তামাক ও ধুমপান: এক শক্তিশালী বায়বীয় ঘাতক

তামাকের বৈজ্ঞানিক নাম Nicotiana tabacum/Nicotiana rustica এবং এটি Solanaceae পরিবারের সদস্য। ধারণা করা হয় তামাকের আদি নিবাস দক্ষিণ আমেরিকায়। এখন অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র, চীন(উৎপাদনে শীর্ষ দেশ), ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন, ব্রাজিল, জাপান, তুরস্ক প্রভৃতি অনেক দেশেই যথেষ্ট তামাক উৎপন্ন হয়।

বাংলাদেশের রবি মৌসুমে ব্যাপক তামাকের চাষ হয়। এর মধ্যে কুষ্টিয়া (উৎপাদনের শীর্ষে), রংপুর, যশোর, রাজশাহী, সিলেট, বগুড়া ও ময়মনসিংহ এলাকায়ও কিছু ভার্জিনিয়া তামাকের চাষ হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ৬৫ হাজার হেক্টর জমিতে বার্ষিক প্রায় ৪২ হাজার মেট্রিক টন তামাক উৎপন্ন হয়।

বহুজাতিক এবং দেশি তামাকজাত শিল্পকারখানার সহযোগিতায় রংপুর, কুষ্টিয়া ও সিলেটে উন্নতমানের তামাক চাষ হচ্ছে। ইদানিং যশোর অঞ্চলে শৈলকুপা, ঝিনাইদহ, হরিনাকুন্ড, কোট-চাঁদপুর এবং কুষ্টিয়া অঞ্চলের চুয়াডাঙ্গা, আলমডাঙ্গা, দৌলতপুর, মিরপুর, ভেড়ামারা ও সদর এলাকায় বৃটিশ আমেরিকান টোবাকো কোম্পানি ও জাপান টোবাকো কম্পানির তত্ত্বাবধায়নে বার্ষিক প্রায় তিন হাজার হেক্টর জমিতে উন্নতমানের ভার্জিনিয়া তামাকের আবাদ করা হয়।

নামকরণঃ

তামাকের ইংরেজি নাম ‘Tobacco’ এসেছে স্প্যানিশ “tabaco” শব্দ থেকে যার উৎপত্তি আরাওয়াকান ভাষা থেকে। ক্যারিবীয় অঞ্চলের তাইনো ভাষাতে এটি তামাক পাতার রোল অথবা ইংরেজি Y বর্ণের আকৃতির ধূমপানের একটি নলকে বোঝায়। যাহোক, ১৪১০ সাল থেকে একই রকম স্প্যানিশ ও ইতালীয় শব্দ ঔষধী উদ্ভিদ বোঝাতে ব্যবহার করা হয়েছে।

তামাকের ব্যবহারঃ

তামাক একটি অন্যতম নেশা জাতীয় ফসল বা ইংরেজিতে Narcotic Crops। ধূমপানের উদ্দেশ্যে সিগারেট, বিড়ি, পাইপ ও হুক্কা, চিবিয়ে খাওয়ার জন্যে জর্দা, দোক্তা, খৈনী এবং নাকে দেয়ার জন্য নস্যি, মুখে দেয়া-দাঁত মাজার জন্যে গুল ইত্যাদি বিভিন্ন উদ্দেশ্যে তামাক ব্যবহৃত হয়।

তামাকের প্রজাতি ও জাতঃ

তামাকের দুটি প্রজাতি ভার্জিনিয়া (Nicotiana tobacum) এবং বিলাতি বা মতিহারি (Nicotiana Rustica) তামাক এদেশে চাষ করা হয়। ভার্জিনিয়া দ্বারা সিগারেট ও চুরুট প্রস্তুত হয় এবং ২য়টি দ্বারা হুক্কায় ব্যবহৃত তামাক তৈরি হয়।

বাংলাদেশ তামাক উন্নয়ন বোর্ড নিম্নলিখিত জাতসমূহ এদেশে আবাদের জন্য নির্বাচন করেছেঃ
(১) সিগারেট তামাক হিসেবে
(ক) হ্যারিসন স্পেশাল
(খ) সেসমারিয়া
(গ) N.C – ৯৫
(ঘ) পোকার-২৫৪
(ঙ) হোয়াইট বার্লি
(চ) স্পেট জি
(ছ) ভার্জিনিয়া গোল আরিনকো।

(২) চুরুট তামাক হিসেবে
(ক) সুমাত্রা (চুরুট জড়ানোর (Wrapper) জন্যে)
(খ) ম্যানিলা
(গ) কেয়ামন (চুরুট ভর্তির (filler) জন্যে)

(৩) বিড়ি তামাক হিসেবে
(ক) কেলিও
(খ) নিপনী

(৪) হুক্কা তামাক হিসেবে
(ক) মতিহারী
(খ) ভেংগি
(গ) T – ৫০

ফলনঃ

বাংলাদেশে স্বাভাবিকভাবে উৎপাদিত তামাকের হেক্টর প্রতি ফলন গড়ে ৭৫০-৯০০ কেজি (একরে ৮-১০ মণ)। যথাযথ পরিচর্যা করে হেক্টর প্রতি ১৪ কুইন্টাল ফলন (পাতা শোধন করার পরে ফলন নির্ণয় করা হয়) পেয়েছে বলে জানা গেছে।

তামাকের উৎপত্তি সংক্রান্ত ইতিহাসঃ

স্বাস্থ্যের উপর তামাকের প্রভাব সংক্রান্ত উদ্বেগ নিয়ে সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। Gideon Lincecum নামক একজন আমেরিকান প্রকৃতিবিজ্ঞানী ও বোটানিক্যাল মেডিসিনের চিকিৎসক উনিশ শতকের প্রথমদিকে তামাক সম্পর্কে লিখেছিলেন, “অনেক প্রবীণ চিকিৎসক এই বিষাক্ত গাছকে ঔষধ হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছেন এবং এর দ্বারা হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে…. এটি অত্যন্ত ভয়ানক বস্তু।”

