বিশ্ব খাদ্য দিবসের ভাবনা

কৃষিবিদ ফরহাদ আহাম্মেদ:
১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল গ্রামীণ দারিদ্র চক্রের অবসানে সামাজিক সুরক্ষা ও কৃষি।” এই প্রতিপাদ্যের উদ্দেশ্য হচ্ছে- কৃষির মাধ্যমে গ্রামীণ মানুষের দারিদ্র বিমোচন এবং সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়ন করা। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এর জন্মকাল ১৯৪৫ সন থেকে ১৬ অক্টোবরকে স্মরণ করে প্রতিবছর বিশ্ব খাদ্য দিবস পালন করছে। বিশ্বের সকল মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সচেতনতার মাধ্যমে সবাইকে ঐক্য করার জন্য জাতিসংঘের সদস্য দেশসমূহ প্রতিবছর বিশ্ব খাদ্য দিবস পালন করে। বাংলাদেশেও কৃষি মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিশ্ব খাদ্য দিবস পালন করে।

কৃষিই কৃষ্টি। কৃষিই সমৃদ্ধি। কৃষিকে ঘিরেই মানুষের সভ্যতার জাগরণ শুরু। ‘কৃষি’ পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতি ক্ষেত্রে কৃষির কোন বিকল্প নেই। কৃষি পৃথিবীর মূূল চালিকা শক্তি। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও বিনোদনের অধিকাংশ উপাদান আসে কৃষি থেকে। বিশেষ করে খাদ্য ছাড়া জীবন বাঁচানো যায় না। খাদ্যের একমাত্র উৎস কৃষি। কৃষিকে বাঁচিয়ে রেখেছে কৃষক ও কৃষিবিদরা। দেশে সবচেয়ে বেশি সফলতা অর্জন হয়েছে কৃষিতে। ৪৪ বছরে দেশের জনসংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। জমি কমেছে অথচ খাদ্যশস্যের উৎপাদন বেড়েছে তিনগুণ। প্রতি এক শতাংশ হারে বছরে ৫০ হাজার হেক্টর আবাদি জমি কমছে। জনসংখ্যা বাড়ছে ১.৪৭ শতাংশ হারে। ক্রমহ্রাসমান জমি থেকে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণের জন্য কৃষক মাথার ঘাম পায়ে ফেলছেন। কৃষক রোদ, বৃষ্টি, শীত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অভাব-অনটন, ক্ষুধাসহ হাজারো সমস্যা উপেক্ষা করে খাদ্য উৎপাদন করছেন দেশের প্রায় ১৭ কোটি মানুষের জন্য। অথচ কৃষক কৃষি উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পায় না। কৃষক সমাজের অবহেলিত ও সুবিধাবঞ্চিত। কৃষকের ঘরে বিদ্যুত নেই, ছেলেমেয়ের লেখাপড়া করার সুযোগ নেই, সুচিকিৎসা পায় না, যাতায়াত ব্যবস্থা খারাপসহ বিভিন্ন কষ্টে জর্জরিত। ৪৪ বছরে কৃষিতে অনেক উন্নতি হলেও উন্নতি হয়নি কৃষকের।

দেশের অধিকাংশ কৃষকই দরিদ্র। দেশের দরিদ্র মানুষের অধিকাংশই কৃষক। দেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৩২ ভাগ দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করে, যার অর্ধেক চরম দারিদ্র, পুষ্টিহীনতা এবং খাদ্য নিরাপত্তার শিকার। বর্তমান বিশ্বে হত দরিদ্র বেশিরভাগ কৃষক যা ৮০% গ্রামে বাস করে। দেশে ৭৩% মানুষ গ্রামে বাস করে। গ্রামীণ জনসংখ্যার ক্ষুদ্র ও মাঝারি শ্রেণির কৃষকের হার শতকরা ৮০ ভাগ। গ্রামীণ পরিবারের প্রায় ১৯% দিনে তিন বেলা খাবার খেতে পারে না। তাদের মধ্যে ১০% পরিবার বছরে মাসাধিকাল ধরে শুধু এক বা দুই বেলা খেতে পারে। ৮৮টি উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে বৈশ্বিক ুধা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ৭০ তম।

কৃষির মাধ্যমে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও দারিদ্র বিমোচন সম্ভব। কারণ সবাই কৃষির উপর নির্ভরশীল। কৃষির সকল পণ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বাজারজাতকরণ, সংরক্ষণ ও ক্রয়-বিক্রয় করে সামাজিক সুরক্ষা ও দারিদ্র বিমোচন করা যায়। তবে শাকসবজি, ফুল, ফল, মসলা, মৌ, মাশরুম ও রেশমচাষ, বীজ উৎপাদন, গরু মোটাতাজাকরণ, ছাগল পালন, গাভী পালন, মহিষ পালন, ব্রয়লার, লেয়ার পালন, কোয়েল, কবুতর, হাঁস ও রাজহাঁস পালন, বাচ্চা উৎপাদন, মাছ চাষ, চিংড়ি চাষ, ধানেেত মাছ চাষ, পোনা উৎপাদন, নার্সারি, সামাজিক বনায়ন, জৈবসার তৈরি, বায়োগ্যাস তৈরিসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদন করে দ্রুত ও সহজে দারিদ্র বিমোচন, সামাজিক সুরা ও আর্থসামাজিক উন্নয়ন সম্ভব। নিচে এগুলো সংক্ষেপে বর্ণনা করা হলো :

