বিশ্ব পরিবেশ দিবস -২০২১

হালিমা তুজ সাদিয়াঃ

সৃষ্টির আদিকাল থেকেই মানবসভ্যতাকে টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে মানুষ অনবরত সংগ্রাম করে চলেছে। এই সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পরিবেশ এবং প্রকৃতি। পরিবেশই প্রাণের ধারক, জীবনীশক্তির বাহক। পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে আজ পর্যন্ত যারা পরিবেশের অস্তিত্বের সাথে খাপ খাওয়াতে পেরেছে তারাই টিকে থাকছে, বাকিরা বিলুপ্তির দিকে অগ্রসর হয়েছে – ডায়নোসর তার উদাহরণ। তাই অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। পরিবেশ প্রতিকূল হলেই জীবের ধ্বংস ও বিনাশ অবশ্যম্ভাবী। পরিবেশের ওপর নির্ভর করে মানুষ, অন্যান্য উদ্ভিদ ও প্রাণীর জীবনের বিকাশ ঘটে। তাই পরিবেশের বাস্তুতন্ত্রের এক নিবিড় যোগসূত্র রয়েছে। কিন্তু নানা কারণে পরিবেশদূষণের সমস্যা দিন দিন প্রকট হওয়ায় মানবসভ্যতা আজ চরম হুমকির সম্মুখীন। প্রকৃতি জয়ের নেশায় মত্ত হয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কল্যাণে মানুষ জলে, স্থলে, মহাশূন্যে আধিপত্য বিস্তার করছে। কিন্তু আজ এই জয়ই প্রকৃতি পরাজয়ের মূল কারণ হয়ে দাড়িয়েছে, প্রকৃতিকে ভয়ংকর পরিস্থিতির দিকে ফেলে দিচ্ছে। এ থেকে মুক্তির উপায় নিয়ে চলছে নানা ধরনের গবেষণা।

বিশ্বব্যাপী পরিবেশ দূষণ নিয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে জাতিসংঘ ৫ ই জুনকে ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলো এবং তার-ই প্রেক্ষিতে ১৯৭৪ সাল থেকে প্রতি বৎসর আলাদা আলাদা প্রতিপাদ্য নিয়ে এই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। বিশ্বব্যাপী ১৪২ টি দেশ এই দিবসটি যথাযথভাবে পালন করছে।

এবছরে বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষ্যে জাতিসংঘের নির্ধারিত প্রতিপাদ্য হলো “বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা” (Ecosystem Restoration)।

কোনো একটি পরিবেশের অজীব এবং জীব উপাদানসমূহের মধ্যে পারস্পরিক ক্রিয়া আদান-প্রদানের মাধ্যমে পরিবেশে যে তন্ত্র গড়ে ওঠে, তাকেই বাস্তুতন্ত্র বলা হয় অর্থাৎ বাস্তুতন্ত্র হচ্ছে জৈব, অজৈব পদার্থ ও বিভিন্ন জীবসমন্বিত এমন প্রাকৃতিক একক যেখানে বিভিন্ন জীবসমষ্টি পরস্পরের সাথে এবং তাদের পারিপার্শ্বিক জৈব ও অজৈব উপাদানের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে একটি জীবনধারা গড়ে তোলে।

প্রত্যেক বাস্তুতন্ত্রে মূলত তিনটি উপাদান রয়েছে- জড় উপাদান, ভৌত উপাদান ও সজীব উপাদান।

জড় উপাদানের মধ্যে রয়েছে অজৈব বস্তু-(পানি, বায়ু, মাটিতে বিভিন্ন বস্তু তাছাড়া পরিবেশের অক্সিজেন, কার্বন ডাইঅক্সাইড, নাইট্রোজেন, ক্যালসিয়াম, সালফার, ফসফরাস, অ্যামিনো অ্যাসিড ও হিউমিক অ্যাসিড প্রভৃতি বাস্তুতন্ত্রের মৌলিক অজৈব উপাদান) এবং জৈব বস্ত( মৃত উদ্ভিদ ও প্রাণী, কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ও ফ্যাটি অ্যাসিড ইত্যাদি জৈব যৌগ)।

