প্রিয় হাশেম স্যারের এক বর্ণময় জীবন

রওশন জামাল জুয়েল, অস্ট্রেলিয়া

প্রিয় মা ও মাটিকে ভালবেসে ১৭ বছরের এক স্বপ্নবাজ ও সাহসী কিশোর একাত্তরে অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন জন্মভুমির স্বাধীনতার জন্য। যুদ্ধ শেষ হলো, আমরা পতাকা পেলাম। দুর্দান্ত মেধাবী এক বীর মুক্তিযোদ্ধা ভর্তি হলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। স্বপ্নবাজ এই কৃষিবিদ কর্মজীবন শুরু করলেন গবেষক হিসাবে ১৯৮০ সালে ও শিক্ষক হিসাবে ১৯৮১ সালে। মাটি, মা ও এদেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করে কেটে গেলো জীবনের ৪০ টি বছর। স্বাধীন দেশে ক্ষুধামুক্তির লড়ায়ে এদেশের মাটিকে আরও সুফলা আরও উর্বর করার প্রত্যয়ে এক জীবন কেটে গেলো বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগে। আলোর মশাল হাতে এক বাতিওয়ালা জীবন আলোকিত করলেন, কৃষিবিদদের অন্তরে প্রিয় মৃত্তিকার জন্য ভালবাসার মন্ত্রগেঁথে দিলেন জীবনভর। জ্ঞানের আলোয় জীবন আলোকিত করার মিশন শেষ, এখন ঘরে ফিরা। বেলাশেষের প্রকম্পিত আলোয় রণক্ষেত্র থেকে নিরবে বিদায় নেওয়ার পালা জাতির এক সূর্য সন্তানের। কৃষি অনুষদের সম্মানিত ডীন হিসাবে শ্রদ্ধেয় প্রফেসর ড. আবুল হাশেম স্যারের শেষ কর্মদিবস আজ। হাশেম স্যার ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৩তম ডীন। মুক্তিযুদ্ধ, শিক্ষকতা, গবেষণা, দেশ-বিদেশে বাংলাদেমে উপস্থাপনা, নেতৃত্ব সবমিলিয়ে এক বর্ণময় জীবন।

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের প্রথম ক্লাসটা ছিলো এ্যাগ্রোনমি। খুব গম্ভীর ক্লাস নিয়েছিলেন ড. মামুন স্যার। সয়েল সায়েন্স ক্লাসে আসলেন সুদর্শন হাস্যোজ্জল এক অধ্যাপক-ড. আবুল হাশেম স্যার। আন্তরিক ও প্রাঞ্জল শুভেচ্ছা বক্তব্যের পর মৃত্তিকার সংগা দিয়ে শুরু। মানুষ সৃষ্টির আদিকথা, মাটির দেহঘড়ি,মৃত্তিকার জীবন দর্শন, মাটি ও মায়ের অদৃশ্য মিল, মাটির সম্ভ্রম রক্ষায় লড়াই, রক্ত রঞ্জিত জন্মভুমি, মাটির মায়া, মাটিতে চিরনিদ্রা- সব মিলিয়ে কিশোর হৃদয়ে মৃত্তিকাময় এক অবিনস্বর চেতনা জ্বেলে দিলেন আমাদের প্রিয় হাশেম স্যার। প্রথম ক্লাস থেকেই হাশেম স্যার হয়ে গেলেন এক আস্থার নাম, উদ্দীপনার নাম, এক বাতিওয়ালার নাম।মৃত্তিকা অনুজীব, মৃত্তিকা রসায়ন, ভূতত্ত্ব, হাইড্রোলজি, মৃত্তিকা গঠনের লক্ষ-কোটি বছরের ইতিহাস এমনভাবে পড়ালেন হাশেম স্যার, প্রিয় মৃত্তিকা হয়ে উঠলো সবচেয়ে বড় বিজ্ঞান, বড় বিস্ময়, সবচেয়ে মজার বিষয়। বীরের রক্তে রঞ্জিত, সুজলা-সুফলা এই বঙ্গীয় বদ্বীপ আমাদের অস্তিত্বের স্মারক, চেতনার উত্তরাধীকার,মায়ের আঁচল। ১৮ কোটি বঙ্গসন্তানের মুখে অন্ন তুলে দিতে ক্লান্ত অবসন্ন স্বদেশের প্রিয় মৃত্তিকা।

হাশেম স্যার সারাজীবন কান পেতে শুনেছেন মাটির কান্না, আর্তনাদ আর ভাঙ্গা-গড়ার ইতিহাস। পলি মাটির গন্ধ বুকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছেন ক্ষুধামুক্ত সমৃদ্ধ এক বাংলাদেশের।নিরবে গবেষণা করেছেন মাটির স্বাস্থ্য, মাটির জীবন,উর্বরতা- উৎপাদনক্ষমতা নিয়ে। মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনার আধুনিক প্রযুক্তির সাথে কৃষকের ও কৃষিবিদদের ঘাম-শ্রম মিশে বাংলার মাটিই এখন বিশ্বে সবচেয়ে উর্বর, সবচেয়ে সুফলা। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে রচিত হয়েছে এই মাটিকে আরও উৎপাদনশীল করার নিরব কর্মযজ্ঞ। সোনাফলা এই মাটিতে ফলেনা এমন ফসল খুব কম। এই মাটি এখন বিশ্বের বিস্ময়। এই মাটির ভাষা বুঝা এক স্বপ্ন কারিগর ছিলেন আমাদের প্রিয় হাশেম স্যার। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অত্যন্ত মেধাবী ও চৌকশ প্রফেসর ড. আবুল হাশেম পিএইচডি ও পোস্ট-ডক্টরাল রিসার্স করেছেন যুক্তরাজ্য থেকে ।

কৃত্রিমতা আর জটিলতা-কুটিলতার জগৎ-সংসারে আমরা নির্মল-নিষ্পাপ হাসি ভুলে গেছি। হাশেম স্যারের মত নির্ভেজাল নিষ্পাপ হাসি আমাদের চারপাশে বিরল। তিনি সকল ছাত্রের মঙ্গল কামনা করা একজন শিক্ষক। যে মাটির মানুষের (সরল) কথা আমরা বলি হাশেম স্যার সেই ‘মাটির মানুষ’,সবার অন্তরের বান্ধব।
আমার অবাসন সীট হলো শহীদ জামাল হোসেন হলে। স্যার তখন ঐ হলের হাউস টিউটর (জেনারেল)। প্রতিটা ঘরে ঘরে গিয়ে খোজ নিয়েছেন ছাত্রদের অবস্থা। কতরকমের সমস্যার কথা স্যার মায়ের মত শুনেছেন। স্যারের সাথে দু’দন্ড কথা বললেই উড়ে যেত সব কষ্ট । ছোট-খাটো কত বিষয় নিয়ে ছিলো স্যারের প্রাণখোলা হাসি-উল্লাস। হাঠাৎ রাস্তায়, ডিপার্টমেন্টে অথবা অন্য কোনখানে দেখালেই হাসিমুখে সাবলিল জিজ্ঞাসা ‘ জুয়েল কেমন আছো? কেমন চলছে সবকিছু?

এই নির্মল হাসির মানুষটার শিশুর মত কান্নাও দেখেছি। ২০০০ সালের ১৭ ডিসেম্বর, স্যারের অষ্টম শ্রেনীতে পড়া পুত্র সাইলাস ব্রহ্মপুত্রে ডুবে নির্মমভাবে মারা যায়। আমরা সেদিন দৌড়ে গিয়েছিলাম স্যারের বাসায়। স্যারের সেদিনের কান্না, হাহাকার ভারী করে তুলেছিলো বাকৃবি’র সবুজ চত্বর আর আকাশ-বাতাস। আমি এখন বাবা হয়েছি, আমার ছেলেও পড়ে অষ্টম শ্রেনীতে। চোখ বন্ধ করে স্যারের সেদিনের আকাশভাঙ্গা কান্না বুকে ধারণ করার চেষ্টা করি, পারিনা নিতে।সাইলাসের কবর ছিলো শহীদ জামাল হোসেন হলের পাশেই (শেষ মোড়) কবরস্থানে। জুমার নামাজ পড়ে স্যারের সাথে অনেকবার কবর জিয়ারত করতে গেছি। প্রতিবারই স্যারের কান্না, চোখের জল আমাদের দারুনভাবে স্পর্শ করতো, আমরাও কান্না আটকাতে পারতামনা। স্যারের চেম্বারে গেলে সাইলাসের ছবি দেখিয়ে স্যার চোখের জল বিসর্জন দিতেন নিরবে। আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি স্যারের কাছে এই করুন অতীতের অবতারনা করার জন্য।

