চিড়া ও ভাতের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে মাছ ধরা হচ্ছে সুন্দরবনে

নিউজ ডেস্কঃ

সুন্দরবনের বিভিন্ন খাল ও নদ-নদীতে বিষ প্রয়োগে অবাধে মাছ শিকার হচ্ছে। বিষ প্রয়োগে ধরা এসব মাছ যাচ্ছে শহরের বিভিন্ন আড়তে। এতে মৃত্যুঝুঁকির আশঙ্কা বাড়ছে। এভাবে মাছ ধরায় মৎস্য সম্পদ ধ্বংসের পাশাপাশি অসংখ্য সাধারণ জেলের জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে।

স্থানীয় কয়েকজন জেলে জানায়, আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন সুন্দরবনে বিষ প্রয়োগে মাছ ধরা বেড়েছে। কীটনাশকে ধ্বংস হচ্ছে বনজ সম্পদ। বিষ ক্রিয়ায় মারা যাওয়া এসব মাছ খেলে হতে পারে জীবনঘাতী রোগ।

সুন্দরবনের কোলঘেঁষে বসবাস বিপুলসংখ্যক মানুষ জীবিকার জন্য মাছ ধরা, গোলপাতা ও মধু আহরণসহ নানাভাবে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। কিছুদিন যাবৎ কতিপয় অসাধু মাছ শিকারি স্থানীয় টহল ফাঁড়ির বন কর্মচারীদের সঙ্গে আঁতাতের মাধ্যমে পশ্চিম সুন্দরবনের আওতায় বিভিন্ন খালে বিষ প্রয়োগে অবাধে মাছ শিকার করছে বলে জানা গেছে।

অভিযোগ উঠেছে, বনবিভাগের এক শ্রেণির কর্মকর্তা উৎকোচ নিয়ে এ অসাধু মাছ শিকারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

সুন্দরবন-সংলগ্ন দাকোপ উপজেলার অন্তত ১৫ জন ব্যক্তি ও জেলের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পশ্চিম সুন্দরবন খুলনা রেঞ্জ বনবিভাগের চেরাগখালী, মোরগখালী, গেওয়াখালী, পাতকোষ্টা, ভোমরখালী, চিন্তামণি, কালিরখাল, ছেঁড়া, ঝঁপঝঁপিয়া ও মুচিখালীসহ বিভিন্ন খালে বিষ ঢেলে মাছ ধরছেন। বিষ দেয়ার ফলে ওইসব খালের মাছসহ সব ধরনের জলজ প্রাণীই মারা পড়ছে।

উপজেলার সুতারখালী-কালাবগী গ্রামের বাসিন্দা মৎস্যজীবী ফারুক হোসেন গাজী (৩২) বলেন, বিষ দিয়ে মাছ মারার পরে ওই খালে অনেক দিন ধরে কোনো মাছ ঢোকে না। কারণ, খালে মাছের কোনো খাবারও থাকে না। অনেক সময় আমরা পাশ নিয়ে খালে গিয়েও মাছ না পায়ে খালি হাতে ফিরেছি। এখন যা অবস্থা তাতে অসাধু মাছ শিকারিদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর ব্যবস্থা নেয়া দরকার। তা না নিলে বনের নদী ও খালের মাছ ধ্বংস হয়ে যাবে।

পশ্চিম সুন্দরবনের সুতারখালী বনবিভাগ কার্যালয় সূত্রমতে, সুন্দরবনে কীটনাশক দিয়ে মাছ শিকার বন্ধে এবং ডলফিনের অভয়ারণ্য সংরক্ষণসহ বনকেন্দ্রিক অপরাধ দমনে ১ জুলাই থেকে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত বনের সব খালে মাছ আহরণে নিষেধাজ্ঞা জারি করে বনবিভাগ। তবে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অল্প পরিশ্রমে অধিক মুনাফার আশায় অসাধু মাছ শিকারিরা বিভিন্ন কীটনাশক সঙ্গে নিয়ে বনে মাছ ধরতে যায়। জোয়ার আসার কিছু সময় আগে ওই কীটনাশক চিড়া, ভাত বা অন্য কিছুর সঙ্গে মিশিয়ে নদ-নদী ও খালের পানিতে ছিটিয়ে দেয়। ফলে ওই এলাকার বিভিন্ন প্রজাতির মাছ মরে ভেসে ওঠে।

সুতারখালী গ্রামের মৎস্য ব্যবসায়ী রোকনুজ্জামান মল্লিক বলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চল সুতারখালী এলাকার ৮০ ভাগ লোকই সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে কিছু জেলে সুন্দরবনে গিয়ে বিষ দিয়ে মাছ মারছে। ফলে সাধারণ জেলেরা মাছ পাচ্ছে না। তারা চরম বিপদে পড়েছে, সেই সঙ্গে আমাদের ব্যবসাও লাটে উঠেছে।

নলিয়ান স্টেশনের বন কর্মকর্তা শেখ মো. আনিছুর রহমান বলেন, কিছু কিছু বন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছে যারা সামান্য টাকার বিনিময়ে অসাধু মাছ শিকারিদের বনের মধ্যে মাছ ধরার অনুমতি দেয়। কয়েকদিন আগে সুন্দরবনের চেরাগখালী ও মোরগখালী খালের নিষিদ্ধ অভয়ারণ্যে অবৈধভাবে অনুপ্রেবেশ করায় ১৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সুন্দরবনের বিভিন্ন খালে বিষ দিয়ে মাছ ধরে স্থানীয় বাজারের আড়তে বেচাবিক্রি করছে শিকারিরা।

দাকোপ উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা সেলিম সুলতান বলেন, নদী ও খালে বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার সম্পূর্ণ অবৈধ। সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ মারার কথা শুনছি। অনেক সময় নৌপুলিশ ও বনবিভাগ অভিযান চালিয়ে ওইসব মাছ শিকারিদের আটক করে।

তিনি আরও বলেন, বিষ দিলে মাছের সঙ্গে সব প্রজাতির জলজ প্রাণীই মারা যায়। এটা জীববৈচিত্র্যের জন্য খুবই মারাত্মক। পরিবেশের ওপর যেমন বিরূপ প্রভাব পড়ে অন্যদিকে বিষে মরা ওই মাছ খেয়ে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে মানুষসহ অন্যান্য প্রাণী।

  •  
  •  
  •  
  •