আমেরিকা মহাদেশের দেশ মেক্সিকোতে ৬০০-৭০০ খ্রিস্টাব্দের দিকেও তামাক চাষের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। ন্যাটিভ আমেরিকনাদের মাঝে তামাক চাষ প্রচলিত ছিল। তামাক হলো ধুমপানের প্রধান উপকরণ। আর ধূমপানের সবচেয়ে জনপ্রিয় দুটি মাধ্যম বিড়ি এবং সিগারেট। আসলে ধূমপানের ইতিহাস সভ্যতার মতোই প্রাচীন। সেই প্রাচীন কালেই ব্যাবলনীয় ও মিশরীয়দের মধ্যে ধূমপানের প্রচলন ছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ অব্দে প্রাচীন মিশরীয়রা ‘ক্যানাবিস’ নামক ধূমপানের প্রচলন করেছিল। যা ছিল আমাদের দেশের হুক্কার একটি রূপ।

১৬ শতকে আমেরিকাতে প্রথম তামাকের চাষ শুরু হয়। ১৮৬৫ সালে ‘ওয়াশিংটন ডিউক’ নামে আমেরিকার এক ব্যক্তি প্রথম হাতে তৈরি সিগারেট উদ্ভাবন করে। ১৮৮৩ সালে জেমস বনস্যাক নামে আর এক আমেরিকান সিগারেট তৈরির যন্ত্র উদ্ভাবন করে। যা থেকে দিনে প্রায় এক হাজার সিগারেট তৈরি করা যেত। মোঘল চিত্রকলা অনুযায়ী, ভারতীয় উপমহাদেশে ধূমপানের প্রচলন ঘটান মুঘলরা। তামাকের সাহায্যে ধূমপানকে পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে দেয় ইউরোপীয়ানরা।

আমেরিকা মহাদেশে ইউরোপীয়দের পা ফেলার সাথে সাথে বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে তামাক পাতা ব্যবহার শুরু হয়। স্পেনের রাজা ফিলিপ দ্বিতীয় এর আদেশে ১৫৫৯ সনে তামাকের বীজ ইউরোপে নিয়ে আসা হয়। কিউবা ও ক্যারিবিয়ান দ্বীপুঞ্জের অন্যান্য জায়গায় ১৮ শতকের দিকে তামাক বিক্রয়ের জন্য চাষাবাদ করা হত।

তামাকে আয়ের চেয়ে ক্ষতি বেশিঃ

তামাক ও তামাকজাত পণ্য উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো থেকে প্রতিবছর সরকারের যে রাজস্ব আদায় হচ্ছে, পরোক্ষভাবে তার চেয়ে বেশি খরচ হচ্ছে তামাকজনিত রোগে আক্রান্ত লোকদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়ের জন্য। তামাক সেবনের কারণে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে জিডিপিতেও।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২-১৩ অর্থবছরে সিগারেট থেকে ৯ হাজার ৯৩০ দশমিক ৮৯ কোটি টাকা ও বিড়ি থেকে ২৩০ দশমিক ৬৪ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করা হয়। আর ২০১৩-১৪ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয় সিগারেট থেকে ১২ হাজার ২৬৭ দশমিক শূন্য ৩ কোটি টাকা ও বিড়ি থেকে ২৭৭ দশমিক ৯৭ কোটি টাকা। তামাক খাতে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব দেওয়া বহুজাতিক তামাক কোম্পানি ব্রিটিশ-আমেরিকান টোব্যাকো জানায়, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে তারা বাংলাদেশ সরকারের কোষাগারে রাজস্ব দিয়েছে ৯ হাজার ৯৩২ কোটি টাকা। আর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তারা রাজস্ব দেয় ১১ হাজার ৫১ কোটি টাকা।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা বাংলাদেশ ন্যাশনাল টোব্যাকো কন্ট্রোল সেলের (এনটিসিসি) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভাল্যুয়েশনের (আইএইচএমই) ২০১৩ সালে করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর তামাকজনিত রোগে মারা যায় ৯৫ হাজার মানুষ। পঙ্গুত্ব বরণ করে আরও কয়েক লাখ। এসব ক্ষেত্রে রোগীদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার জন্য খরচ তামাক খাত থেকে পাওয়া রাজস্বের অনেক বেশি।

এ ছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০০৪ সালে করা এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বাংলাদেশের ১২ লাখ মানুষ তামাক ব্যবহারজনিত নানা ধরনের দুরারোগ্য ব্যাধি যেমন বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার, হৃদরোগ, স্ট্রোক, যক্ষ্মা, প্যারালাইসিস, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্টসহ প্রধান আটটি রোগে আক্রান্ত হয়। এর ফলে রোগীর চিকিৎসা, অকালমৃত্যু, পঙ্গুত্বের কারণে বছরে দেশের অর্থনীতিতে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়।

তামাক ব্যবহারের ফলে দেশের অর্থনীতিতে বছরে নিট ক্ষতির পরিমাণ ওই সময় অনুযায়ী ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। প্রতিবছর সিগারেট ক্রয়ে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ শতাংশ ও বিড়ি ক্রয়ে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ ব্যয় হয়। বর্তমানে এই ক্ষতির পরিমাণ স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেড়েছে।

তামাক চাষে মাটির ক্ষয়ঃ

মাটি বাংলাদেশের অমূল্য সম্পদ। তামাক চাষের ফলে মাটি ক্ষয় হয়, উর্বরতা কমে যায়। দেখা যায়, তামাকের এক ফসলে একরে ৩০০০ পাউন্ড পাতা এবং ৩০০০ পাউন্ড কান্ড উৎপাদনে মাটি থেকে নাইট্রোজেন ১২৬, ফসফরাস ২৬, পটাশ ২৫৭, ক্যালসিয়াম ৭৫, ম্যাগনেশিয়াম ১৯, তামা ০.০৩, ম্যাঙ্গানিজ ০.৫৫ এবং জিঙ্ক ০.০৭ পাউন্ড তুলে নেয়।

