করোনাযুদ্ধে অনলাইন শিক্ষা কেন নয়

সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন

নানা ঘাত প্রতিঘাতে বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থা অনেক নাজুক অবস্থায় আছে। কোন ক্রমেই উচ্চ শিক্ষায় মেধা সৃষ্টি করা যাচ্ছে না। প্রায় ১০ বছর মেয়াদি বিশ্ব ব্যাংকের ২ হাজার কোটি ঋনের টাকায় মূলত: সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা উন্নয়নে কার্যক্রম চলেছে। সাথে ছিল BdRen নামে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে শক্তিশালী ইন্টারনেট স্থাপনের জন্য আলাদা প্রকল্প। উক্ত প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি করে ভারচুয়াল ক্লাশ রুমও বিনির্মান করা হয়েছে। কাজেই অনলাইনে ক্লাশ না করার কোন অজুহাত থাকতে পারে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে বিশ্ব ব্যাংকের ঋনের টাকা যে হারে খরচ হয়েছে শিক্ষা উন্নয়নে তার কোন প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে না। আসলে কোথাও নেই জবাবদেহিতা ও দায়বদ্ধতা। ইন্টারনেটের অবস্থাও একই রকম।

তথ্য প্রযুক্তির এই দেশে প্রত্যন্ত এলাকাতেও ইন্টারন্টে সুবিধা আছে। তাই যে যাই বলুক শিক্ষার্থীদের সবার ইন্টারনেট নেই তা ঠিক না। যেখানে একেবারেই অসুবিধা সেখানে শিক্ষার্থীরা অনলাইন পাঠদানের সময়ে কাছাকাছি সুবিধাজনক জায়গায় গিয়ে অনলাইন শিক্ষা নিতে পারে।

ইতোমধ্যে কলেজগুলিতে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে অবস্থিত কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজেও বিগত এক মাস যাবত সফলতার সাথে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে অনায়াসেই অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা  অসম্ভব কিছু নয়।

ইউজিসি’র অনুমোদনের আগেই অনেকগুলি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। নামমাত্র শিক্ষার সাথে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার বিষয়টি এক্ষেত্রে লক্ষণীয়। অনেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সপ্তাহে দুই দিনে ৩/৪ টি ক্লাশ করে প্রকৌশল সহ বিভিন্ন টেকনিক্যাল বিষয়ে ব্যাচেলর ডিগ্রি প্রদান করা হচ্ছে । সেখানে অনলাইন বা অফলাইন প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয় নয়। বিষয় হলো কোন রকমভাবে চার বছর পার করা। অনেকে এটাকে ডিজিটাল ডিগ্রিও বলে থাকে। আবার কেউ কেউ বলে এটা মাইক্র (micro) ডিগ্রি। প্রায় সব কয়টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে অত্যন্ত সীমিত সংখ্যক জনবল দিয়ে ১৫/২০ টি ব্যাচেলর ডিগ্রি প্রদান করছে। কারা কি ভাবে তাদেরকে এসব ডিগ্রি প্রদানের অনুমোদন দেয় সেটাই বোধগম্য নয়। লেখাপড়াকে তারা পণ্যে পরিনত করেছে। সারাদিন টিভি’র স্ক্রলিং এ যে সব ডিগ্রি নাম প্রচার করা হয় তা অনেক গুলিই বোধগম্য নয়। কিন্তু এসবের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেবার কেউ আছে বলে মনে হয় না।

দেশের সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থা নানা সমস্যায় জর্জরিত। প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় কোন মেধা সৃষ্টি হচ্ছে না। রাখা হয়নি মেধা সৃষ্টির কোন সুযোগ। হচ্ছে না কোন জ্ঞান ভিত্তিক শিক্ষা। সত্যিকার অর্থে কারো কোন দায়বদ্ধতা নেই- না শিক্ষক, না শিক্ষার্থী, না কর্তৃপক্ষের। শিক্ষক দ্বারা শিক্ষার্থী মূল্যায়ন ও শিক্ষার্থী দ্বারা শিক্ষক মূল্যায়ন এখন পৃথিবীর সব দেশেই প্রচলিত পদ্ধতি।