ফুল চাষঃ যে কোন ফসলের চেয়ে ফুল চাষে খরচ কম লাভ বেশি। উৎপাদন সময় কম লাগে, ঝামেলা নেই। এক বিঘা জমিতে একবার গাদা ফুল চাষে লাভ হয় প্রায় ৪০ হাজার টাকা। গ্ল্যাডিওলাস চাষে লাভ হয় ৭০ হাজার টাকা। রজনীগন্ধা চাষে লাভ হয় ৬০ হাজার টাকা। যে কোন ফুল চাষে খরচ বাদে ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত লাভ হয়। ফুল চাষ করলে একটি জমিতে এক বছরে ৪টি ফসল চাষ করা যায়।

ফল চাষঃ ফলগাছ একবার রোপণ করলে ১৫-২০ বছর ফল ধরে। এক বিঘা জমিতে বারিকুল বা বাউকুল চাষ করলে ৩০ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকা আয় হয়। প্রতি বিঘায় ১০০টি পেয়ারা গাছ থেকে ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা আয় হয়। পেঁপে, লেবু, লিচু, কলা, আমসহ বিভিন্ন ফল চাষ করে আয় করা যায়।

শাকসবজি চাষঃ মৌসুমের শুরুতে টমেটো, লাউ, ফুলকপি, বেগুন, শিম, করলা, বরবটি, লালশাক, ডাঁটাশাক, পালংশাক, পাটশাক ইত্যাদি চাষ করলে ভালো দাম পাওয়া যায়।

মসলা জাতীয় ফসলঃ মসলা চাষে উৎপাদন খরচ কম, লাভ বেশি। প্রতি একরে আদা চাষে প্রায় ৩ লাখ টাকা, হলুদ চাষে প্রায় ৬ লাখ টাকাসহ পিঁয়াজ, রসুন, মরিচ ও ধনে চাষেও প্রচুর লাভ হয়।

গরু মোটাতাজাকরণঃ গরু মোটাতাজাকরণে অল্প সময়ে লাভ বেশি হয়। বিশেষ করে ঈদুল আযহার সময় লাভ বেশি হয়। ৩৫-৪০ হাজার টাকা দিয়ে সংকর বা উন্নত জাতের ষাঁড় বাছুর ক্রয় করলে ৩-৪ মাস খাওয়ালে ৬০-৭০ হাজার টাকা বিক্রি করা যায়।

গাভী পালনঃ দুধের দাম বেশি হওয়ায় গাভী পালন করে দুগ্ধ খামার করলে লাভবান হওয়া যায়। এক বছর বয়সের উন্নত বা সংকর জাতের একটি বকনা ক্রয় করে এক থেকে দুই বছর পালন করে প্রজনন করালে ১০ মাস পরে বাচ্চা দেয়। দৈনিক ১৫-২০ লিটার দুধ দিলে প্রতি লিটার দুধের দাম ৫০ টাকা হলে ৭৫০-১০০০ টাকা আয় হয়।

ছাগল পালনঃ ৬ মাস বয়সের ছাগীর বাচ্চা ক্রয় করে ৬ মাস পালন করে প্রজনন করালে ২-৪ টা বাচ্চা দেয়। এই বাচ্চাগুলো এক বছর পালন করলে প্রতিটা ৫-৬ হাজার টাকা বিক্রির উপযোগী হয়। এরমধ্যে মা ছাগী ৬ মাস পর পর আরও দুইবার বাচ্চা দেয়। ছাগল ছয় মাস পর পর ২-৪ টা করে বাচ্চা দেয় বলে লাভ বেশি। ছাগল পালনে অতিরিক্ত খরচ নেই।

পোল্ট্রি খামারঃ ব্রয়লার ও লেয়ার খামার করে অনেক লোক স্বাবলম্বী হচ্ছে। খামারে দুই মাস পর পর ব্রয়লার উৎপাদন করা যায়। ১০০ ব্রয়লার পালন করলে বছরে ৫টি ব্যাচে মোট ৫-৬ হাজার টাকা লাভ হয়। পাঁচ মাস পর থেকে লেয়ার ডিম উৎপাদন শুরু হলেও লাভজনক।

কবুতর ও কোয়েল পালনঃ একজোড়া কবুতর ১২ মাসে ৭-৮ জোড়া বাচ্চা দেয়। একজোড়া বাচ্চার দাম ২০০-২৫০ টাকা। কবুতর ও কোয়েল পালনে খরচ কম লাভ বেশি।

