ক্ষুধা, দারিদ্র‍মুক্ত ও সমৃদ্ধশালী দেশ গড়তে সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই 

মো: মাসুদ রানা

পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন ও মর্যাদাপূর্ণ শিল্প হলো কৃষি। কৃষিই কৃষ্টি। কৃষি আমাদের সংস্কৃতির অনিবার্য অনুষঙ্গ।  সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে কৃষি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশের জিডিপিতে কৃষিখাতের অবদান প্রায় ১৪ শতাংশ। সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে দীর্ঘ পরিক্রমায় কৃষি বর্তমান অবস্থায় পৌঁছেছে। কৃষিতে বাংলাদেশের সাফল্য ঈর্ষণীয়। যার ফলশ্রুতিতে ক্রমাগত কৃষি জমি কমতে থাকা, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈরী প্রকৃতি সত্ত্বেও বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ।

ক্ষুধা ও দারিদ্র‍মুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এজন্য তিনি কৃষি বিপ্লবের কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন গ্রামীণ জনপদের দিকে বিশেষভাবে নজর দিতে। কেননা গ্রামই সকল উন্নয়নের মূল কেন্দ্র। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি যখন বেগবান হবে তখন সমগ্র এগিয়ে যাবে। দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের কৃষি শিক্ষায় আকৃষ্ট করতে ও দেশে আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় চত্ত্বরে কৃষিবিদদের প্রথম শ্রেণীর পদমর্যাদায় উন্নীত করেন। আমাদের দেশের কৃষির মূল চালিকাশক্তি কৃষক। কৃষক সমাজ মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সবার অন্নের যোগান দেয় এজন্য তারাই প্রকৃত নায়ক। গ্রামীণ কৃষক জনগোষ্ঠী অনেক অভিজ্ঞ ও দক্ষ। তাদের সাথে সমন্বয় সাধন করে দেশের কৃষিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। তাইতো তাদের ওপরে নতুন কিছু চাপিয়ে না দিয়ে তাদের হাতে কলমে দেখানোর মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনায় খামারের উপাদানসমূহ যেমন- মাঠে বিভিন্ন ফসল চাষ, বসতবাড়ীতে ফল মূল, শাকসবজি চাষ, হাঁস মুরগি পালন, গবাদি পশু পালন ও মাছ চাষ এবং কৃষিতে উদ্ভাবিত নিত্য নতুন প্রযুক্তি ও কলাকৌশলের মাধ্যমে এদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন করা হয়ে থাকে। গ্রুপ আপ্রোচের মাধ্যমে কো অপারেটিভ সোসাইটি গড়ে তোলার মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন ও সার্বিক উন্নয়ন দুটিই মাত্রা পাবে।

বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের গৃহীত বিভিন্ন সময়োপযোগী ও সঠিক পদক্ষেপের কারণে কৃষিতে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ এখন চাল উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, মাছ উৎপাদনে চতুর্থ, আম উৎপাদনে সপ্তম, ফসলের জাত উদ্ভাবনে প্রথম এবং আলু উৎপাদনে সারা বিশ্বে শীর্ষ দশে স্থান করে নিয়েছে। আমরা জানি খাদ্য শুধু চাল, আটা নয় বরং মাছ, মাংস,ডিম ও দুধ এগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রাণিজ আমিষ বিশেষ করে দুধ ও মাংস উৎপাদনে বাংলাদেশ এখনো অনেকটা পিছিয়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির প্রতিদিন ২৫০ মিলি লিটার দুধ পান করা উচিত। কিন্তু বাংলাদেশে দৈনিক মাথাপিছু দুধ পান করার পরিমাণ ৩৩.৭ মিলি লিটার যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। বাংলাদেশে খাদ্য তালিকায় দৈনিক মাথাপিছু মাংস গ্রহণের পরিমাণ ১১.২৫ গ্রাম। দৈনিক মাথাপিছু মাংস গ্রহণের দিক দিয়ে বিশ্বের ১৭৩ টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭২ তম। সুতরাং কৃষিখাতের সামগ্রিক উন্নতির জন্য এবং আপামর জনগোষ্ঠীর পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে প্রাণিজ আমিষের উৎপাদন বাড়ানোর প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে।

বর্তমান সময়ে সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনার (আইএফএম) মাধ্যমে কৃষক তার খামারের সম্পদসমূহ চিহ্নিত করে এদের আন্তঃসম্পর্ক বিবেচনায় সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার করেন। বর্তমানে কৃষিতে উদ্ভাবিত নতুন টেকসই প্রযুক্তি যেমন – বৈরী আবহাওয়া সহিষ্ণু ও উচ্চফলনশীল বিভিন্ন ফসলের জাত, সমন্বিত বালাই দমন ব্যবস্থাপনা, জৈব সার ও সবুজ সার ব্যবহার, একই জমিতে একই সময়ে একাধিক ফসল উৎাদন, গবাদিপশু পালনে গো খাদ্য হিসেবে উন্নত প্রজাতির ফডার ও  ইউরিয়া মোলাসেস ব্লক ব্যবাহারের মাধ্যমে সুষম খাদ্য নিশ্চিতকরণ,  কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে হাঁস, মুরগি ও গবাদিপশুর উন্নত জাত লালন পালন, দুগ্ধজাত পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ যেমন: দুধ থেকে দই, মাখন, ঘি ও নানাবিধ মিষ্টান্ন তৈরি ও বাজারজাতকরণের  মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়া সম্ভব।

কৃষিতে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর জন্য অধিক পরিমাণে রাসায়নিক সার, কীটনাশক, এন্টিবায়োটিক, হরমোন ও স্টেরয়েড ব্যবহার করা হচ্ছে। এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে মানুষ ও সামগ্রিক পরিবেশের ওপরে। যার ফলশ্রুতিতে পরিবেশ দূষণ বেড়েই চলেছে এবং মানুষ বিভিন্ন দুরারোগ্য রোগ ব্যাধি যেমন: ক্যান্সার, আলসার, লিভার সিরোসিস, কিডনী বিকলাঙ্গ হওয়া সহ  নানাবিধ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাপী নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের মাধ্যমে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এজন্য রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের পরিবর্তে অর্গানিক ফার্মিং বা জৈব উৎপাদন পদ্ধতি এর মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন দিন দিন সমগ্র বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করতে ব্যবহার করা হচ্ছে পরিবেশবান্ধব ও স্বাস্থ্যঝুঁকিমুক্ত জৈব প্রযুক্তি। পারিবারিক খাদ্য চাহিদা মেটানোর জন্য বসতবাড়ির উঠানে বা ফাঁকা জায়গায় এবং বড় বড় শহরগুলোতে ছাদ বাগান ও হাইড্রোপনিক্স পদ্ধিতিতে নিরাপদ শাক সবজি ও ফলমূল উৎপাদন দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

তাই পরিশেষে বলতে চাই, সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনায় টেকসই ও পরিবেশবান্ধব কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করে  নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে দেশের আপামর জনগোষ্ঠীর খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ হয়ে উঠবে সুখী ও সমৃদ্ধশালী স্বপ্নের সোনার বাংলা।

________________________________

লেখক
মো: মাসুদ রানা
সহকারী অধ্যাপক, কৃষি সম্প্রসারণ শিক্ষা বিভাগ
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।

  •  
  •  
  •  
  •