তামাক বাংলাদেশে একটি বহিরাগত আগ্রাসি প্রজাতির উদ্ভিদ। গত শতাব্দীর ষাটের দশক থেকে রবি মৌসুমে খাদ্য শস্যের জমিতে তামাক চাষ শুরু হয়। বৃটিশ আমেরিকান টোবাকো কোম্পানি প্রথমে তিস্তা অববাহিকায় তামাক চাষ প্রবর্তন করে। পরে পদ্মা অববাহিকায় কুষ্টিয়া অঞ্চলে এবং সাম্প্রতিক কালে পার্বত্য চট্রগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে মাতামহুরী অববাহিকায় সম্প্রসারিত হয়। সাম্প্রতিক কালে তামাক চাষ বেড়েই চলছে। ২০০১ সালে ৭৩,৮৭০ একর জমিতে তামাক চাষ হয়। ২০১১-২০১২ মৌসুমে ১,২৬,০০০ একর জমিতে তামাক চাষ সম্প্রসারিত হয় (বিবিএস ২০১২)।

খাদ্য শস্যের জমি দখল করে তামাক চাষ করা হয়। খরিপ-২ মৌসুমের শেষ ভাগ, রবি মৌসুম পুরাপুরি এবং খরিপ-১ মৌসুমের প্রথম ভাগ দখল করে। ফলে নিবিড় ফসলের এলাকায় তিনটি ফসলের সময় জমি জবর দখল করে তামাকের একটি ফসল আবাদ হয়।

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রধানত তিন জাতের তামাক, যেমন- জাতি, মতিহারি এবং ভার্জিনিয়া আবাদ করা হয়। জাতি এবং মতিহারি প্রধানত রংপুর এবং বান্দরবানে আবাদ করা হয়। ভার্জিনিয়া প্রধানত কুষ্টিয়া, রংপুর, যশোর এবং মানিকগঞ্জে আবাদ করা হয়। সীমিত পরিমাণ জমিতে বার্লি জাতের তামাক আবাদ হয়।

এক গবেষণায় দেখা গেছে যে কৃষকরা প্রতি হেক্টর জমিতে ৫৭৫ কেজি ইউরিয়া এবং ৪৬৬ কেজি টিএসপি ব্যবহার করেন। তাছাড়া তামাকের এক ফসলে ১৬ বার বালাইনাশক স্প্রে করেন। তামাকের ক্ষেতে ৪৭ রকমের বালাইনাশক ব্যবহার করা হয়।

তামাক চাষের ফলে মাটির উর্বরতা নষ্ট হয়। মাটি শক্ত হয়ে যায়। অন্য ফসল ভাল হয়না। যেমন ধান পাকার আগে গাছ শুকিয়ে যায়। স্থানীয় অন্য জাতের ফসল আবাদ না করার কারণে বীজ হারিয়ে যায়।

তামাক ক্ষেতঃ

পৃথিবী ব্যাপি আবাদী জমির ০.৩% তামাক চাষে ব্যবহার হয়। গণ সচেতনতার কারণে বিশ্বব্যাপি তামাক চাষের এলাকা কমছে। ১৯৯০ সালে ৪.৬ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়েছিল। এরপর তা ক্রমহ্রাসমান।

অর্থকরী ফসলের তালিকায় তামাক কেন?

অর্থনীতির দিক থেকে তামাক একটি অদ্ভুত এবং ক্ষতিকর পণ্য। তামাক ব্যবহারের কারণে প্রতি বছর ১ লাখ ২৬ হাজার মানুষ অকালে মৃত্যুবরণ করে। অকালে মৃত্যুবরণ একটি পরিবারে আর্থিক, সামাজিকভাবে দুর্দশা বয়ে আনে। অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ (চিকিৎসা ব্যয় ও উৎপাদনশীলতা ক্ষতি) ৩০ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা। এদিকে তামাক কোম্পানিগুলো বছরে তামাকপণ্য বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা আয় ও মুনাফা করতে পারে। তারা সরকারকে ২২ হাজার ৮১০ কোটি টাকা রাজস্ব দেয়। এই পরিমাণ রাজস্ব আর অন্য কোনো খাত থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এককভাবে পায় না, ফলে তারা মনে করাতে চায় তামাক কোম্পানি অনেক উপকারী। কিন্তু সহজ হিসাবেই দেখা যাচ্ছে সরকারের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ৭ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা ঘাটতি আছে যা (জিডিপির ১.৪%)।

স্বাস্থ্যের উপর তামাকের প্রভাবঃ

১৯৫০ সালে Richard Doll নামক বিজ্ঞানী, ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালে একটি গবেষণা প্রকাশ করেন যেখানে তিনি ধূমপান ও ফুসফুস ক্যান্সারের একটি সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন। এর ঠিক চার বছর পর ১৯৫৪ সালে ব্রিটিশ ডক্টরস স্টাডি নামক আরেকটি গবেষণা প্রকাশ করা হয়, যেটি চল্লিশ হাজার ডাক্তারের কুড়ি বছর ধরে করা গবেষণার ফলাফল। সেখানে ধূমপানের সাথে ফুসফুসের সম্পর্কের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয় যার উপর ভিত্তি করে সরকার ঘোষণা করে যে ধূমপানের ফলে ফুসফুস ক্যান্সারের হার বৃদ্ধি পায়।