ভৌত উপাদানগুলো নির্দিষ্ট অঞ্চলের জলবায়ু, ভূপ্রকৃতি ও মাটি সম্পর্কিত উপাদান নিয়ে গঠিত।

সজীব উপাদানের মধ্যে রয়েছে- প্রাণী, উদ্ভিদ, অণুজীব প্রভৃতি অর্থ্যাৎ সজীব বস্তু। সজীব উপাদান তিন প্রকার, যেমন- উৎপাদক, খাদক এবং বিয়োজক। এদের সমন্বয়েই বাস্তুতন্ত্র।

মানবগোষ্ঠী নিজের স্বার্থে প্রতিনিয়ত প্রকৃতিকে অবজ্ঞা করে বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে বাস্তুতন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত থাকা ভূপ্রকৃতি এবং বিভিন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণীদের উপর। বর্তমানে জলবায়ুর প্রভাব খুব খারাপভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। বাংলাদেশের পরিস্থিতি উল্লেখ করলে – একসময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর ছিলো বাংলাদেশ কিন্তু দিন দিন এর সৌন্দর্য হারিয়ে যাচ্ছে, দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত নাজুক। জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা ও তীব্রতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূমিকা অত্যন্ত নগণ্য হলেও এর মারাত্মক বিরূপ প্রভাবের শিকার হচ্ছে বাংলাদেশ, যার ফলে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে জীববৈচিত্র্য, ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বাস্তুতন্ত্র।

এই পরিবর্তনের ভয়াবহতাকে সামনে রেখে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাস্তুতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার করা। তার-ই লক্ষ্যে মানুষের মধ্যে জন-সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে এবারের পরিবেশ দিবসের মূল প্রতিপাদ্য হিসেবে বাস্তুতন্ত্রকে বেছে নিয়েছে জাতিসংঘ।

পৃথিবীকে বাসযোগ্য এবং প্রাণের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে বাস্তুতন্ত্রের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বাস্তুতন্ত্রের সঠিক রুপ দেওয়ার মাধ্যমে জলবায়ুর পরিবর্তন মোকাবিলা করা সম্ভব একই সাথে বৈশ্বিক বিপর্যয়ও এড়ানো সম্ভব।

বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে তন্মধ্যে বৃক্ষরোপন, শহরের সবুজায়ন পরিকল্পিত উপায়ে বাগান পুনর্নির্মাণ, উপকূল ও নদীগুলোর পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা। তাছাড়া পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে সাধারণত যে বিষয় গুলো চিহ্নিত যেমন – জনসংখ্যা বৃদ্ধি, প্রযুক্তির অপব্যবহার, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নির্বিচারে বৃক্ষনিধন ও বনভূমি উজাড়, প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহার, দ্রুত শিল্পায়ন, সার ও কীটনাশকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার, শিল্প-কলকারখানার বর্জ্য, গাড়ির বিষাক্ত ধোঁয়া, অপরিকল্পিত গৃহনির্মাণ, প্লাস্টিক দ্রব্যের ব্যবহার ইত্যাদি এগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করা এবং সচেতন হয়। পরিবেশ দূষণের মাত্রাকে কমিয়ে নিয়ে আসার লক্ষ্যে কাজ করা। কোনো ভাবেই যেন বায়ু দূষণ,পানি দূষণ,শব্দ দূষণ বা কঠিন বর্জ্যের দূষণ না হয় সেদিকে কর্ণপাত করা।

কোনো দেশ কিংবা প্রতিষ্ঠানের একার পক্ষে বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়। এক নির্মল সবুজ পৃথিবীর স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে, লড়াই করতে হবে যার যার অবস্থান থেকে। তবেই বাস্তুতন্ত্রের পুনরুদ্ধার সম্ভব, বৈশ্বিক সমস্যার সমাধান সম্ভব।

  •  
  •  
  •  
  •  
ad0.3

Tags: