করোনা মোকাবেলায় মন্ত্রনালয়ের অদক্ষতায় চরম বিপর্যয়ে বাংলাদেশ

এস.এস.আর. জা. আলম

এই মূহুর্তে সবচেয়ে বড় সত্য নতুন করোনা ভাইরাসের আক্রমনে সৃষ্ট রোগ কোভিড-১৯ এ মৃত্যুর মিছিল। চীনের উহান থেকে শুরু হয়ে মিছিলের বিস্তৃতি এখন বিশ্বজুড়ে। এ যেন এক নতুন যুগের সূচনার দায়িত্ব নিয়েছে নতুন করোনা ভাইরাস। চীনে এর উপত্তিস্থল হলেও এই ভাইরাসের মহামারীর খবর বিশ্ববাসির সামনে তেমন গুরুত্ব পায়নি। শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গের একগুয়েমি স্বভাবের কারণে ইউরোপ আমেরিকার মত উন্নত দেশের বিভিন্ন শহর যেন এক একটা লাশের নগরীতে পরিণত হয়েছে।

ইউরোপের ইতালী ও স্পেনের আক্রমনের পরই মূলত ভাইরাসটির সংক্রমনের ক্ষমতা বিস্তর ভাবে পৃথিবীর সামনে আসে। এর উপর ভিত্তি করেই সকল দেশ তাদের স্বক্ষমতা অনুযায়ি ভাইরাসের বিস্তার রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে। কোন কোন দেশ খুব সফলভাবেই ভাইরাটির সংক্রমনের বিরুদ্বে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ গড়তে সক্ষম হয়। যে দেশগুলো প্রতিরোধ করতে পেরেছে তাদের এই সাফল্যের মূলে রয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ভুমিকা। আবার যে সব দেশে এখন লাশের মিছিল দেখছে তাও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতার কারণেই।

বাংলাদেশের মানুষের উপর ভাইরাসটি খুব সহানুভূতিশীল ছিল। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরেই বাংলাদেশে ভাইরাসটি আক্রমন করার কথা থাকলেও কিছুটা সময় নিয়ে ফেব্রুয়ারীতে দেশে আসে। আসা মাত্রই আমাদের জাতীয় নেতাদের ক্ষমতার দাপটে নিজের ক্ষমতা প্রদর্শন করতে পারেনি! অবশেষে মার্চ মাস থেকে শুরু করে ভাইরাসটির ক্ষমতার প্রর্দশন। অন্যদিকে আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে শুরু হয় নতুন করোনা ভাইরাকে নিয়ে নতুন বিনোদন। এই মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী থেকে শুরু করে প্রশাসনের কারও ভাইরাটির ক্ষমতার ব্যাপারে তিল পরিমাণ বিষয় ভিত্তিক মৌলিক জ্ঞান আছে বলে আমরা যারা চিকিৎসা ও গবেষণায় জড়িত তাদের কাছে বোধগম্য হয়নি। যদি তিল পরিমাণ জ্ঞান থাকত তাহলে তিন মাসের মত সময় পেয়েও নূন্যতম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করত। যার সুফল দেশ, সরকার, তথা দেশের জনগণ ভোগ করত। বরং দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবগের্র অযাচিত, অর্থহীন, বিবেকবর্জিত বক্তব্য জাতির সামনে সরকারের বিশেষ করে মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি ফুঠে উঠেছে।

এই ব্যর্থতার মূল কারন হল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে সংশ্লিষ্ঠ মন্ত্রী ও প্রশাসনের উপরের শ্রেণীর কর্মকর্তাদের ভাইরাসটির বিষয়ে মৌলিক জ্ঞানের শূন্যতা। মৌলিক জ্ঞানের শূন্যতার প্রমাণ হাজার হাজার থাকলেও তাদের বক্তব্যে কিছুটা ফুটে উঠেছে। যেমন, সরকার করোনার চেয়ে শক্তিশালী, ৮০% করোনা রোগী কোন চিকিৎসা ছাড়াই ভাল হয়ে যায়, ফুসফুস বের করে সাবান পানি দিয়ে ধোয়ে ফেলা, বেশি করে মরিচ দিয়ে আলু ভর্তা খেলে করোনা পালাবে ইত্যাদি ইত্যাদি। যদিও প্রাথমিক পর্যায়ে সংবাদ উপস্থাপিকার দায়িত্ব পালনকারী আইইডিসিআর পরিচালক দেশবাসীর সামনে সম্ভাব্য দুর্যোগের ব্যপারে সর্তক করে নিজের দায়িত্ব পালনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। যেহেতু বাংলাদেশের বাস্তবতায় মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার বাইরে কিছুই করার ক্ষমতা থাকেনা তাই আইইডিসিআর কোন প্রতিরোধ মূলক ব্যবস্থা গ্রহন করতে পারেনি বলে প্রতীয়মান হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যখন করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ে “ভয়াবহ” সতর্কতা জারি ও মহামারী ঘোষণা করেছে, সারা বিশ্বের প্রতিটি দেশ যখন তাদের নাগরিকদের এই প্রানঘাতি ব্যাধি থেকে বাঁচাতে রাষ্ট্রের সর্বশক্তি নিয়োগ করছে, ঠিক তখন আমাদের দেশ এই ভাইরাসের সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকার পরও এর মোকাবিলায় প্রস্তুতি গ্রহণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয় ও দপ্তরের শিথিলতা আমাদের অত্যান্ত আশাহত ও উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে বাংলাদেশ সরকারের প্রস্তুতি খুবই দুর্বল বলে পত্র পত্রিকায় বিভিন্ন মহল থেকে সমালোচনা হয়েছে বা হচ্ছে। নিকট অতীতে ডেংগু পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের ব্যর্থতা সকলের হয়তবা মনে আছে। সরকারি বেসরকারি কোনো হাসপাতালে জায়গা না পেয়ে দেশব্যাপী ডেংগু আক্রান্ত রোগীদের ভোগান্তি আর অসহায় আর্তনাদ আমাদের আগামীদিনের অনাহুত পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্নতার মাত্রাকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।

দুঃখের সাথে বলতে হয় দেশের এমন সংকটকালে যাারা সংক্রামক রোগ নিয়ে গবেষণা করে জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন তারা তাদের অর্জিত বিষয় ভিত্তিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দেশ তথা জনগণের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারছে না। এর একটি মাএ কারণ সঠিক জায়গায় সঠিক ব্যাক্তির পদায়ন নেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে। যার যে কাজ তাকে সেই কাজে লাগানো হচ্ছে না। অপ্রাতিষ্ঠানিক পান্ডিত্য বেড়ে গেছে । মূল্যায়িত হচ্ছে না মেধা ও দক্ষতা। তেলবাজি আর অর্থের লালসা যেন গ্রাস করে ফেলছে আমাদের সবকিছু যা করোনার চেয়েও ভয়ঙ্কর। অসুস্থ অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা সমাজ ও রাষ্ট্রকে নেহাতই ধ্বংসের দিকে ধাবিত করছে। এর থেকে বেড়িয়ে আসতে না পারলে আমাদের মুক্তি মিলবে না।

করোনা প্রকৃতির অভিশাপ নয় আশীর্বাদ হয়ে যেন এসেছে। প্রকৃতি তার নতুন জীবন ফিরে পেতে শুরু করেছে। মানুষকে ঘরে বন্দি করে রেখে প্রকৃতি তার ক্ষত পূরণ করে নিচ্ছে। করোনা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমদেরকে সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা নতুন করে সাজাতে হবে। যোগ্য ব্যক্তির যোগ্য আসন ও নেতৃত্ব এক্ষেত্রে সমাজ ও রাষ্ট্রকে সঠিকভাবে পরিচালিত করতে পারে। সুশিক্ষা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ দিয়ে মানবসভ্যতাকে জাগ্রত করতে হবে। শিক্ষা, গবেষণা ও স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিতে পারলে এসব মোকাবেলা করা সহজ হবে।

লেখক:
ডাঃ এস.এস.আর. জা.আলম
সহকারী অধ্যাপক ও পিএইচডি গবেষক
ওসাকা প্রিফেকচার ইউনিভার্সিটি
ইজুমিসানো, ওসাকা, জাপান।

  •  
  •  
  •  
  •