১. তামাক মূলত হৃৎপিণ্ড, লিভার ও ফুসফুসকে আক্রান্ত করে। ধূমপানের ফলে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (COPD), এমফাইসিমা ও ক্রনিক ব্রংকাইটিস সহ অনেক রোগ সৃষ্টি হয়। সিগারেটে প্রায় পঞ্চাশ এরও বেশি রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে যারা মানব শরীরে ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে যেমন- ফুসফুস ক্যান্সার, কিডনির ক্যান্সার, ল্যারিংসের ক্যান্সার, মূত্রথলির ক্যান্সার, খাদ্যনালীর ক্যান্সার,অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সার,ও পাকস্থলী ক্যান্সার,নারীর জরায়ু ক্যান্সার। এছাড়া এর সাথে আরো অনেক ক্যান্সারের সম্পর্ক রয়েছে যেমন- স্কোয়ামাস সেল সাইনোন্যাজাল ক্যান্সার, লিভার ক্যান্সার, কলোরেক্টাল ক্যান্সার, পিত্তাশয় ক্যান্সার, অ্যাড্রেনাল গ্রন্থির ক্যান্সার, ক্ষুদ্রান্ত্রের ক্যান্সার ও শিশুদের বিভিন্ন ক্যান্সার, উচ্চ রক্তচাপ ও প্রান্তীয় রক্তনালীর রোগ, হার্ট অ্যাটাক, ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারি ডিজিজ, এমফাইসিমা, অ্যাথেরোসক্লেরোসিস (করোনারি ও প্রান্তীয় ধমনির রোগ) প্রভৃতি রোগের সৃষ্টি করে।

২. ধূমপানকারীদের হাতের আঙুলে বিশেষ করে ২য় ও ৩য় আঙুলে তামাকের বা নিকোটিনের দাগ দেখা যায়।

৩. সিগারেটের ধোঁয়ায় যে কার্বন মনোক্সাইড থাকে তা রক্তের অক্সিজেন বহন ক্ষমতা কমিয়ে দেয় ফলে ধূমপানের এক মিনিটের মধ্যে হার্টের স্পন্দন বাড়তে শুরু করে এবং প্রথম দশ মিনিটের মধ্যে হার্ট রেট প্রায় দশ শতাংশ বেড়ে যায়।

৩. হাত ও পায়ের ধমনি ও শিরায় প্রদাহ হয় এবং থ্রম্বোসিস বা রক্ত জমাট বেঁধে যায়। ফলে রক্ত চলাচল ব্যাহত হয়ে ঘা বা ক্ষত তৈরি হতে পারে।

৪. ধূমপায়ীরা ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হয় বেশি এবং রোগের তীব্রতাও অনেক বেশি।

৫. তামাকসেবীদের হ্যালিটোসিস বা মুখে দুর্গন্ধ হয়। দাঁত ক্ষয়ে যাওয়ার হার দুই থেকে তিনগুণ বৃদ্ধি পায়। এছাড়া লিউকোপ্লাকিয়া নামক আরেক ধরনের জটিলতা হতে পারে যাতে মুখগহ্বরের মিউকাস ঝিল্লিতে সাদা প্লাক দেখা দেয়।

৬. অধূমপায়ীর তুলনায় ধূমপায়ীরা যৌন অক্ষমতায় ভোগার হার ৮৫ শতাংশ বেশি।

৭. বন্ধ্যাত্ব- ধূমপান ডিম্বাশয়ের জন্য ক্ষতিকর এবং বন্ধ্যত্বের অন্যতম কারণ। সিগারেটের নিকোটিনসহ অন্যান্য রাসায়নিক উপাদান ইস্ট্রোজেন হরমোন তৈরিতে বিঘ্ন ঘটায়। এই হরমোনটি ডিম্বাশয়ে ফলিকল উৎপাদন ও ডিম্বপাত নিয়ন্ত্রণ করে। এছাড়া ধূমপান জরায়ু ও ভ্রূণের আরো অনেক ক্ষতি করে।

৮. অধূমপায়ীদের তুলনায় ধূমপায়ীদের বিবাহ বিচ্ছেদের সম্ভাবনা প্রায় ৫৩% বেশি।

৯. ধূমপানের ফলে ক্ষুধা কমে যায়। তামাক লিপিডের ভাঙন ত্বরান্বিত করে এবং ওজন কমায়। সারাবিশ্বে আগুনজনিত মৃত্যুর ১০% ধূমপান থেকে হয়। ধূমপায়ীরা রেডন ও অ্যাসবেসটস এর সংস্পর্শে এলে ফুসফুসের ক্যান্সারের সম্ভাবনা অধূমপায়ীর তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পায়। ধূমপানের ফলে অস্থি ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

১০. ধূমপানের কারণে এর মধ্যস্থিত বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান যেমন কার্বন মনোক্সাইড, সাইয়ানাইড প্রভৃতির সংস্পর্শে দীর্ঘদিন থাকার ফলে ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ফুসফুসের অ্যালভিওলাই এর স্থিতিস্থাপকতা নষ্ট হয়ে যায় যার ফলে এমফাইসিমা নামক রোগ হয়।

ধূমপানের সম্ভাব্য পরিণতি যেমন ফুসফুস ক্যান্সারের লক্ষণ প্রকাশিত হতে প্রায় কুড়ি বছর সময় লাগে।
পুরুষ ধূমপায়ীর ক্ষেত্রে সারাজীবনে এই ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ১৭.২% যেখানে মহিলাদের ক্ষেত্রে এটি ১১.৬%। অধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি অনেক কম যেমন পুরুষের ক্ষেত্রে ১.৩% মহিলার ক্ষেত্রে ১.৪%।

মৃত্যুঃ

অকাল মৃত্যু ঝুঁকি বৃদ্ধির শীর্ষে তামাক। যত লোক তামাক ব্যবহার করে তার প্রায় অর্ধেক এর ক্ষতিকর প্রভাবে মৃত্যুবরণ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে প্রতিবছর সারাবিশ্বে প্রায় ৬০ লাখ লোক তামাকের ক্ষতিকর প্রভাবে মারা যায় (সর্বমোট মৃত্যুর প্রায় ১০%) যার প্রায় ৬ লাখ পরোক্ষ ধূমপানের স্বীকার। বিংশ শতাব্দীতে তামাক প্রায় দশ কোটি ব্যক্তির মৃত্যু ঘটিয়েছে। একইভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এন্ড প্রিভেনশন (CDC) সেন্টারও এটাকে সারাবিশ্বব্যাপী অকাল মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বর্ণনা করেছে। দীর্ঘকাল ধূমপানের ফলে সার্বিক গড়ায়ু অধূমপায়ীদের তুলনায় ১০ বছর থেকে ১৭.৯ বছর পর্যন্ত হ্রাস পায়।

