শিক্ষায় সংখ্যা নয়, মেধা ও মান বাড়ানো প্রয়োজন

সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন

দেশে শিক্ষা ব্যবস্থা সামগ্রিক অর্থে নিশানাবিহীন হয়ে পরেছে। স্বাধীনতার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু “কুদরত-ই-খোদা শিক্ষা কমিশন” করে স্বাধীন বাংলাদেশের জ্ঞান ও মেধা ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু পঁচাত্তরের নরঘাতকদের নৃশংস হত্যা কান্ডের মধ্য দিয়ে জাতির জনকের নিহত হবার পর স্বাধীন বাংলাদেশ উল্টোপথে ধাবিত হতে থাকে। সব কিছুর সাথে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয় শিক্ষা ব্যবস্থা। তারপর একের পর এক কমিশন গঠিত হয়। শিক্ষা ব্যবস্থা সর্বক্ষেত্রে মেধা শূন্য হয়ে পরে। প্রাথমিকস্তরে মারাত্মক বিপর্যয় ঘটে। দেশে যার যেমন খুশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু করতে থাকে। শিক্ষায় শক্তিশালীভাবে অনুপ্রবেশ করেছে বানিজ্যিক মনোভাব। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে সরকারের পাশাপাশি ব্যঙের ছাতার মত দেশের আনাচে-কানাচে বাংলা, ইংরেজি, আরবি ভাষায় অগণিত বিদ্যালয় ও কলেজ স্থাপিত হয়েছে। আরবি ও ইংরেজি মিডিয়ামে যে কত ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে তার কোন হিসাব জানা নেই। সেখানেই শেষ নয় বাসায় বাসায় ব্যবসা বাণিজ্যের লালসায় অনিয়ন্ত্রিতভাবে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠে। এ যাবত ১০৬ টির অধিক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে। সেখানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কেবল সার্টিফিকেট বিক্রি হচ্ছে। এমন কি EEE এর মত অনেক ডিগ্রি আছে যা সপ্তাহে শুক্রবার ও শনিবারে ৪/৫ টি ক্লাশ নিয়ে কোর্স সম্পন্ন করে সার্টিফিকেট দেয়া হচ্ছে। দেশে কেবল সার্টিফিকেটধারী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।

অন্য দিকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলির অধিকাংশের অবস্থা খুবই নাজুক। শিক্ষার মানোন্নয়ন বা মেধা সৃষ্টির প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। রিজিওনাল বা ইন্টারন্যাশনাল কোন মাপ কাঠিতেই বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ১০০০ এর নীচে। যেখানে ভারত, নেপাল, মালয়েশিয়া এমনকি পাকিস্থানের বেশ কয়েকটি করে বিশ্ববিদ্যলয় বিশ্ব ক্রমতালিকায় স্থান করে নিচ্ছে। মেধা ও জ্ঞান বিকাশের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না করে এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা না করে যেমন খুশি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ঘোষণা দেয়া হচ্ছে। শিক্ষা বিস্তার সম্প্রসারন আর মেধাসৃষ্টির বিকাশ এক সাথে চলতে পারে না। দেশে বর্তমানে ৫৩ টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে জেনারেল বিশ্ববিদ্যালয় – ১৫ টি, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়- ৮ টি, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় – ৫ টি, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়- ৫ টি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়- ১৫ টি, স্পেসালাইজড বিশ্ববিদ্যালয় – ৪ টি, অফ ক্যাম্পাস বিশ্ববিদ্যালয় – ৩ টি। এগুলোর মধ্যে ৮টি বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরো কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষি বিষয়ক ডিগ্রি প্রদান করা হচ্ছে। পত্রপত্রিকার তথ্য মতে আরো ৪ টি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বৎসর দুই আগে খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় খোলা হয়েছে যেখানে কোন ভৌত অবকাঠামো তৈরির আগেই ছাত্র ভর্তি করা হচ্ছে।

ইতিমধ্যে যে সকল পুরাতন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আছে তাদের মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সব চাইতে পুরাতন যেটি ১৯৬১ সনে স্থাপিত। সেখানেও অদ্যাবধি পর্যাপ্ত আধুনিক গবেষণাগার তৈরি সম্ভব হয়নি। নানা প্রতিবন্ধকতা ও সুযোগের অভাবে মানসম্পন্ন লেখাপড়া নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। উচ্চ শিক্ষায় মেধা সৃষ্টি দেশের মূল চালিকা শক্তি। বিজ্ঞান ভিত্তিক মেধা সৃষ্টি না হলে কোন উন্নয়নই টেকসই হবে না।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিযোগিতামূলক অর্থনৈতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে স্বীকৃত। ক্রমবর্ধমান জ্ঞান-চালিত বিশ্বঅর্থনীতিতে টিকিয়ে থাকতে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন গবেষণা এবং পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির প্রয়োজন। কাজেই এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, উচ্চ শিক্ষায় মেধা সৃষ্টিই দেশের সার্বিক উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। অথচ আমাদের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান উন্নয়নের বাস্তব কোন পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। বিগত প্রায় ৬/৭ বৎসর যাবত বিশ্বব্যাংকের ঋনের হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে অপরিকল্পিতভাবে পরিচালিত হেকেপ প্রকল্পের তেমন কোন উল্লেখযোগ্য প্রভাব মেধা সৃষ্টিতে পরেছে বলে অনেকেই মনে করেন না। আমাদের বড় সমস্যা হলো কারো কোন দায়বদ্ধতা বা জবাবদেহিতা নেই কোন ক্ষেত্রেই। নেই ছাত্র-শিক্ষক মূল্যায়নের উপযুক্ত পদ্ধতি।