আমার দেখা মতে দেশের উচ্চ শিক্ষা উন্নয়নের নামে “হেকেপ” এর মাধ্যমে প্রায় ১০ বৎসর মেয়াদি প্রকল্পের কর্মকান্ডে কিছু অবকাঠেমো উন্নয়ন ব্যতিত সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থায় কোন উন্নয়ন দৃশ্যমান নয়। এটি অত্যন্ত প্রায়োগিক ধারনা যে উচ্চ শিক্ষায় মেধা সৃষ্টি করতে না পারলে কোন উন্নয়নই টেকসই হবে না। বিশ্বের উন্নয়ন ও উন্নয়শীল কোন দেশই মেধাসম্পন্ন শিক্ষা ব্যতিত এ পর্যায় পর্যন্ত উন্নতি সাধন করতে পারেনি। যে কোন মূল্যেই হোক জবাবদেহিতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করে সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থাসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে যাতে মেধা সৃষ্টির পথ সুগম হয়। শিক্ষা যাতে পণ্যে রুপান্তরিত না হয় সে বিষয়ে জরুরীভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে হবে।

বর্তমানে করোনার আগ্রাসন যে ভাবে বিস্তৃত হচ্ছে তাতে বুঝা যাচ্ছে এটি বেশ দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। অনিশ্চিত এ অবস্থায় বসে না থেকে অনলাইনে শিক্ষা বা পাঠদান অব্যাহত রাখতে অসুবিধা কোথায়।  এই অনিদ্দিষ্ট সময়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া বন্ধ থাকলে শিক্ষার্থীদের জন্য তা সমুহ ক্ষতির কারন হবে। শিক্ষার্থীরা বিপথগামী হবে, সৃষ্টি হবে সমাজে বিশৃংখলা। আমরা তো হরহামেশাই বলছি বাংলাদেশ ডিজিটালের দিক থেকে বিশ্বে একটি অগ্রগামী দেশ। কাজেই দেশের স্বার্থে অবিলম্বে ডিজিটাল পদ্ধতি অনুসরন করে অনলাইন শিক্ষা চালু করায় কোন সমস্যা থাকার কথা নয়।

অনলাইন শিক্ষা চালু করার জন্য নিন্মোক্ত বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে-

১) ডিন কাউন্সিলের মাধ্যমে অনলাইন শিক্ষা পদ্ধতির নীতিমালা তৈরি করে তা চালু করার প্রস্তাব উপাচার্যের নিকট উপস্থাপন করা যেতে পারে,

ক) নীতিমালায় জরুরী পরিস্থিতি বিবেচনা করে সেলেবাসের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় অংশ পাঠদান করা যেতে পারে।

খ) বর্তমান সেমিস্টারের মেয়াদ বিশেষ বিবেচনায় আগষ্ট ২০২০ পর্যন্ত নির্ধারণ করা যেতে পারে এবং

গ) উক্ত সময়ের মধ্যে অনলাইন ক্লাশ, পরীক্ষা ও রেজাল্ট প্রকাশ করা যেতে পারে,

ঘ) বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অনলাইন শিক্ষা চালু করার জন্য বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত “Learning Management System” এর আওতায় বিভিন্ন সফটওয়ার যেমন Moodles বা সুবিধাজনক প্যাকেজের সাথে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করা যেতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর IT Cell এর মাধ্যমে এবং তা সকলের ব্যবহারের জন্য প্রচার করতে হবে,

২) উপাচার্য অর্ডিন্যান্স কর্তৃক তাঁর উপর অর্পিত ক্ষমতা বলে একাডেমিক কাউন্সিলে রিপোর্ট করার শর্তে ডিন কাউন্সিলের প্রস্তাব অনুমোদন করে প্রজ্ঞাপন জারি করার ব্যবস্থা করতে পারেন।

আমাদের দেশে অনেক প্রাইভেট স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতোমধ্যেই অনলাইন লেখাপড়া শুরু হয়েছে। কাজেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় তো বসে থাকতে পারে না! করোনার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং বাসায় বসেই দেশের কঠিন বিপর্যয় থেকে জাতিকে রক্ষা করতে হবে। জাতি ও শিক্ষার্থীদের স্বার্থে এবং আমাদের দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থা দ্রুত চালু করা এখন সময়ের দাবী।

 

লেখক: ড. সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন
সাবেক উপাচার্য, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

প্রফেসর, পশু প্রজনন ও কৌলিবিজ্ঞান বিভাগ
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়,ময়মনসিংহ

  •  
  •  
  •  
  •