করোনা মহামারির মধ্যেই মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে ডেঙ্গু

নিউজ ডেস্কঃ

করোনা মহামারির মধ্যেই মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে ডেঙ্গু। দিনদিন এ রোগে আক্রান্তের সংখ্যাও বাড়ছে। প্রাণঘাতী এ দু’টি রোগের উপসর্গ প্রায় একই হওয়ায় রোগ নির্ণয় বা পরীক্ষায় করোনাই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। ফলে নীরব ঘাতকে পরিণত হচ্ছে ডেঙ্গু। এ অবস্থায় সমন্বিত উদ্যোগের পাশাপাশি উপসর্গযুক্ত ব্যক্তির করোনা নেগেটিভ আসলে ডেঙ্গু পরীক্ষা করার তাগিদ দিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, করোনার পাশাপাশি ডেঙ্গুকেও গুরুত্ব দিতে হবে। তা না হলে ডেঙ্গু সংক্রমণ আরও ত্বরান্বিত হতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে জানা গেছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৬ জুলাই পর্যন্ত দেশে ৩৪১ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ১৯৯ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৪৫ জন, মার্চে ২৭ জন, এপ্রিলে ২৫ জন, মে মাসে ১০ জন, জুনে ২০ জন এবং জুলাইয়ে ১৫ জন আক্রান্ত হন। শুধু ঢাকা শহরেই আক্রান্ত হয়েছেন ২৭০ জন। মোট আক্রান্তের মধ্যে ৩৩৭ জন সুস্থ হয়েছেন।

চিকিৎসকরা বলছেন, দু’টি রোগেরই প্রাথমিক উপসর্গ প্রায় একই। টানা তিনদিন জ্বর, মাথাব্যথা, গা ব্যথা ও হাত-পায়ে ব্যথা—রোগ দু’টির অন্যতম লক্ষণ। ফলে কে ডেঙ্গু আক্রান্ত, আর কে করোনায় আক্রান্ত তা বুঝে ওঠাই এখন প্রাথমিক চ্যালেঞ্জ। যে কারণে রোগ দু’টি নির্ণয়ের জন্য আলাদা-আলাদা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কিন্তু দেশে এসব উপসর্গের রোগীরা প্রধানত করোনা পরীক্ষাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। ফলে এর আড়ালে ডেঙ্গু সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার আফসানা আলমগীর খান বলেন, ‘যেহেতু ডেঙ্গু এবং করোনার লক্ষণ-উপসর্গ এক, অর্থাৎ জ্বর নিয়েই রোগীরা আসছেন, কিন্তু করোনার ডায়াগনসিসে ডেঙ্গুর পরীক্ষা করা হচ্ছে না। তাই একে মাথায় রেখে দেশের সব সিভিল সার্জন অফিসে চিঠি দেওয়া হয়েছে, জ্বরের রোগী এলে যদি কোভিড-১৯ নেগেটিভ হয়, তাহলে ডেঙ্গু অথবা অন্য জ্বরের যেসব পরীক্ষা আছে তা যেন করা হয়।’

কীটতত্ত্ববিদরা বলছেন, দেশে ১২৩ প্রজাতির মশার রেকর্ড রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে ঢাকায় প্রায় ১৪ প্রজাতির মশা পাওয়া যায়। মশার প্রতিটি প্রজাতির প্রজনন, আচরণ ও রোগ বিস্তার ক্ষমতা ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। এদের সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে মশার প্রজাতি ও আচরণভেদে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আলাদাভাবে নিতে হবে। মশাকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে সমন্বিত ব্যবস্থাপনা করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। সঠিক পদক্ষেপ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে ডেঙ্গু মুক্ত করা কঠিন হবে না।

জানতে চাইলে বিশিষ্ট কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, ‘জুন, জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—এই চার মাস ডেঙ্গুর ভরা মৌসুম। এর মধ্যে আগস্ট ও সেপ্টেম্বর পিক টাইম। এই সময়েই ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার ঘনত্ব বেড়ে যায়। ঠিক একই সময়েই আবার চলে এসেছে করোনা মহামারি। তাই এই করোনাকালীন আরেকটি বিপদ যেন না হয়, সে দিকে লক্ষ রাখতে হবে।’