আমেরিকাতে প্রতি পাঁচ জনে একজন ধূমপানের শিকার এবং প্রতিবছর প্রায় ৪,৪৩,০০০ জন অকালে প্রাণ হারান।

২০১৫ সালে একটি গবেষণায় দেখা যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সিগারেট সেবনের ফলে মোট মৃত্যুর ১৭% ধূমপান দ্বারা সৃষ্ট রোগের কারণে হয়ে থাকে।

বাংলাদেশে প্রতিবছর তামাকজনিত রোগে মারা যায় ৯৫ হাজার মানুষ। পঙ্গুত্ব বরণ করে আরও কয়েক লাখ।

কিছু বৈজ্ঞানিক ব্যখ্যাঃ

ধূমপানে কিছু ক্যান্সার সৃষ্টিকারী পাইরোলাইটিক যৌগ থাকে যা ডিএনএ (DNA) এর সাথে যুক্ত হয়ে জেনেটিক মিউটেশন করে। বিশেষত শক্তিশালী কার্সিনোজেন যেমন- পলিসাইক্লিক অ্যারোমাটিক হাইড্রোকার্বন যা মিউটাজেনিক ইপক্সাইডে পরিণত হয়ে আরো বিষাক্ত হয়ে উঠে।

বেনজোপাইরিন হলো প্রথম পলিসাইক্লিক অ্যারোমাটিক হাইড্রোকার্বন যা ধূমপানে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী হিসাবে চিহ্নিত হয়। এটি ইপক্সাইডে পরিণত হয়ে কোষের নিউক্লিয়ার ডিএনএ এর সাথে স্থায়ীভাবে বন্ধন তৈরি করে ফলে কোষটি হয় মৃত্যুবরণ করে অথবা মিউটেশন হয়। যদি মিউটেশন হওয়া কোষটি অ্যাপোপটোসিস বা প্রোগ্রামড সেল ডেথ এর মাধ্যমে ধ্বংস না হয় তাহলে সেটি ক্যান্সার কোষে পরিণত হয়। একইভাবে অ্যাক্রোলিন নামক আরেকটি যৌগ একই পদ্ধতিতে ক্যান্সার করতে পারে, তবে এটি সরাসরি কাজ করতে পারে।

সিগারেটে ১৯টির বেশি রাসায়নিক পদার্থ আছে যারা ক্যান্সারের জন্য দায়ী। নিম্নে কিছু শক্তিশালী কার্সিনোজেন নিয়ে আলোচনা করা হলো-

পলিসাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন হলো আলকাতরা যৌগ যা পাইরোলাইসিস প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়। এদের কিছু কিছু যৌগ স্বাভাবিক অবস্থাতেই বিষাক্ত, আবার কিছু যৌগ লিভারের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এরা পানিবিদ্বেষী হওয়ায় পানিতে দ্রবীভূত হয় না তাই সহজে শরীর থেকে নির্গত হয় না। এটাকে পানিতে দ্রবণীয় করার জন্য লিভার সাইটোক্রোম পি-৪৫০ নামক একধরনের এনজাইম তৈরি করে যা উক্ত যৌগে একটি অতিরিক্ত অক্সিজেন যোগ করে মিউটাজেনিক ইপক্সাইডে পরিণত করে যা কিছুটা বেশি দ্রবণীয় আবার বেশি সক্রিয়।

এক্রলিন নামক যৌগটি এটি সিগারেটের ধোঁয়াকে ঝাঁঝাল করে, এর জ্বালা সৃষ্টিকারী ও ল্যাক্রিমেটরি বা অশ্রু উৎপাদক প্রভাব রয়েছে। PAH এর উৎপাদের মতো অ্যাক্রোলিন ইলেক্ট্রোফিলিক অ্যালকাইলেটিং এজেন্ট এবং স্থায়ীভাবে DNA বেজ গুয়ানিন এর সাথে বন্ধন তৈরি করে। অ্যাক্রোলিন-গুয়ানিন অ্যাডাক্ট DNA কপিং এর সময় মিউটেশনকে প্রভাবিত করে এবং ক্যান্সার সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে, তবে এর কোনো মেটাবলিক অ্যাক্টিভেশন এর প্রয়োজন নাই। সিগারেটে PAH এর তুলনায় অ্যাক্রোলিন ১০০০ গুণ বেশি থাকে যা একই সাথে মিউটাজেন ও কার্সিনোজেন হিসাবে কাজ করে।

নাইট্রোস্যামাইন হলো কতক ক্যান্সার সৃষ্টিকারী পদার্থ যা সিগারেটের ধোঁয়ায় পাওয়া যায় তবে স্বাভাবিক কাঁচা তামাক পাতায় পাওয়া যায় না। এই যৌগগুলো ফ্লু-কিওরড তামাক পাতায় পাওয়া যায় যা কিউরিং প্রক্রিয়ার সময় আনকিওরড তামাক পাতায় প্রাপ্ত নিকোটিন ও অন্যান্য যৌগ এবং সকল দহন গ্যাসে প্রাপ্ত বিভিন্ন নাইট্রোজেন অক্সাইডসমূহের মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি হয়।

রেডিওঅ্যাকটিভ কার্সিনোজেন

রাসায়নিক ও অতেজস্ক্রিয় কার্সিনোজেনের পাশাপাশি তামাকে কিছু তেজস্ক্রিয় পদার্থ থাকে যা ক্যান্সারের জন্য দায়ী। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় সীসা-২১০(210Pb) ও পলোনিয়াম-২১০(210Po) দুটি আইসোটোপ সিগারেট ধোঁয়াতে বিদ্যমান। সিগারেটে পলোনিয়াম-২১০ এর পরিমান হলো ০.০২৬৩-০.০৩৬ pCi (০.৯৭–১.৩৩mBq), ন্যাশনাল সেন্টার ফর অ্যাটমস্ফেরিক রিসার্চ (NCAR) এর এক গবেষণায় দেখা যায় তেজস্ক্রিয় পদার্থগুলো ব্রংকিয়াল শাখার হটস্পটে জমা হয় যেখানে তামাকে অবস্থিত আলকাতরা জমা হয়। আলকাতরা সহজে দ্রবীভূত না হওয়ার কারণে তেজস্ক্রিয় যৌগসমূহের প্রাকৃতিকভাবে পরিষ্কার হওয়ার পূর্বে তেজস্ক্রিয় ক্ষয় হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় থাকে। ঘরের ভিতরে এইগুলো পরোক্ষভাবে অধূমপায়ীদের ক্ষতি করতে পারে।

নিকোটিন

নিকোটিন সিগারেট ও অন্যান্য তামাকজাত পণ্যে পাওয়া যায় যা উদ্দীপক হিসাবে কাজ করে এবং তামাকের প্রতি আসক্তি তৈরিতে ভুমিকা রাখে। তামাক সেবনের পর অধিকাংশ নিকোটিন পাইরোলাইজড হয় এবং অল্প পরিমাণ থেকে যায় যা মৃদু দৈহিক নির্ভরশীলতা ও মৃদু থেকে শক্তিশালী মানসিক নির্ভরশীলতা তৈরির জন্য যথেষ্ট। সিগারেটের ধোঁয়ার অ্যাসিটালডিহাইড থেকে হারমেন (একটি মনো-অ্যামায়িন অক্সিডেজ ইনহিবিটর) তৈরি হয় যা আসক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নিকোটিনের উদ্দীপনার ফলে মস্তিষ্কের নিউক্লিয়াস অ্যাকামবেন্স থেকে ডোপামিন ক্ষরণ হয় যা আসক্তি তৈরিতে ভূমিকা রাখে। Henningfield ও Benowitz গবেষণা করে বলেন, নিকোটিন গাঁজা, ক্যাফেইন, ইথানল, কোকেন ও হেরোইনের চাইতে বেশি আসক্তিকর। তবে নিকোটিনের তুলনায় উপরোক্ত পদার্থগুলোর উইথড্রয়াল ইফেক্ট অনেক বেশি।

সিগারেট টানের চেয়ে স্বাভাবিক নিশ্বাস বেশি ক্ষতিকর

সিগারেটে টান দেওয়ার চেয়ে বরং স্বাভাবিক নিঃশ্বাসের মাধ্যমে এর ধোঁয়া ফুসফুসে গেলে ক্ষতি বেশি হয় কারণ স্বাভাবিক নিঃশ্বাসে যত গভীরভাবে বাতাস টেনে নেয়া হয় সিগারেট খাওয়ার সময় এত গভীরভাবে নিঃশ্বাস নেওয়া হয় না, ফলে স্বাভাবিক নিঃশ্বাসে ক্ষতিকর পদার্থ ফুসফুসের গভীর পর্যন্ত যেতে পারে এবং বেশি ক্ষতি করতে পারে। এইজন্য প্রত্যক্ষ ধূমপায়ীর তুলনায় পরোক্ষ ধূমপায়ীর ক্ষতি বেশি হয়।

দৈনিক গড়ে ১.৫ প্যাক ধূমপান বছরে প্রায় ৬০-১৬০ mSv মাত্রার তেজস্ক্রিয়তার সমান। যেটাকে একটি পারমাণবিক চুল্লির কাছাকাছি এলাকায় বসবাসের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। (প্রতিবছর ০.০০০১mSv অথবা প্রতিবছর ৩.০ mSv যা আমেরিকানদের গড় মাত্রা)
আসক্ত হওয়ার সময়

ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেনিফার ও’লাফলিনের মতে ধূমপান শুরুর পর আসক্তি সৃষ্টি হতে কমপক্ষে পাঁচ মাস সময় লাগে। ইনজেকশনের পর নিঃশ্বাসের সাথে ধোঁয়া গ্রহণ দ্বিতীয় একটি সহজ মাধ্যম যার দ্বারা খুব দ্রুত ও সহজে কোন যৌগকে রক্তে পৌঁছানো যায়। এর মাধ্যমে কোনোপদার্থকে দশ সেকেন্ডের মধ্যে মস্তিষ্কে প্রেরণ করা যায়। এইজন্য অধিকাংশ ধূমপায়ী মনে করে যে তারা ধূমপান ত্যাগ করতে পারবে না। তবে যারা ধূমপান ত্যাগের চেষ্টা করে এবং একটানা তিন মাস নিকোটিন ছাড়া থাকতে পারে তারা বাকি জীবন ধূমপান ছাড়া থাকতে পারবে বলে মনে করা হয়। যারা ধূমপান ছাড়ার চেষ্টা করে তাদের ডিপ্রেশনে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে বিশেষত অল্পবয়সী তরুণদের এই প্রবণতা বেশি থাকে। সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রতীয়মান যে, নিকোটিন অন্যান্য আসক্তিকর ড্রাগস যেমন কোকেন, হেরোইন ইত্যাদির মতো মস্তিষ্কের মেজোলিম্বিক পাথওয়েতে ডোপামিন লেভেল বাড়িয়ে দেয় ফলে নিকোটিন গ্রহণ একটি আনন্দময় প্রভাব ফেলে যা পুনরায় নিকোটিন গ্রহণে আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়। আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, ডোপামিন রিসেপ্টরের সক্রিয়তা বৃদ্ধির কারণে ধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত বেশি রিয়াকশন টাইম ও স্মৃতিশক্তির সক্রিয়তা লক্ষ্য করা যায়। উল্ল্যেখ্য, যদিও তামাক আসক্তির জন্য নিকোটিনকে দায়ী করা হয় তথাপি দেখা গেছে নিকোটিন এককভাবে প্রয়োগ করা হলে ততটা আসক্তিকর নয়।

ধূমপান করা থেকে বিরত থাকলে কি শরীরের ক্ষতি মেরামত হতে পারে?

