প্রথম করোনায় আক্রান্ত শিশুর জন্ম ফ্রান্সে

নিউজ ডেস্কঃ

ফ্রান্সে মাতৃগর্ভে করোনাভাইরাস আক্রান্ত হয়ে প্রথম শিশুর জন্ম হয়েছে। দেশটির চিকিৎসকদের দাবি এ ধরণের সংক্রমণের এটিই প্রথম প্রমাণিত ঘটনা। ওই নবজাতক শিশুটি গর্ভফুলের (প্লাসেন্টা) মাধ্যমে এই ভাইরাস আক্রান্ত হয় এবং মস্তিষ্কে এক ধরণের প্রদাহ নিয়ে বড় হতে থাকে। তবে, জন্মের পর ওই সংক্রমণ পরিস্থিতি ভালো মতোই কাটিয়ে উঠতে পেরেছে।

যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত নেচার কমিউনিকেশন নামে বিজ্ঞানভিত্তিক আন্ত:শাস্ত্রীয় গবেষণা সাময়িকীর একটি প্রকাশনায় চিকিৎসক দল এই দাবি করেন। বুধবার (১৫ জুলাই) এটি প্রকাশ করা হয়েছে। তবে, মাতৃগর্ভেই করোনা আক্রান্তের শতভাগ দাবি করলেও জন্মের সঙ্গে সঙ্গে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনাকেও একেবারে উড়িয়ে দেননি।

কারণ, ওই বাচ্চার জন্মের মাত্র কয়েকদিন আগে তার মা কোভিড-১৯ পজিটিভ হন। এ প্রসঙ্গে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের অ্যান্টোইন ব্লাকেয়ার হাসপাতালের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ও সংকটকালীন শিশু পরিচর্যা বিভাগের স্বাস্থ্য পরিচালক ডেনিয়েল ডে লুকা বলেন, অপ্রত্যাশিত হলেও এ ধরনের ঘটনা অসম্ভব না। এমনটা সচরাচর ঘটে না। তবে এমনটা হতেই পারে, তাই স্বাস্থ্যসেবা (ক্লিনিক্যাল ওয়ার্কআউট) নিশ্চিতে নিয়োজিতদের এমন পরিস্থিতির বিষয়টি মাথায় রাখা উচিত। ওই প্রকাশনায় উল্লেখ করা হয়েছে, গত ২৪ মার্চ ২৩ বছর বয়সী একজন গর্ভবতী জ্বর ও প্রচণ্ড কাশি নিয়ে অ্যান্টোইন হাসপাতালে ভর্তি হয়।

ভর্তির অল্প সময় পরই পরীক্ষায় জানা যায় তিনি কোভিড-১৯ আক্রান্ত। ওই সময় তার গর্ভকালীন সময়ের তৃতীয় ত্রৈমাসিকের শেষভাগ পার করছিলেন অর্থাৎ তিনি তখন প্রায় ১০ মাসের গর্ভবতী। এর তিনদিন পরই বাচ্চা প্রসবের লক্ষ্মণ দেখা দিলে সাধারণ মাত্রার অবশ করে জরুরি ভিত্তিতে অপারেশন (সিজারিয়ান) করে শিশুর জন্ম নিশ্চিত করা হয়। কোন বিলম্ব না করেই নবজাতককে শিশু পরিচর্যা কেন্দ্রে সরিয়ে নেয়া হয়। কারণ, শিশুটিও সাময়িক অনুভুতিনাশক (এনেস্থেটিক) আক্রান্ত ছিল। এরপর ওই শিশুর ফুসফুস থেকে রক্ত ও তরল নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করে জানা যায় যে শিশুটি কোভিড-১৯ আক্রান্ত। তবে, অন্য কোন ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের আক্রমণ থেকে মুক্ত ছিল।

পরবর্তীতে আরও পরীক্ষায় মায়ের গর্ভফুলের মাধ্যমেই কোভিড-১৯ আক্রান্ত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। আগে এ ধরনের ঘটনার প্রমাণ না মেলার কারণ হিসেবে শিশু বিশেষজ্ঞ লুকা বলেন, এটার জন্য অনেক ধরনের নমুনা পরীক্ষার দরকার হয়। যেমন, প্রসূতির রক্ত, নবজাতকের রক্ত, রজ্জু রক্ত, অমরা বা গর্ভফুল, গর্ভাশয়ের তরল অ্যামনিওটিক ফ্লুইড; চারিদিক যখন এমন মহামারী চলছে তখন এসব সংগ্রহ করা খুব কঠিন কাজ। অনেক সময় এমন ঘটনার সন্দেহ করা হলেও তা সন্দেহই থেকে গেছে প্রমাণিত হয়নি।

কারণ, এতো সব পরীক্ষা আর করা হয়ে উঠেনি বলে জানান লুকা। নবজাতককে বেশ সুস্থ দেখালেও তিনদিন বয়সে সে বিরক্তি অনুভব করতে থাকে, তার মাংসপেশীতে খিচুনি দেখা দেয় ও খাওয়া অনেক কমিয়ে দেয়, ঘাড় পেছন দিকে বেকে যেতে থাকে; এধরনের স্নায়ুবিক লক্ষ্মণ সাধারণত মেনিনজাইটিসের ক্ষেত্রে দেখা যায়।

পরে কয়েক দফা এমআরআই করে গ্লিওসিসের লক্ষ্মণ, স্নায়ুবিক ক্ষতিগ্রস্ততার লক্ষ্মণ পাওয়া যায়, যা শিশুটির মস্তিষ্কে বাজে প্রভাব ফেলছিল। লুকা বলেন, ওই শিশুর জন্মকালে করোনা আক্রান্ত নবজাতকের চিকিৎসা সম্পর্কিত কোন নির্দেশনা ছিল না। প্রথমে চিকিৎসকরা অ্যান্টিভাইরাল ড্রাগ রেমডিসিভির দিতে চাচ্ছিলেন, কিন্তু যেহেতু শিশুটি এমনিতেই সেরে উঠছিল তাই বিশেষ কোন ওষুধ আর দেয়া হয়নি। পরবর্তীতে স্ক্যান করে বাচ্চার স্বাভাবিক অবস্থার প্রমাণ পাওয়া যায়। তার মতে, বাজে খবর অর্ধেক ভর্তি, অর্ধেক খালি গ্লাসের মতো। ভাইরাসটি বাচ্চাকে আক্রমণ করেছিল এবং দিনশেষে সে সেরে উঠেছিল। বর্তমানে পুরোপুরি সুস্থ বলেও জানান তিনি। গর্ভবতীদের আশ্বস্ত করে লুকা বলেন, গর্ভাবস্থা খুবই নিয়ন্ত্রিত একটা অধ্যায়। যদি তুমি এমন কিছুর শিকার হও-ও তুমি তাও নিয়ন্ত্রণ করতে পারো।

এতে বেশিরভাগ সময়ই শিশুর সম্ভাব্য ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। আমরা অনেক ক্ষেত্রে অনেক কিছু করে ফেলতে পারি কিন্তু চোখ তো বন্ধ রাখতে পারি না এবং এটা করাও ঠিক হবে না। গর্ভবতীরা কি সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে সজাগ-সচেতন ও নিয়ম মেনে হাত ধুয়ে সংক্রমণ থেকে দূর থাকতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে লুকা বলেন, এটা একটা কমন সেন্স এবং গর্ভকালীন এটা নিশ্চিত করা সব সময়ই জরুরি।

এ প্রসঙ্গে লন্ডনের কিংস কলেজের প্রসূতি বিভাগের অধ্যাপক অ্যান্ড্রুও শেননান জানান, মায়ের শরীর থেকে বাচ্চার শরীরে করোনা সংক্রমণের ঘটনা খুবই আকস্মিক। যুক্তরাজ্যে এমন ২৪৪টি নবজাতকের ৯৫ ভাগের শরীরে ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। বাকিগুলোরও সংক্রমিত শিশুর মতো কোন লক্ষ্মণ দেখা যায়নি।

  •  
  •  
  •  
  •