কৃষি একটি উচ্চতর বিজ্ঞান। সাধারন বিজ্ঞানের মত নয়। কৃষি শিক্ষায় দক্ষতা বাড়াতে যেমন আন্ত গবেষণাগার প্রয়োজন তেমনি মাঠ গবেষণাগারও অত্যান্ত জরুরী। বতর্মানে যে আটটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আছে তাতে মেধা সৃষ্টির জন্য অত্যান্ত জরুরী উপাদানগুলোও নেই। শিক্ষকের অপ্রতুলতা, শিক্ষার আধুনিক টুলসসহ সব ধরনের যন্ত্রপাতির অপ্রাপ্ততা বিরাজমান। এছাড়াও দেশের সকল কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়েরও মান ও মেধা নিয়ন্ত্রনের জন্য যে বিষয়গুলি বিশ্বের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং এ ব্যবহার করা হয় তার প্রায় সবগুলো ফ্যাক্টরই নিদারুনভাবে উপেক্ষিত যেমন: একাডেমিক খ্যাতি (৪০), চাকুরীদাতা প্রতিষ্ঠানের খ্যাতি (১০), শিক্ষক শিক্ষার্থীর অনুপাত (২০), আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্ক (১০), শিক্ষকদের গবেষণার উদ্ধৃতি (৫), গবেষণার পেপার উদ্ধৃতি (৫), আন্তর্জাতিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সংখ্যা (৫+৫=১০), পিএইচডি ডিগ্রীধারী শিক্ষক সংখ্যা (৫)।

বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ই এসবের তোয়াক্কা করে না বা চিন্তা চেতনার মধ্যে আছে বলেও মনে হয় না। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির অবস্থা আরো করুন। দেশে বর্তমানে ৮ টি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। তাদের মধ্যে অধিকাংশগুলোতে যথেষ্ট গবেষণাগার ও ফিল্ড ল্যাব নেই, লেখাপড়া সংক্রান্ত আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির ও অভাব। বর্তমানে সবগুলি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হতে প্রতি বছর প্রায় চার হাজার গ্রাজুয়েট বের হয়। বিভিন্ন কারনেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানসম্পন্ন মেধাবী গ্রাজুয়েট তৈরি করা যাচ্ছে না। উচ্চতর শিক্ষায় মেধা সৃষ্টি করতে না পারলে দেশের কোন উন্নয়নই টেকসই হবে না। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমরা অগ্রসর হতে পারবো না। শুনা যাচ্ছে আরো ৪/৫ টি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় চালু করা হবে।

সঙ্গত কারনেই নতুন কোন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় না খুলে বর্তমানে যা আছে তাদের আরো সমৃদ্ধ করা দরকার। দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা করে আগামী পঞ্চাশ বছরে দেশের কোথায় কতজন কৃষি বিজ্ঞানী প্রয়োজন হবে তা নির্ধারন করে সে মোতাবেকই কৃষি গ্রাজুয়েট তৈরি করতে হবে। যদি আরো অধিক সংখ্যক গ্রাজুয়েট দরকার হয় তবে নতুন কোন বিশ্ববিদ্যালয় না খুলে নির্বাচিত কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার সকল সুযোগ সুবিধা বাড়িয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি করা যেতে পারে। তাতে সরকারের যেমন অনেক সাশ্রয় হবে একই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গুনগত মানও বাড়বে। এই মূহুর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বা শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে মেধাসম্পন্ন বিশ্বমানের গ্রাজুয়েট তৈরির উপর জোর দিতে হবে।

মনে রাখতে হবে এখন বিশ্বে চরম প্রতিযোগিতার সময়, বিশ্ব র‌্যাংকিং এ স্থান করতে না পারলে বিশ্বের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা যাবে না। কাজেই সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে কিউএস র‌্যাংকিং এর জন্য নির্ধারিত যে ফ্যাক্টরগুলো আছে তা যাতে যথাযথ প্রয়োগ করা যায় সে পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। সকল স্তরে জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা না গেলে কোথাও কোন উন্নয়ন করা সম্ভব নয়। প্রাইভেট সেক্টরে সার্টিফিকেট বিক্রির যে হিরিক পরেছে তার লাগাম টেনে ধরতে হবে। কাজেই বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি না করে মেধা ও মান বাড়ানোই সময়ের দাবী।

লেখক: ড. সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন
সাবেক উপাচার্য, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

প্রফেসর, পশু প্রজনন ও কৌলিবিজ্ঞান বিভাগ
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়,ময়মনসিংহ

  •  
  •  
  •  
  •