পটকা মাছ খেয়ে মৃত্যু ও করণীয়

ড. ই্য়াহিয়া মাহমুদ

পটকা মাছ খেয়ে চলতি সপ্তাহে মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমংগল উপজেলায় বউ-শাশুড়ির মৃত্যু সংবাদ আমাদেরকে শোকাহত করেছে। এসব দূর্ঘটনার পিছনে মুলত: ভোক্তার অজ্ঞতা ও অসাবধানতা কাজ করে। এ নিয়ে গণসচেতনতা তৈরিতে ইতোপুর্বে সরকারের তরফ থেকে নানান কার্যক্রম নেয়া হয়েছে । তবুও মাঝে মধ্যে দুর্ঘটনার খবর প্রকাশিত হয়।

পটকা মাছ (সামুদ্রিক) জাপানে একটি দামি, সুস্বাদু ও অভিজাত শ্রেণীর মাছ হিসাবে পরিচিত। পটকা মাছ তাদের ঐতিহ্যের অংশ। কোনো কোনো জাপানী পটকা মাছকে কাজের উদ্যম সৃষ্টির প্রতীক হিসেবে মনে করে। জাপানীরা বিস্তর গবেষণার মাধ্যমে তাদের পটকার কোন প্রজাতি কোন সময় বিষাক্ত তা ইতোমধ্যে জেনে গেছে। হোটেল রেস্তোরায় পটকার মেনু তৈরির জন্য রয়েছে লাইসেন্সধারী বিশেষ শ্যাফ। তবুও পটকা মাছ খেয়ে জাপান, কোরিয়া, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর, চীন ও মেক্সিকোতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে থাকে যদিও সে সংখ্যা এখন একেবারেই হাতেগুণা।

বাংলাদেশে সাধারণত ২ ধরণের পটকা মাছ পাওয়া যায়; স্বাদুপানির পটকা ও লোনাপানির পটকা। স্বাদুপানির পটকা আকারে লোনাপানির পটকার চেয়ে অনেক ছোট। আমাদের স্বাদুপানিতে ২ প্রজাতির পটকা (Tetrodon cutcutia এবং Chelenodon patoca) পাওয়া যায়; উভয় প্রজাতির পটকাই কম-বেশি বিষাক্ত। কিন্তু, আমাদের সামুদ্রিক পটকার প্রজাতির সংখ্যা এবং বিষাক্ততার মাত্রা সম্পর্কে এখনো ধারণা সীমিত।

(ছবি : সংগৃহীত)

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রজনন মৌসুমে পটকা মাছ অধিক বিষ বহন করে থাকে। পটকার চামড়া ও গোনাডে সাধারণত অধিক বিষ থাকে। পটকা মাছের বিষাক্ততা অংগ, প্রজাতি, স্থান ও ঋতুভেদে ভিন্নতর হয়। অর্থাৎ, উদাহরণস্বরূপ বাংলাদেশে পটকা মাছের যে প্রজাতিটি মারাত্মক বিষাক্ত জাপানে সেটা ততটা বিষাক্ত নাও হতে পারে। অনুরূপভাবে, বৈশাখ মাসে যে পটকা মাছটি বিষাক্ত, কার্তিক মাসে তাতে ততটা বিষ নাও থাকতে পারে। তাই অপেক্ষাকৃত কম বিষ ধারণকৃত সময়ে পটকা মাছ খেয়ে ভোক্তার হয়ত কোনোরূপ দুর্ঘটনা ঘটে নাই, কিন্তু অজ্ঞতাবশত: অধিক বিষ বহনকালে একই পটকা খেয়ে তার মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। এলাকাভেদে বিষাক্ততার তারতম্যের জন্যেও একই দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

সামুদ্রিক পটকার ক্ষেত্রে (Tetrodotoxin, TTX বহনকারী) মানুষের জন্য বিষাক্ততার মাত্রা হচ্ছে প্রতি গ্রামে ১০ মাউস ইউনিট (MU, বিষাক্ততার একক) অর্থাৎ, পটকার প্রতি ১ গ্রাম অংশে যদি ১০ MU বিষ থাকে তবে তা মানুষের জন্য বিষাক্ত। এ পরিমাণ বিষ খেলে তার মধ্যে বিষক্রিয়া শুরু হবে এবং এভাবে যদি এক সাথে ১০ হাজার MU বিষ একজন সুস্থ-সবল মানুষ খেয়ে ফেলে তবে নির্ঘাত মৃত্যু। একইভাবে স্বাদুপানির পটকার ক্ষেত্রে প্রতি গ্রামে ৩ MU বিষ (Saxitoxin, STX) থাকলে তা বিষাক্ত এবং ৩ হাজার MU একসাথে খেলে মৃত্যু অবধারিত। এ থেকে সহজেই অনুমেয় যে সামুদ্রিক পটকার চেয়ে স্বাদুপানির পটকা অধিকতর বিষাক্ত। উপরন্তু, পটকার মধ্যে কোনটি বিষাক্ত এবং কোনটি বিষাক্ত নয় এবং কোনটি কোন সময়ে বিষাক্ত এ ধরণের যথেষ্ঠ তথ্য আমাদের জানা নেই। স্থানভেদে বিষাক্ততার তারতম্য কতটুকু তাও আমরা জানি না। তাই দুর্ঘটনা এড়াতে পটকা মাছ খাওয়া থেকে আমাদের বিরত থাকাই উত্তম।

পটকা মাছের বিষ সায়ানাইড (Cyanide) এর চেয়েও অধিকতর বিষাক্ত। গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো কোনো সামুদ্রিক পটকা প্রতি গ্রামে ৪০০০ MU পর্যন্ত বিষ (TTX) বহন করে থাকে অর্থাৎ একজন সুস্থ-সবল ব্যক্তি এরূপ বিষাক্ত পটকার ৩ গ্রাম খেলেই বিষাক্রান্ত হয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে মারা যাবে। অনেকের ধারণা, পটকা মাছ রান্না করলে এর বিষাক্ততা নষ্ট হয়ে যায়। এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। অত্যধিক তাপে বিষের উপাদান (Chemical Structure) এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় রূপান্তর হতে পারে-কিন্তু এতে বিষাক্ততার খুব একটা তারতম্য হয় না।

রোগীর দেহে পটকা মাছের বিষক্রিয়ার মাত্রা গৃহীত বিষের পরিমাণের উপর নির্ভর করে। স্বাদুপানি এবং লোনাপানির পটকার বিষাক্ততার লক্ষণ রোগীর দেহে প্রায় একইরকম। পটকা মাছের বিষকে Neurotoxin কিংবা Sodium channel blocker বলা হয়। পটকা মাছের বিষ (TTX; m.w. 319) মানবদেহের নার্ভ সেলের Voltage-gated sodium ion channel এর সাথে শক্তিশালী বন্ধন তৈরি করে। ফলে হার্টে সোডিয়াম প্রবেশের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। এতে মানবদেহে ইলেকট্রোলইটিক্যাল ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হয়। বিষাক্ততায় ১ ঘণ্টার মধ্যে পর্যায়ক্রমে রোগীর ঠোঁট ও জিহবায় জড়তা, মাথা ব্যথা, বমি বমি ভাব, মুখে শুষ্কতা, মাংসপেশীতে ব্যথা ইত্যাদি নানা উপসর্গ দেখা দিতে পারে। পর্যায়ক্রমে রোগী পক্ষাঘাতগ্রস্ত হতে থাকে। পরিণামে ৪ থেকে ৬ ঘণ্টার মধ্যে শ্বাসকষ্টে মৃত্যুও হতে পারে। তাই রোগীর প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দেয়ার সাথে সাথে রোগীকে স্থানীয় হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হবে এবং চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে। উল্লেখ্য, পটকা মাছের বিষাক্রান্ত রোগীর চিকিৎসায় অদ্যাবধি কোন ভেকসিন আবিস্কৃত হয় নাই।

তাই মৃত্যু ঝুঁকি এড়াতে পটকা মাছ খাওয়া থেকে আমাদেরকে বিরত থাকতে হবে। এর দামি বিষ আইসোলেট করে বরং আমরা তা বৈধভাবে বিদেশে রপ্তানি করতে পারি।

লেখক: বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষক

  •  
  •  
  •  
  •