ভারতে কুম্ভমেলা ও বাংলাদেশে ঈদ যাত্রা, পরিণতি কি একই?

mela

নিউজ ডেস্কঃ করোনাভাইরাসের বিধ্বংসী দ্বিতীয় ঢেউ সামলাতে ভারত যখন লড়াই করছে ঠিক তখনি হিমালয় অঞ্চলের শহর হরিদ্বারে কুম্ভ মেলায় লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ হিন্দু সমবেত হয়েছিল।

অনেকেই আশংকা করেছিল, এই কুম্ভ মেলা এক “সুপার-স্প্রেডার ইভেন্ট”, অর্থাৎ করোনাভাইরাস ব্যাপকভাবে ছড়ানোর এক বড় অনুষ্ঠানে পরিণত হবে। সেই আশংকাই সত্যি হয়েছে।

দেশটিতে প্রতিদিন হাজারের অধিক মানুষের মৃত্যু এবং প্রায় চার লাখ আক্রান্ত হচ্ছে। গণমাধ্যমে সেই হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখছি আমরা। শ্মশানে মৃতদেহ পোড়ানোর কাঠ সংকট হচ্ছে। আবার দীর্ঘ অপেক্ষার পরেও মৃতদেহ দাহ করা যাচ্ছে না। অপেক্ষমান মৃতদেহ নিয়ে কুকুরের টানাটানির ছবিও আমরা পত্রিকায় দেখেছি। এর চেয়ে মর্মান্তিক পরিস্থিতি আর কি হতে পারে!

শুধু ভারত নয়, আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র নেপালের অবস্থাও ভালো নয়। ছোট্ট এই দেশটিতে করোনা মহামারি সংকট তৈরি করেছে। পাকিস্তানেও খারাপ হচ্ছে করোনা পরিস্থিতি। এরই মধ্যে আমাদের দেশে ভারতের করোনা ভ্যারিয়েন্ট কয়েকজনের দেহে শনাক্ত হয়েছে। বিষয়টি অবশ্যই উদ্বেগের।

কিন্তু সাধারণ মানুষ এ ব্যাপারে উদাসীন। করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি উপেক্ষা করে মানুষ বাড়ি ফিরছে। দূরপাল্লার বাস, লঞ্চ ও ট্রেন বন্ধ থাকায় বিকল্প উপায়ে মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার, সিএনজি অটোরিকশা, পিকআপ, মোটরসাইকেলসহ ছোট ছোট যানবাহনে চড়ে যাচ্ছেন তারা।
cc
পথে পথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যারিকেড ও দিনে ফেরি চলাচল সীমিত রেখেও এদের আটকানো যায়নি। উল্টো তাদের উপচে পড়া চাপে ফেরির সংখ্যা বাড়াতে বাধ্য হয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন। জরুরি পরিষেবার জন্য চালু রাখা ফেরিতে গাড়ির বদলে গাদাগাদি করে মানুষ যেতে দেখা গেছে।

আমাদের দেশে এখনও করোনায় আক্রান্ত এবং মৃতের সংখ্যা এখনও সন্তোষজনক হারে নেমে আসেনি। কিন্তু এই বাড়ি ফেরা মানুষগুলোর যাত্রা যেমন নিরাপদ, দুর্ভোগহীন করার কোনও প্রচেষ্টা নেই তেমনি তাদের স্বাস্থ্যবিধি মানতে বাধ্য করতেও দেখা যাচ্ছে না।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, ঈদের পরে আমাদের দেশের অবস্থাও ভারত ও নেপালের মতোই ভয়াবহ হতে পারে। তিনি বলেছেন, পাশের দেশ ভারতে করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্টের কারণে প্রতিদিন হাজারো মানুষ মারা যাচ্ছে। এই ভ্যারিয়েন্ট এখন আমাদের দেশেও চলে এসেছে।

বাড়িফেরা নিয়ে সতর্ক করেছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপনে গ্রামের বাড়ি যেতে ছোটাছুটি না করতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, ‘এতে আপনজনের জীবনই হুমকির মুখে পড়বে। একটা ঈদে কোথাও না গিয়ে নিজের ঘরে থাকলে কী ক্ষতি হয়? আপনারা ছোটাছুটি না করে যে যেখানে আছেন সেখানেই থাকেন। সেখানেই নিজের মতো করে ঈদ উদযাপন করুন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি জানি ঈদের সময় মানুষ পাগল হয়ে গ্রামে ছুটছেন। কিন্তু আপনারা যে একসঙ্গে যাচ্ছেন, এই চলার পথে ফেরি বা গাড়ি যেখানে হোক কার যে করোনাভাইরাস আছে আপনি জানেন না। কিন্তু আপনি সেটা বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন আপনার পরিবারের কাছে। মা-বাবা, দাদা-দাদি যেই থাকুক আপনি তাকেও সংক্রমিত করবেন এবং তাদের জীবনও মৃত্যুর ঝুঁকিতে ফেলে দেবেন।’

হরিদ্বারে কুম্ভ মেলার ক্ষেত্রে রোগতত্ত্ববিদ ডাঃ ললিত কান্ত বলছেন, “মাস্ক না পরে তীর্থযাত্রীদের বড় বড় দল যখন নদীর তীরে দাঁড়িয়ে গঙ্গার বন্দনা করছে”, তখন আসলে এটি দ্রুত ভাইরাস ছড়ানোর এক আদর্শ পরিবেশ তৈরি করছে। “আমরা জানি যে গির্জায় কিংবা মন্দিরে যখন সমবেত মানুষ এক সঙ্গে কোরাসে গান গায়, সেটি তখন একটি ‘সুপার-স্প্রেডার ইভেন্টে’ পরিণত হয়।”

বাংলাদেশেও বর্তমানে একই অবস্থা। ভারতের এমন অবস্থা তৈরির পেছনে সেখানকার নির্বাচনী সমাবেশ, ধর্মীয় মেলা অর্থাৎ বিপুল মানুষ সমাগম হয় এমন সিদ্ধান্তগুলোকেই দায়ী করা হচ্ছে। এই একই ভুল কিন্তু আমরাও করছি। আমরা বাস্তব সত্যকে অস্বীকার করতে চেয়েছি। এর পরিণতি কী হবে তা এখন বলা সম্ভব না। তবে স্বাস্থ্যবিধি না মেনে ঈদ যাত্রা দেশের করোনা পরিস্থিতিকে আরও অবনতির দিকে নিয়ে যেতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

  •  
  •  
  •  
  •  
ad0.3

Tags: ,