ওরা পারলে আমরাও পারবো

ড. মোঃ সহিদুজ্জামান

শুনেছিলাম আমার নানা নাকি জাহাজ বানিয়ে আকাশে উড়িয়েছিলেন। খবর পেয়ে সেই সময় (পূর্ব পাকিস্থান) পুলিশ এসে তাঁকে ধরেও নিয়ে গিয়েছিলেন এবং জাহাজটি ভেঙ্গে ফেলেছিলেন। অবশ্য যন্ত্রপাতিগুলো রেখে গিয়েছিলেন। নানাকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি তবে তাঁর যন্ত্রপাতিগুলো ছোটবেলায় দেখে ভেবেছিলাম মামারা যদি একটু চেষ্টা করে মোটামুটি আকাশে উড়ার একটি খেলনা হলেও তৈরি করতে পারতেন কতই না ভাল হত। তখনকার দিনে এরকম উদ্ভাবনী কার্যক্রম করায় কেন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হত তখন বুঝতে না পারলেও এখন বুঝতে পারছি।

করোনা হাত থেকে বাঁচতে মানুষের চেষ্টার শেষ নেই। প্রতিনিয়ত পাওয়া যাচ্ছে নতুন নতুন তথ্য, তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন ধারণা। চলছে কার্যকরী চিকিৎসা ও প্রতিষেধক তৈরির সর্বাত্মক চেষ্টাও। সারা বিশ্ব যেখানে চেষ্টা করে যাচ্ছে সেখানে বাংলাদেশও বসে নেই। মাঝে মাঝে আমরা সংবাদ পাচ্ছি দেশে করোনায় সাফল্যকথা, চিকিৎসায় সাফল্য, কার্যকরী ওষুধের সন্ধান এবং সর্বশেষ ভ্যাক্সিন তৈরির চেষ্টার কথা।

কোনটি আবিষ্কার ও উদ্ভাবন আর কোনটি সফলতা সে প্রশ্নে যেতে চাই না। তবে কিছু ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠান যে চিন্তা ও চেষ্টা করছে সেটিই মূখ্য বিষয় এবং নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবীদার। করোনার এই দুঃসময়ে অনেকে হয়তবা হাত পা গুটিয়ে বসে বসে সুবিধা ভোগ করছেন। অনেকে প্রতারণার চেষ্টাও করছেন। আবার অনেকে সামান্য ভাল কিছু হলেও চেষ্টা করে যাচ্ছেন। যারা চেষ্টা করছেন তাদেরকে আবার দমানোর জন্য একদল প্রস্তুত হয়ে আছেন। আবার একদল আছেন যারা সবকিছুতেই গন্ধ খোঁজেন এবং অগঠনমূলক সমালোচনা করেন। এছাড়া কিছু মিডিয়া সংবাদকে মূখরোচক করার জন্য, তিলকে তাল করেও প্রচার করছেন।

করোনা ভ্যাক্সিন তৈরির কাজ নিয়ে গ্লোব বায়োটেকের যে প্রেস কনফারেন্স তা দেখে আমি অনেক মুগ্ধ হয়েছি। করোনায় আশা জাগানিয়া এই প্রেস কনফারেন্সকে পূর্বের অন্য খবরগুলোর সাথে তুলনা করছি না কারণ তাদের কাজের ধরণ সর্ম্প্ণূ বৈজ্ঞানিক এবং আন্তর্জাতিক মানসস্মত বলে মনে হয়েছে। সেদিনের সংবাদ সম্মেলন হতে আমি যা বুঝেছি- গ্লোব বায়োটেক কোভিড-১৯ এর ভ্যাক্সিন তৈরির একটা প্রচেষ্টা শুরু করেছে বাংলাদেশে। আশা জাগানিয়া কিছু প্রাথমিক গবেষণা তাঁরা সুসম্পন্ন করেছেন। ভ্যাক্সিন তৈরির আন্তর্জাতিক গাইডলাইন হিসেবে প্রথম তিনটি ধাপ হলোঃ এক্সপ্লোরেটরি বা অনুসন্ধানাত্মক ধাপ (ভ্যাক্সিন প্রার্থী বাছাই), প্রি-ক্লিনিক্যাল ধাপ (গবেষণাগারের প্রাণীতে ট্রায়াল) এবং ক্লিনিক্যাল ধাপ (মানুষে ট্রায়াল দেওয়া)। তাঁরা ইতিমধ্যেই সফলতার সাথে অনুসন্ধানাত্মক ধাপ পেরিয়ে এসেছেন। তাঁরা ডাটাবেজ থেকে কোভিড-১৯ এর সকল জিন সিকোয়েন্স বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ৩টি ভ্যাক্সিন প্রার্থী বাছাই করেছেন। এই তিনটি প্রার্থীকে দেশীয় করোনাভাইরাসের জিন থেকে আলাদা করে তা সঠিক কি না প্রমান করেছে। প্রি-ক্লিনিক্যাল ধাপে তাঁরা খরগোশ এর দেহে এই ভ্যাকসিন প্রার্থী প্রয়োগে এন্টিবডি উৎপাদনের প্রমাণও পেয়েছেন। তাঁদের পরিকল্পনা মতে, খুব শীঘ্রই তাঁরা গাইডলাইন অনুসরণ করে একটি নিয়ন্ত্রিত এনিমেল ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করবেন যা ভ্যাক্সিন আবিস্কার বা তৈরির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।

প্রেস কনফারেন্সে যিনি (ড. আসিফ মাহমুদ) বৈজ্ঞানিক বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন তাঁর যে এ বিষয়ে সম্যক জ্ঞান রয়েছে তা আমি একজন বিজ্ঞানের গবেষক হিসেবে নির্দিধায় বলতে পারি। আমি বিশ্বাস করি ভ্যাক্সিন তৈরির এই দলটিতে যেসব গবেষকরা রয়েছেন তাঁরা নিঃসন্দেহে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে আপ-টু-ডেট জ্ঞান রাখেন এবং কঠোর পরিশ্রম করেছেন। অন্যথায় এই অল্প সময়ে ভ্যাক্সিন তৈরির দ্বিতীয় ধাপে আসতে পারতেন না। তাদেরকে আমাদের অবশ্যই অভিনন্দন ও অনুপ্রেরণা দেওয়া প্রয়োজন।

গতকাল পর্যন্ত সারা বিশ্বের করোনা ভ্যাকসিন আপডেট লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, ১২৫টির অধিক ভ্যাকসিন প্রাার্থী প্রি-ক্লিনিক্যাল স্টাডিতে রয়েছে। এর পরের ধাপ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের তিনটি ফেজের ১মটিতে রয়েছে ১৪টি, ২য় ফেজে রয়েছে ১১টি এবং ৩য় ফেজে রয়েছে মাত্র ৩টি। এপর্যন্ত অনুমোদন পেয়েছে মাত্র একটি ভ্যাক্সিন । আমরা যদি গ্লোব বায়োটেক এর প্রস্তাবিত ভ্যাকসিনকে প্রি-ক্লিনিক্যাল স্টাডি পর্যায়েও বিবেচনা করি তাহলে সেটি ঐ ১২৫ টির দলে ঢুকবে। এটিই বা কম কিসের।

কোভিড-১৯ এর ৭৬ টি জিন সিকোয়েন্স বাংলাদেশ থেকে জমা পড়েছে। যেসব ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠান এই সিকোয়েন্সগুলো করেছে তারাও প্রশংসার দাবীদার। কারণ সিকোয়েন্স তথ্য ছাড়া ভ্যাক্সিন ক্যানডিডেট টার্গেট করা সম্ভব নয়। আরটি পিসিআর এর মত একটি সূক্ষ্ম ও জঠিল কারিগরি পদ্ধতি অল্প সময়ে আয়ত্ব করে দেশে কোভিড-১৯ সনাক্তকরণে ব্যবহার করা হচ্ছে সেটিও বা কম কিসের।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে মিডিয়াতে বিষয়গুলো যখন পরিবর্তিত হয়ে আসে তখন সেই আঙ্গিকে এমন কিছু সমালোচনা করা হয় যা উদ্যোক্তা ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মনোবল ভেঙ্গে দিতে পারে। গ্লোব বায়োটেক কিন্তু বলেনি যে তারা ভ্যাক্সিন আবিস্কার করে ফেলেছে। তারা করোনা ভ্যাকসিন তৈরির কাজ শুরু করে সফলতার সাথে এগুচ্ছে, এভাবে মিডিয়ায় আসলে ভাল হত। আবার দেখা যায় যিনি কোনদিন গবেষণা করেননি বা গবেষণার জন্য পিপেটটিও ধরেননি এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কোন জ্ঞান নেই, তিনিও মিডিয়াতে মন্তব্য করে বসেন। কিছু একটা না বলতে পারলে তিনি ভাল বক্তা নন বা জ্ঞানী নন এটি মনে হয় আমাদের দেশের একটা সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।