আমাদের প্রিয় হাশেম স্যার চলে যাচ্ছেন অবসরে স্বপ্নের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে, গবেষণাগার থেকে। আমাদের দেশে অবসরে যাওয়া মানবসম্পদ নিয়ে তেমন কোন ভাবনা নেই। আধুনিক বিশ্বে সিনিয়র সিটিজেনদের সম্মানীত করার জন্য, ভাল রাখার জন্য কত ধরনের আয়োজন। যোগ্যতা ও পছন্দ অনুযায়ী তারা নানা রকম কাজে ব্যস্ত। শিক্ষক-গবেষকরা নানারকম ‘ইনটেলেকচুয়াল’ কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করে ব্যস্ত সময় পার পরে। আমাদের দেশে একজন পেশাজীবি অবসর নিয়ে সমাজের বোঝা হয়ে দিন গুনতে থাকে। রাজনৈতিক সরকার তাদের ‘চেতনার রঙ’ হিসাব করে দু’একজনকে এমেরিটাস প্রফেসর, জাতীয় অধ্যাপক নাম দিয়ে স্বীকৃতি দেওয়ার চেষ্টা করে। ক্ষমতাসীনের চেতনার সাথে মিললে, দক্ষতার সাথে দলবাজী করলে হয়তো কেউ কেউ কিছু সম্মানজনক রাষ্ট্রীয় দায়িত্বও পালন করেন। ‘ইনেটেলেকচুয়াল’ জগতে কোন জায়গা না পেয়ে অনেকে এমপি-মন্ত্রী হওযার জন্য দৌড়াদৌড়ি করে, কেউ কেউ হয়েও যায়। অবসরে যাওয়ার পর কর্মময়, সুশৃংখল জীবনে ছেদ পড়ে। সিনিয়র সিটিজেনদের বিষয়ে কারও যেন কোন দায় নেই। অবসরে যাওয়া মানেই সব সম্ভাবনা শেষ হয়ে যাওয়া নয়। প্রফেসর জিম পিবলসএবছর পদার্থ বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ৯৭ বছর বয়সে, আর্থার আশকিন নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন ৯৬ বছর বয়সে। উইনস্টোন চার্চিল সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন ৭৯ বয়সে। শিক্ষক-গবেষকের কোন ক্লান্তি নেই, কোন রিটায়ারমেন্ট নেই, তারা ওয়ারেন্ট অব প্রেসিডেন্স অথবা গ্রেড হিসাব করে গবেষণা করে না। বৈশ্বিক ‘বডি অব নলেজ’একজন শিক্ষক-গবেষকের ৩৫-৪০ বছরের অভিজ্ঞতা-প্রজ্ঞার মুল্য মিলিয়ন ডলার। উন্নত বিশ্বে মস্তিস্ক যতদিন সুস্থ থাকে ততদিন গবেষনা চালিয়ে যান একজন শিক্ষক-গবেষক।জীবনের সব হিসাব চুকানো একজন প্রবীন অধ্যাপক-গবেষক সুযোগ পেলে, স্বীকৃতি পেলে সাধ্যের সবটুকু দিয়ে যেতে চান পৃথিবীকে, সভ্যতাকে।

সবুজ বিপ্লবের অন্যতম স্বপ্নকারিগর, বিশ্ব খাদ্য পুরস্কার জয়ী এমএস সোমিনাথনের বয়স এখন ৯৪ বছর, তিনি সারা পৃথিবী চষে বেড়াচ্ছেন আগামীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চত করার ভিশনারী বক্তব্য নিয়ে, গবেষণা সমন্বয় করে। এখনও কৃষি বিজ্ঞানীদের আইডল নরম্যান বোরলগ, সোমিনাথান, ড. বদরুদ্দোজা চৌধুরী- যারা অবসরের সীমানা ডিঙ্গিয়ে সভ্যতাকে দিয়েছেন আলোর পথ। চাকুরী শেষে হাশেম স্যারদের মত অসংখ্যা শিক্ষক-গবেষকের সমস্ত সম্ভাবনা, স্পৃহা আধারে ডুবে যায়। গবেষণার বাকীকাজটুকু একটু সুযোগ পেলেই করতে পারতেন একজন প্রবীন গবেষক, কিন্তু এ সুযোগ আমরা করে দেয়না। অবসরে এই মানুষগুলোকে জায়গা করে দিলে তাদের দিনও ভাল কাটতো, দেশ-জাতিও লাভবান হত। যাতে চাকুরী থেকে অবসর নিলেও গবেষণার একটা প্লাটফর্ম ও সাপোর্ট পায় সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে সরকারের সাথে কর্পোরেট জগৎও সুশীর সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে।

ড. হাশেম স্যারের ২০-২৫ হাজার ছাত্র-ছাত্রী ছড়িয়ে আছে দশ দিগন্তে। আমি হাশেম স্যারের নিতান্তই এক অধম ছাত্র । কৃষি অনুষদের ডীন হিসাবে স্যারের আজ শেষ কর্মদিবস। ভার্সিটিতে ক্লাস শুরু করে প্রথম ডীন পেয়েছিলাম প্রফেসর ড. আব্দুল হক স্যারকে। তখন বুঝেছিলাম ডীন পদটি একটি অনুষদের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদ। প্রিয় হাশেম স্যারের সাথে দেখা নেই বহুদিন। আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছিলো স্যারের শেষ কর্মদিবসে স্যারকে একটা স্যালুট জানিয়ে বলবো ‘A Professor never retires, a patriot never dies, a candle of love never puts off ;স্যার, আমরা গর্বিত আপনার জন্য, এ মাটি ধন্য আপনার বীরত্বের জন্য। পতাকার জন্য লড়াই করা মহাবীর, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান, সকলের প্রিয় হাশেম স্যারকে দীপ্ত স্যালুট ও রক্তিম ভালবাসা। আমাদের প্রিয় হাশেম স্যার ছিলেন, আছেন, থাকবেন হাজার শাপলা হয়ে অন্তরে অন্তরে – সারা বাংলায়।

 

লেখকঃ রওশন জামাল জুয়েল
সিভিল সার্ভেন্ট, বিসিএস (কৃষি)
পিএইচডি ফেলো, ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া
roushonjamal@yahoo.com

  •  
  •  
  •  
  •