সমন্বিত উদ্যোগের বিস্তারিত উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘মশা নিয়ন্ত্রণে আমাদের চারটি বিষয় লক্ষ্য রাখতে হবে। প্রথমত পরিবেশগত নিয়ন্ত্রণ, দ্বিতীয়ত জৈবিক নিয়ন্ত্রণ, তৃতীয়ত রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণ ও চতুর্থত জনগণের অংশগ্রহণ।’ তিনি বলেন, ‘পরিবেশের বিভিন্ন সমস্যার কারণে মশার জন্ম হয়। পরিবেশগত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করে সহজভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এজন্য জলাধার পরিষ্কার এবং পানি জমার উৎসগুলো পরিষ্কার রাখতে হবে। গাপ্পি মাছসহ উপকারী প্রাণীর মাধ্যমে মশা নিয়ন্ত্রণ করার বিভিন্ন পদ্ধতি বিশ্বে প্রচলিত আছে। সরকারি সংস্থাগুলো চাইলে সেটাও প্রয়োগ করতে পারে। এছাড়া লার্ভিসাইড এবং অ্যাডাল্টিসাইডসহ কীটনাশকের মাধ্যমেও মশার বংশ বিস্তার রোধ করা যাবে। তবে এ ক্ষেত্রে কীটনাশকের নির্দিষ্ট ডোজ বা বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবহার করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। এছাড়া মশা নিয়ন্ত্রণে সফলতা অর্জন দুষ্কর।’

জানতে চাইলে কীটতত্ত্ববিদ মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘যেহেতু ডেঙ্গু ও করোনার উপসর্গ প্রায় কাছাকাছি তাই করোনা নেগেটিভ আসলে সঙ্গে সঙ্গে ডেঙ্গুর টেস্টও করা উচিত। আর কারও যদি ডেঙ্গু পজিটিভ আসে, তাহলে তার বাড়ির অন্যদেরও টেস্ট করাতে হবে। কারণ এই রোগটি ছোঁয়াছে। আর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীকে সার্বক্ষণিক মশারিতে রাখতে হবে। তার বাড়ির আশপাশের ৪০০ মিটারের মধ্যে ফগিং করতে হবে। যাতে ডেঙ্গু রোগীকে কামড় দেওয়া মশাটি অন্য কাউকে কামড়াতে না পারে। মোট কথা হচ্ছে—ব্যাপক হারে টেস্টিং দরকার।’

তিনি আরও বলেন, ‘সিটি করপোরেশনকে অ্যাডাল্টি সাইডিং ও লার্ভিসাইডিংয়ের পাশাপাশি এলাকাভিত্তিক তদারকি বাড়াতে হবে। মশার ঘনত্ব নির্ণয়ে জরিপ কাজেও জোর দিতে হবে। কোথাও অপ্রয়োজনীয় পাত্র, টায়ার বা ডাবের খোসা পড়ে থাকলে সেগুলো অপসারণ করতে হবে। যতগুলো হাসপাতাল রয়েছে, সেখানে ডেঙ্গু রোগী আছে কিনা সেই তথ্যও নিতে হবে। হাসপাতালগুলোর ভেতরে এবং বাইরে লার্ভিসাইডিং করতে হবে। তা না হলে রগটি আবারও ছড়িয়ে পড়েবে।’

তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘ডেঙ্গুর পিক টাইম হচ্ছে আগস্ট। আমরা এখন পর্যন্ত গত বছরের মতো অতো বেশি মশা দেখছি না। তবে গত বছরের তুলনায় এ বছর যদি ১০ ভাগের একভাগও থাকে তাহলে সেটা হবে করোনার মধ্যে বড় আতঙ্কের বিষয়। কারণ করোনার মধ্যে ডেঙ্গু ম্যানেজ বা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।’

এদিকে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসির) ২, ৩, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডে পূর্বপ্রস্তুতিমূলক প্রকল্প গ্রহণ করেছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা—সোশ্যাল অ্যান্ড ইকোনোমিক ইনহ্যান্সমেন্ট প্রোগ্রাম-সিপ। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ৩০ এপ্রিল থেকে ২৮ জুলাই পর্যন্ত। সংস্থাটি এই তিন মাসে তাদের স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে নিয়ে এলাকার ডেঙ্গু প্রজননের স্থানগুলোতে নিয়মিত লার্ভিসাইডিং কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। পাশাপাশি মাইকিং ও লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করছেন। রয়েছে নজরদারি সিস্টেমও। এছাড়া পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে রাজধানীর কিংস্টন হাসপাতালের একটি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য বিশেষায়িত করে গড়ে তোলা হয়েছে।
জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা গত বছরের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণ করে সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালনা করছি। ডেঙ্গু রোগের সঠিক চিকিৎসায় আমাদের ৫টি মাতৃসদন ও ৩৫টি হাসপাতালে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষার ব্যবস্থা করেছি। নিয়মিত মশক নিধন কর্যক্রমের পাশাপাশি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে চিরুনি অভিযান ও হাসপাতালগুলোতে অভিযান পরিচালনা করে আসছি। এসব কাজে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন সংগ্রহণকে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।’

  •  
  •  
  •  
  •