বিশ্বে নিজেদের জায়গা করতে গেলে জ্ঞান ও প্রযুক্তি দিয়েই করতে হবে। অন্য কিছু দিয়ে নয়। তৈরি করতে হবে নিজস্ব ব্রান্ড। অনেক মেধাবী দেশে মূল্যায়ন না পেয়ে বিদেশে অন্যের ব্রান্ড তৈরি করে যাচ্ছেন সেখবর হয়তবা আমরা রাখি না। তাঁরা এদেশে বঞ্চিত হলেও দেশকে ভালবাসেন, সুযোগ পেলে দেশের জন্য কাজ করতে চান। আবার যারা নিহাতই দেশে রয়ে গেছেন তারা এভাবে ট্রল খেয়ে হতাশ হতে হতে হয়ত একদিন থেমে যাবেন। আমাদের দরকার উদ্যোক্তা এবং সরকারী ও বেসরকারী পৃষ্টপোষকতা। দেশে অনেক আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন গবেষক আছেন তাদেরকে কাজে লাগাতে হবে। প্রয়োজনে বিদেশে অবস্থানরত মেধাবীদের দেশের ব্রান্ড তৈরিতে কাজে লাগাতে হবে যেমনটি ভারত ও চীনসহ অনেক দেশেই করছে। অন্যের ব্রান্ড আমদানী করার মনোভাব পাল্টাতে হবে। ওরা যদি পারে, আমরাও পারবো।

দেশে মেডিকেল সায়েন্সে গবেষণা হয় না বললেই চলে। যারা যতটুকুই বা করেন তারা মেডিকেল সায়েন্সের গ্রাজুয়েট নন। দেশে করোনা চিকিৎসা গবেষণা ও কিট তৈরির চেষ্টা অনেক প্রতিষ্ঠান করছে। কিন্তু এইসব গবেষণা ও কিটের অনুমোদন বা স্বীকৃতির জন্য যারা মূল্যায়নকারী তাদের সে বিষয়ে পরিপূর্ণ জ্ঞান এবং স্বীকৃত কোন জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধ আছে কি না সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

গবেষণা বা বিভিন্ন টেস্টের জন্য বিদেশ থেকে আমদানি করা কিট যে সবসময় সঠিক ভাবে কাজ করে তা ভাবার কোন কারণ নেই। এমনও দেখেছি যে কিছু দেশের কিটে যে পরিমান কার্যকারীতার কথা বলা হয় সেই পরিমান কার্যকারিতা পাওয়া যায় না। অথচ আমদানি করা হচ্ছে হরহামেশাই । আমদানি করা কিটগুলো অনুমোদনের সময় সঠিকভাবে পরীক্ষা করে অনুমোদন দেওয়া হয় কি না জানি না তবে দেশীয় কিট যেভাবে পরীক্ষা নিরিক্ষা করে দেখা হচ্ছে সেভাবে দেখলে হয়ত অনেক কিটই সঠিক ফলাফল দিবে না।

দেশে অনেক মেধাবী আছে সব পেশায়। তাদেরকে মূল্যায়ন করলে দেশেই অনেক কিছুই তৈরি করা সম্ভব। আমি বিশ্বাস করি শুধু কিট বা ভ্যাক্সিন নয় আমাদের মেধাবীদের করোনা ভাইরাস সনাক্তকনরণের জন্য পিসিআর মেসিন তৈরি করতে বললেও তাঁরা পারবে। কিন্তু সেই উদ্যোগগুলো কি আমরা নেই?

দেশকে এগিয়ে নিতে হলে শিক্ষা ও প্রযুক্তি দিয়েই এগিয়ে নিতে হবে। মেধা বাঁচলে জাতি বাঁচবে। মেধার মূল্যায়ন হলে জাতির মূল্যায়ন হবে এই চিরন্তন সত্যকে আমাদের উপলব্ধি করতে হবে।। আমরাও গর্বের সাথে বলতে পারবো, ” ওরা পারলে, আমরাও পারি”।

 

লেখক ও গবেষক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

  •  
  •  
  •  
  •