প্রানিসম্পদে জনবল নিয়োগ সময়ের দাবী

ড. সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন

করোনা পরিস্থিতিতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের সংকট মোকাবেলায় ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এ সংকট মোকাবেলায় প্রাণিসম্পদে উৎপাদন ও বিপণন সমুন্নত রাখতে এবং বিশ্বব্যাপি মন্দা আশংকায় আমিষ ও পুষ্টির চাহিদা পূরণে এই সেক্টরে জনবল নিয়োগ জরুরী হয়ে পড়েছে।

করোনার আগ্রাসন হতে পৃথিবীর সহসা মুক্তি মিলবে বলে মনে হচ্ছে না। ভ্যাকসিন আবিষ্কার এবং তা পৃথিবীর ৭০০ কোটি মানুষকে প্রয়োগের ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত জ্যামেতিক হারে বেড়ে ভয়াবহ অবস্থা হতে পারে। করোনা পৃথিবীর জন্য অত্যন্ত ভয়ংকর অভিশাপ এবং ইতোমধ্যেই পৃথিবীর সব কিছু তছনছ করে দিয়েছে। একটি সম্পুর্ন নতুন পৃথিবী সৃষ্টি আলামত পরিলক্ষিত হচ্ছে। মানুষের সর্বস্তরে মারাত্মক বিপর্যয় ঘনিভুত হচ্ছে। মানুষের সামনে বেঁচে থাকাই এখন সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ।

জীবন বাঁচার সুযোগ না থাকলে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে গতি সঞ্চার করা সহজ হবে না। করোনার আগ্রাসনের পরবর্তী পরিস্থিতি হবে আরো ভয়াবহ বলে সহসাই অনুমান করা যায়। পৃথিবীতে এমন ভয়াবহ দুর্যোগময় অবস্থা বা যুদ্ধ পরবর্তী অবস্থায় মারাত্মক খাদ্য সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী দুরাবস্থার কথা (চুয়াত্তর) আমরা সবাই জানি। তখন ছিল এলাকা ভিত্তিক। সারা বিশ্ব সেভাবে এগিয়ে আসেনি। তারপরও বাংলাদেশকে সেই অবস্থা সামাল দিতে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। এখনকার সমস্যা তো সারা পৃথিবী ব্যাপি। কেউ কারো নয়। কাজেই খাদ্য (কৃষিজাত ও প্রাণিজাত) উৎপাদন ও বিপণণে ব্যাপক পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে।  করোনা পরিস্থিতিতে আমিষ ও পুষ্টির জন্য বিশ্বব্যাপী মাছ, মাংস, দুধ ও ডিমের ব্যাপক চাহিদা হবে। সে ক্ষেত্রে পোল্ট্রি, মৎস্য ও ডেইরি খাতে উৎপাদন বৃদ্ধিতে এখনই ব্যবস্থা নেয়া দরকার।

দেশে করোনা ও আম্পানের প্রভাবে হাজার হাজার ডেয়রি, পোল্ট্রি, ব্রয়লার, ছাগল, ভেড়া, হাস সহ অন্যান্য পশু উৎপাদনের ক্ষেত্রে মারাত্মক বিপর্যয় শুরু হয়েছে। এদিকে এসব প্রাণিজ আমিষ উৎপাদনকারীরা কোন ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না অন্যদিকে শহরাঞ্চলে এসব পণ্যোর অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইতোমধ্যে করোনা কতৃর্ক জটিল পরিস্থিতির কারনে প্রাণিজ আমিষ উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। ডিএলএস (প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর) এর হিসাব মতে দেশের একটা বৃহৎ অংশ প্রাণিজ পুষ্টি উৎপাদনের সাথে জড়িত যেমন ছোট বড় মিলিয়ে- ডেয়রি খামারি – ১৭ লক্ষ, বিফ (মাংস) – ২১ লক্ষ, ব্রয়লার – ৮৫ হাজার, লেয়ার খামার – ৯৫ হাজার, হাস খামার – ২৮ হাজার এবং  ছাগল ভেড়া – ৮ লক্ষ।

সব মিলিয়ে প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ খামরি প্রাণি সম্পদ উৎপাদনের সাথে জড়িত। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো এত বড় ও বিস্তৃত এবং জনস্বাস্থ্যে গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরকে এগিয়ে নেয়ার জন্য জনবল প্রয়োজনের তুলনায় কম। কাজেই করোনা উত্তর দেশের শিশু- কিশোর- বৃদ্ধ সকল মানুষের পরিমিত পুষ্টি বিশেষ করে মানুষের দেহের জন্য অত্যান্ত প্রয়োজনীয় প্রাণিজ আমিষ পূরনের সুযোগ অব্যাহত রাখতে প্রতিটি উপজেলায় অবিলম্বে একজন এ্যনিমেল প্রোডাকশন গ্রাজুয়েট ও একজন করে ভেটেরিনারি গ্রাজুয়েট নিয়োগ দেয়া অত্যন্ত জরুরী। তা না হলে এত বৃহৎ সেক্টরকে সামাল দেয়া সম্ভব হবে না।

উল্লেখ্য যে, প্রাণিসম্পদ সেক্টরের জনবল পুরনের জন্য একটি পূর্নাঙ্গ অর্গানোগ্রামের প্রস্তাব ইতিমধ্যেই অনুমোদনের চুড়ান্ত পর্যায়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয়ে প্রক্রিয়ান্বিত আছে। কাজেই জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে সেই অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী প্রতিটি উপজেলায় একজন করে এ্যনিমেল হাজবেন্ড্রি গ্রাজুয়েট ও ভেটেরিনারি গ্রাজুয়েট নিয়োগের ব্যবস্থা করে দেশের মানুষকে সুরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য সদাশয় সরকারের দৃষ্টি আকর্ষন করছি। এটি একটি সময়ের দাবী।

 

লেখক: ড. সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন
সাবেক উপাচার্য, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

প্রফেসর, পশু প্রজনন ও কৌলিবিজ্ঞান বিভাগ
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়,ময়মনসিংহ

  •  
  •  
  •  
  •