 

একজন ব্যক্তির রোগে আক্রান্ত ঝুঁকি সেই ব্যক্তি কতদিন ধরে ও দৈনিক কতটি ধূমপান করে তার সাথে সরাসরি সমানুপাতিক। তবে কেউ যদি ধূমপান পরিত্যাগ করে তবে ঝুঁকি ক্রমশ কমে আসে কারণ মানব শরীর ধূমপানজনিত ক্ষতি ধীরে ধীরে মেরামত করে নিতে পারে। ধূমপান ত্যাগ করার একবছর পরে হার্টের রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা যারা ধূমপান চালিয়ে যায় তাদের তুলনায় প্রায় অর্ধেক কমে যায়।

ধূমপায়ীর সংখ্যা

২০০০ সালে ১২২ কোটি লোক ধূমপান করতো, ২০১০ সালে ১৪৫ কোটি ও ২০২৫ সালের মধ্যে ১৫০ থেকে ১৯০ কোটি ধূমপায়ী হবে বলে ভবিষ্যৎবাণী করা হয়েছিল।

২০০২ সাল পর্যন্ত সারা বিশ্বে ২০% অল্পবয়সী কিশোর-কিশোরী (১৩-১৫) ধূমপান করে। দৈনিক প্রায় আশি হাজার থেকে এক লাখ শিশু ধূমপান আসক্তির স্বীকার হচ্ছে যার প্রায় অর্ধেকই এশিয়াতে বাস করে।

যেসকল ব্যক্তি গৃহে ও কর্মক্ষেত্রে পরোক্ষ ধূমপানের স্বীকার তাদের হৃদরোগের সম্ভাবনা ২৫-৩০% ও ফুসফুস ক্যান্সারের সম্ভাবনা ২০-৩০% বাড়ে। পরোক্ষ ধূমপানের জন্য প্রতিবছর প্রায় ৩৮,০০০ লোক মারা যায় যার মধ্যে ৩,৪০০ জন ফুসফুস ক্যান্সারে মারা যান।

WHO এর মতে ধূমপানজনিত ক্ষতি ও অকাল মৃত্যু গরীবদেরই বেশি হয়। ১২২ কোটি লোকের মধ্যে ১০০ কোটিই উন্নয়নশীল দেশে বাস করে। ২০০২ সালের হিসাব মতে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ধূমপায়ীর সংখ্যা প্রতিবছর ৩.৪% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। WHO ২০০৪ সালে হিসাব করেছিলো যে সারাবিশ্বে ৬০ মিলিওন লোক মারা যায় যার মধ্যে ৫৪ লাখ ধূমপানজনিত কারণে এবং ২০০৭ সালে তা ৪৯ লাখে নেমে আসে। ২০০২ সালে ৭০% মৃত্যুই ঘটেছিল উন্নয়নশীল দেশে।

বর্তমানে (২০১৭ সালের হিসাবে) প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ (সংখ্যায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ) ধূমপান এবং ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহার করেন, যা আগে (২০০৯ সালে) ৪৩ শতাংশ ছিল। কিন্তু প্রায় চার কোটি তামাক ব্যবহারকারী কোনো দেশে থাকা ভালো কথা নয়। বাংলাদেশ বিশ্বে এখনো সর্বোচ্চ তামাক ব্যবহারকারীদের মধ্যে অন্যতম।

গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে ২০১৭ জানাচ্ছে, বাংলাদেশে তামাকজাত পণ্যের ব্যবহারকারী সংখ্যা ৪ কোটিরও বেশি। ঘরেই পরোক্ষ ধূমপানের শিকার ৪ কোটিরও বেশি মানুষ। ৮১ লাখ মানুষ কর্মক্ষেত্রে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয় এবং আড়াই কোটি মানুষ গণপরিবহনে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয়। দেশের প্রায় সোয়া দুই কোটি মানুষ ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্য (জর্দা, গুল) ব্যবহার করে, যার মধ্যে নারীর অংশগ্রহণ পুরুষের চেয়ে ৮.৬% বেশি। তামাক দেশের ৬৭% অসংক্রামক ব্যাধির জন্য দায়ী। বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণা, ‘তামাকজনিত ব্যাধি ও অকাল মৃত্যুর কারণে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই মুহূর্তে দেশে ৩০ বা তদূর্ধ্ব বয়সী ৭০ লাখের অধিক লোক তামাকজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত। টোব্যাকো এটলাস ২০২০ অনুযায়ী, দেশে তামাকের কারণে বছরে প্রায় ১ লাখ ৬১ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। এরমধ্যে সবার উপরে রয়েছে ক্যানসার ও হৃদরোগ।

তাছাড়া মাটি ক্ষয়, পানি দূষণ, বালাইনাশক দ্বারা পরিবেশ দূষণ সর্বোপরি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিয়ে তামাক চাষ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। বালাই নাশক ভূ-উপরি ভাগের মাটি ও পানি সহ ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে যেমন জমা হয় তেমনিই সার্বিক পরিবেশ দূষণ ঘটায়। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও বালাই নাশক ব্যবহারের ফলে মাটি সৃষ্টিকারী জীব অণুজীব মারা যায়। মাটি গঠনের চিরন্তন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।