হাঁস ও রাজহাঁস পালনঃ পাতিহাঁস ও রাজহাঁস পালনে খাদ্য খরচ কম বলে লাভ বেশি। ১০০ পাতিহাঁস পালন করলে দৈনিক ৬০-৭০টি ডিম পাওয়া যায়। বয়স্ক হাঁস বিক্রি করা যায়। রাজহাঁস আকারে বড় ও বেশিদিন বাঁচে বলে পালন করা লাভজনক।

বাচ্চা উৎপাদনঃ একটি ইনকিউবেটর দিয়ে শত শত মুরগি ও হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন করা যায়। গ্রামে হাঁস-মুরগির খামারের জন্য বাচ্চা দূর দূরান্তের জেলা শহর থেকে কিনে নিতে হয়। গ্রামেই ইনকিউবেটরে বাচ্চা উৎপাদন করে আয় উপার্জন করা যায়।

মাছ চাষঃ মজুদ পুকুর, মজা পুকুর, ধানক্ষেতে, ঘেরে, প্রাকৃতিক জলাশয়ে মাছ চাষ করে আয় করা যায়। বাজারে মাছের চাহিদা ও দাম বেশি হওয়ায় লাভবান হওয়া যায়। পুকুর লীজ বা ভাড়া নিয়ে মাছ চাষ করা যায়। মাছের পোনা উৎপাদনও খুব লাভজনক।

সামাজিক বনায়ন ও নার্সারিঃ পতিত জমিতে, রাস্তার পাশে. খালি জায়গায় ফল, কাষ্ঠল ও ভেষজ গাছ রোপণ করেও আয় করা যায়। সামাজিক বনায়নে সরকার বা এনজিও উপকারভোগীদের গাছ বিক্রির শতকরা ৬০ ভাগ দেয়। নার্সারিতে ফল, ফুল, কাষ্ঠল ও ভেষজ গাছের চারা উৎপাদন করেও আয় উপার্জন করা যায়।

অন্যান্য ক্ষেত্রেঃ মৌ চাষ করে মধু উৎপাদন লাভজনক। ১০টি বাক্স থেকে মৌসুমের ৭ মাস ৫০-৬০ হাজার টাকার মধু উৎপাদন করা যায়। ঘরের ভিতরে মাশরুম চাষ করে ২/৩ মাসে ২০-২৫ হাজার টাকা আয় করা যায়। ১০-১৫ দিন পর পর মাশরুম উৎপাদন হয়। পুঁজি কম লাভ বেশি। রেশম চাষ করে প্রতি বিঘায় প্রতিটি ব্যাচে বছরে ৩০-৩২ হাজার টাকা আয় করা যায়। জৈব সার, কম্পোষ্ট, কেঁচো কম্পোষ্ট ইত্যাদি উৎপাদন করেও উপার্জন করা যায়। এগুলো থেকে বায়োগ্যাস ও জৈবসার তৈরি হয়। এছাড়াও কৃষিপণ্য ক্রয়-বিক্রয়, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ করেও আয়-উপার্জনের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়নঃ মানুষ যখন কৃষিপণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে আয় উপার্জন করবে তখন কৃষিকাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। মানুষ কৃষিকাজ নিয়ে আয় উপার্জনে ব্যস্ত থাকলে অসামাজিক কাজ যেমন- চুরি, ডাকাতি, মাস্তানি, সন্ত্রাসী, দুর্নীতি, রাহাজানি ইত্যাদি খারাপ কাজ করার সময় পাবে না। ফলে সামাজিক সুরা ও উন্নয়ন হবে।

মূলধনের উৎস ও কারিগরি জ্ঞানঃ বাণিজ্যিক, রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারী সকল ব্যাংক অল্প সুদে সহজ শর্তে কৃষি ঋণ দেয়। এছাড়াও বিভিন্ন এনজিও, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সহজশর্তে ও অল্প সুদে ঋণ দেয়। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কৃষির বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়। এছাড়াও প্রতিটি উপজেলায় কৃষির প্রতিটি বিষয়ে পরামর্শের জন্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কৃষিতথ্য সার্ভিসের ২৪৫টি কৃষিতথ্য ও যোগাযোগ কেন্দ্র, কৃষি কলসেন্টার, ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য যোগাযোগ কেন্দ্র, বিভিন্ন কৃষি বিষয়ক ওয়েবসাইট, টেলিভিশন, রেডিও, পত্রিকা থেকেও কৃষি বিষয়ক কারিগরি জ্ঞান নেয়া যায়।

__________________________________________
লেখক:
সহকারী অধ্যাপক, কৃষিশিক্ষা, শহীদ জিয়া মহিলা কলেজ, ভূঞাপুর, টাঙ্গাইল।
মোবাইল : ০১৭১১-৯৫৪১৪৩।

  •  
  •  
  •  
  •  
ad0.3

Tags: