করোনায় বাংলাদেশ ও আমাদের করণীয়

ডাঃ মোঃ ইউনুছ আলী

কোভিড-১৯,একটি ভাইরাস জনিত সংক্রমণ রোগ আমরা সবাই জানি। চিনের উহান থেকে শুরু হয়ে বিশ্বের প্রায় ২১৩ টা দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্বের অনেক দেশের মত বাংলাদেশও প্রথমেই যে ভুলটা করেছিল তা হল এটাকে পাত্তা না দেয়া। বাংলাদেশ অনেকটা সময় হাতে পেয়েও সদ্ব্যবহার করতে পারে নাই । এর পিছনে কারন ছিল রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বিভাগের সমন্নয়হীনতা। রাস্ট্র প্রধানের সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তা বাস্তবায়ন অবহেলার শিকার হয়। প্রথমেই যদি স্থল, নৌ, ও আকাশ পথে আসা যাত্রিদেরকে সঠিকভাবে এবং কঠোরভাবে Quarantine (সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে পৃথক করে রাখা  রোগের লক্ষণ প্রকাশ পাওয়া পর্যন্ত) এবং  Isolation (আক্রান্ত ব্যাক্তিকে আলাদা করে রাখা) করা হতো তাহলে হয়তো বাংলাদেশকে এত খেসারত দিতে হতো না। যে পরিমান অর্থ খরচ হল বা হচ্ছে তাও হতো না । আমরা যেটি করলাম – ভাইরাস আগে আগে গেল আমরা পিছে পিছে হাটলাম। উচিত ছিল ভাইরাসের আগে আগে চলা।

শুরুতে সতর্কতা স্বরূপ যাত্রিদের থার্মাল  স্ক্যানিং, quarantine ও, Isolation করা হয়েছিল বটে তবে তা ছিল খুবই দুর্বল । স্ক্যানার মেশিনের অপ্রতুলতা, স্ক্যানিং না করা, সঠিক ভাবে quarantine না করা ইত্যাদি। মানুষ জানে দেশের সীমাবদ্বতা আছে। চাইলেই আমরা বড় ধরনের কিছু করতে পারিনা । আবার এটাও ঠিক, আমরা পারিনা এমন কঠিন কাজও নাই। আমরা যদি নিজস্ব আর্থায়নে পদ্মা সেতু করতে পারি তাহলে কোভিড-১৯ পরাভুত করা তেমন কঠিন হবে আমি বিশ্বাস করিনা। প্রথমেই আমাদের ভুল হয়েছে এটা স্বীকার করতেই হবে।

ভুলগুলোর দিকে না যেয়ে এখন কি করা যায় সেদিকে আলোচনা করা যাক। দিনদিন সংক্রমণের হার বেড়েই চলেছে। ২৯ মে, ২০২০ তারিখে তারিখে সংক্রমণের হার ২২% এর উপরে। এভাবে বাড়তে থাকলে অবস্থা যে ভয়াবহ আকার ধারন করবে তাতে সন্দেহ নাই। অর্থনীতির ধ্বস ঠেকাতে দোকান পাট , গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি, কলকারখানা, গণপরিবহণ সীমিত আকারে খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত অনেকাংশে সঠিক হলেও বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। কারন মানুষ সীমিত আকার মানবে না, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখবেনা, মাস্ক পরবে না, গণপরিবহনে কমযাত্রী এর কথা বলে বেশি যাত্রী উঠাবে । ফলে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে । তাই আমাদের যা করা প্রয়োজন-

১। প্রত্যেক জেলায় করোনা প্রতিরুধ কমিটি গঠন করা উচিত ছিল। কমিটির সদস্য পাবলিক হেলথ স্পেশালিষ্ট, মেডিসিন স্পেশালিষ্ট, চাইল্ড স্পেশালিষ্ট, Virologist , সার্জন, মেয়র, সিভিলসারজন, জেলাপ্রশাসক, অফিসার ইনচার্জ্ , সভাপতি চেম্বার অফ কমারস, সভাপতি পরিবহণ সমিতি, ও ৫জন বিশিষ্ট সমাজ সেবক। এই কমিটিকে ক্ষমতায়ান ও সব দিক দিইয়ে সহায়তা প্রদান করা।

২। বর্তমান অবস্থায় করনীয় – পরীক্ষা পরীক্ষা পরীক্ষা; নমুনা পরীক্ষার বিকল্প নাই। যে কোন মূল্যে পরীক্ষার পরিধি বাড়াতে হবে। প্রতিদিন ৩০/ ৩৫ হাজার নমুনা পরিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। যত বেশি পরিক্ষা তত বেশি নতুন শনাক্ত। যত বেশি শনাক্ত তত কমে যাবে ইনফেক্সন হার।

৩। পাবলিক স্থান, হাসপাতাল, ক্লিনিক, শপিংমল, এ Disinfection corner, হাত ধুয়ার ব্যবস্থা , hand senitizer etc ব্যবস্থা করা।

৪। কঠোরভাবে সামাজিক দূরত্ব নিয়ন্ত্রণ করা ।

৫।বাধ্যতামুলকভাবে ব্যক্তি পর্যায়ে মাস্ক ব্যবহার করা ।

৬। স্বাস্থ্য সেবা প্রদানকারি ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশ এর স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী পর্যাপ্ত পরিমানে সরবরাহ নিশ্চিত করা।

৭। অস্থায়ী ভাবে কোভিড হাসপাতাল স্থাপন করা।

এগুলো বাস্তবায়ন করতে পারলে করোনা নিয়ন্ত্রণে আনা হয়ত অসম্ভব হবে না।

 

লেখকঃ ডাঃ মোঃ ইউনুছ আলী
অধ্যাপক, কমিউনিটি মেডিসিন
কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলেজ বাংলাদেশ
Email : yunusali62@gmail.com

  •  
  •  
  •  
  •