বাংলাদেশের মত কৃষি প্রধান দেশের মাটি ক্ষয় রোধ করা অত্যন্ত জরুরী। জনগণের খাদ্য উৎপাদন তথা জনগণের বসবাসের উপযোগী মাটি ও পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে তামাকের মত আগ্রাসী প্রজাতির উদ্ভিদের সম্প্রসপ্রণ নিয়ন্ত্রণ এখন সময়ের দাবী।

তামাক থেকে সৃষ্ট ধূমপান ক্ষতিকর বিধায় প্যাকেটের মোড়কের গায়ে এর ক্ষতিকর প্রভাব লিখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ধূমপানের ক্ষতিকর দিকগুলো বিবেচনা করে দেশে দেশে ধূমপান বিরোধী আইন তৈরি হয়েছে। প্রকাশ্যে ধূমপান করা তাই এখন সামাজিক অপরাধ। আমাদের দেশেও প্রকাশ্যে ধূমপান করা দন্ডনীয় অপরাধ। তাছাড়া, ২০০৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি) স্বাক্ষরের পর, ২০১৩ সালে এই সরকার পুরনো তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন করে সময়োপযোগী এবং ২০১৫ সালে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের বিধিমালা পাস করে। শুধু তা-ই নয়, ইতোমধ্যে এসডিজি পূরণে এফসিটিসিকে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

ধূমপান প্রতিরোধে করনীয়:

১. ধূমপান প্রতিরোধে সবচেয়ে জরুরি ও কার্যকরী পদক্ষেপ হলো ব্যক্তির সদিচ্ছা ও একান্ত প্রচেষ্টা। একজন ব্যক্তি যদি সচেতনভাবে ধূমপানকে এড়িয়ে চলে, আসক্ত হতে না চায় কিংবা ধূমপান ছাড়তে চায় তাহলে সে খুব সহজেই তার মনোবল দিয়ে ধূমপানকে প্রতিরোধ করতে পারে। আর বিশ্বজুড়ে ধূমপান এমন অবস্থা সৃষ্টি করেছে যে একে প্রতিরোধ করতে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত উদ্যোগই যথেষ্ট নয়। বরং বড় পরিসরে, সরকারিভাবে এর বিরুদ্ধে শক্তিশালী উদ্যোগ নিতে হবে।

২. ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান বিলুপ্তসহ সকল পাবলিক প্লেস, কর্মক্ষেত্র ও গণপরিবহনে ধূমপান নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে শতভাগ ধূমপানমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

৩. তামাকজাত পণ্য বিক্রয়স্থলে দ্রব্য প্রদর্শন নিষিদ্ধ করতে হবে।

৪. তামাক কোম্পানির সামাজিক দায়বদ্ধতা কর্মসূচি বা সিএসআর সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে।

৫. খুচরা সিগারেট বা বিড়ি বিক্রি বন্ধ করতে হবে।

৬. সিগারেট এবং হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্টস (এইচটিপি)-এর মতো ক্রমশ বিস্তার লাভ করা পণ্যসমূহের আমদানি ও বিক্রি নিষিদ্ধ করতে হবে।

৭. সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবার্তার আকার বৃদ্ধিসহ তামাকপণ্য মোড়কজাতকরণে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে।

একটা সবসময় আমাদের মনে রাখা উচিত, আমাদের মতো স্বল্পআয়ের দেশে যেখানে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহ করাটাই অনেক কঠিন ব্যাপার সেখানে তামাক চাষ করে জমি ক্ষতি করাটা নেহাত বোকামি ছাড়া কিছু নয়। আর সর্বপ্রথম হচ্ছে সুস্থতা একজন অসুস্থ ব্যক্তিই জানেন সুস্থতা সৃষ্টিকর্তার কত বড় একটা নিয়ামক। তাই, নিজের ক্ষতি, পরিবেশের ক্ষতি এবং অর্থনীতির ক্ষতি না করে সম্মিলিত ভাবে তামাকজাতক দ্রব্যকে না বলার মাধ্যমে, সুস্থ এবং সমৃদ্ধিময় জীবনজাপন করা সম্ভব।

তথ্যসূত্রঃ

1. Africa’s Farmers Weekly,26 October 2012

2. Farida Akhter.www. fair trade tobacco.org, tobacco to food crop production

3. Hossain, M.H, Rahman.2013. A Socio-economic analysis on tobacco cultivation in Kushtia district of Bangladesh, Social Science 2(3):128-134.

4. Motaleb, M.A.2011 Indian Journal of Traditional knowledge 10 (3):481-485

5. www.labor right.org/sites/tobacco

6. www.soil.nesu.edu/publications/soil facts/ag-439-16w.pdf

7.https://en.m.wikipedia.org/wiki/Tobacco

8.”WHO REPORT on the global TOBACCO epidemic”

9.”Prevalence of current tobacco use among adults aged=15 years (percentage)”। World Health Organization।

10.”Mayo report on addressing the worldwide tobacco epidemic through effective, evidence-based treatment”। World Health Organization।

11. “Smoking and carcinoma of the lung; preliminary report”। British Medical Journal। 2 (4682): 739–748। ডিওআই:10.1136/bmj.2.4682.739। পিএমআইডি 14772469। পিএমসি 2038856

12. World Health Organization (২০০৮)। WHO Report on the Global Tobacco Epidemic 2008: The MPOWER Package (PDF)। Geneva: World Health Organization। পৃষ্ঠা 8।

13.WHO REPORT on the global TOBACCO epidemic” (PDF)। World Health Organization। ২০০৮। সংগ্রহের তারিখ ২০০৮-০১-০১।

14.”The Global Burden of Disease 2004 Update” (PDF)। World Health Organization। ২০০৮। সংগ্রহের তারিখ ২০০৮-০১-০১।”Chapter 1: Introduction and Approach to Causal Inference” (PDF)।

15.”Cancer Facts and Figures 2004: Basic Cancer Facts”। American Cancer Society।

  •  
  •  
  •  
  •  
ad0.3

Tags: ,