাছা নিধনে যন্ত্রপাতি উদ্ভাবনে আলোচনায় আসে। এছাড়া বিভিন্ন জাতের ফল ও মাছের জাত উদ্ভাবন নিয়েও গবেষণা হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়টি থেকে গ্রামীণ পর্যায়ে কৃষির যান্ত্রিকীকরণ নিয়ে সবচেয়ে বেশি গবেষণা হয়েছে। বাকৃবির গবেষকরা মনে করেন স্কপাস ইনডেস্ক জার্নালে প্রকাশনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফি বরাদ্দ থাকলে অনেক গবেষক তাদের গবেষণা প্রবন্ধ এসব জার্নালে প্রকাশ করতে পারবেন এবং ব্যাংকিং আরও আগানো সম্ভব হবে।

জাতীয় পর্যায়ে পঞ্চম অবস্থানে থাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক র‍্যাংকিংয়ে অবস্থান ৭৬১তম।

তালিকায় দেশী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ষষ্ঠ অবস্থানে থাকা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক অবস্থান ৭৬৬তম। গত বছর বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান ছিল ৬৬৬তম। সে হিসেবে ১০০ ধাপ অবনমন হয়েছে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের। সপ্তম অবস্থানে থাকা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক অবস্থান ৭৭৮তম। গত বছরের র‍্যাংকিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান ছিল ৭৭৫তম। অষ্টম অবস্থান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বৈশ্বিক অবস্থান ৭৯৩তম। গতবারের বিশ্ব র‍্যাংকিংয়ে বুয়েটের অবস্থান ছিল ৭৫৬তম। নবম অবস্থানে রয়েছে পুরনো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ব তালিকায় বিশ্ববিদ্যালয়টি অবস্থান ৭৯৯তম, যা গতবার ছিল ৭৫৫তম। আর দশম অবস্থানে থাকা শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৮০৪তম।

এছাড়া বিশ্ব র‍্যাংকিংয়ে স্থান পাওয়া অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৮০৬তম, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি ও নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি যৌথভাবে ৮১৫, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ৮২২, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ৮৩২, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি চিটাগং যৌথভাবে ৮৩৮, মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ৮৪৪ ও আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ ৮৪৬তম অবস্থানে রয়েছে।

এসআইআরে ১৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্থান পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি হলো সেন্টার ফর হেলথ অ্যান্ড পপুলেশন রিসার্চের, যেটি আইসিডিডিআর,বি নামেই পরিচিত। বিশ্ব র‍্যাংকিংয়ে এ প্রতিষ্ঠানের অবস্থান ৫৯৫তম। ডায়রিয়া ও কলেরা রোগের টিকা এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি রয়েছে আইসিডিডিআর,বির। জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে হাইতি, পাকিস্তানে কলেরা রোগ নিরাময়ে কাজ করে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে নানামুখী গবেষণা।

সুত্রঃ বণিক বার্তা

 

  •  
  •  
  •  
  •