বাজার থেকে কিনে আনা মাছ কতটুকু স্বাস্থ্যকর?

rohani

সাক্ষাৎকারঃ

বাংলাদেশে নিরাপদ মাছ উৎপাদন ও স্বাস্থ্যঝুকি নিয়ে মানুষের মনে রয়েছে শংকা। অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ের মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে ৩য়। চাষকৃত মাছের উৎপাদনে ৫ম। অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২০ অনুযায়ী দেশের মোট জিডিপির ৩.৫২% আসে মৎস্য খাত থেকে। গত অর্থবছরে চূড়ান্ত উৎপাদন ৪৪.৮৪ মেট্রিক টন।

বর্তামানে মাথাপিছু দৈনিক মাছ গ্রহণ ৬২.৫৮ গ্রাম যা আগের বছর ছিল ৬০ গ্রাম। খাদ্য হিসেবে মাছ গ্রহণের পরিমাণ বাড়ার সাথে সাথে বাড়ছে মাছের গুণগত বৈশিষ্ট্য, এর উৎপাদন প্রক্রিয়া ও বিপণন নিয়ে প্রশ্ন। বাজার থেকে কিনে আনা মাছটি আপনার জন্য কতটুকু উপকারী? নাকি অজান্তেই মাছের মাধ্যমে আপনার শরীরে প্রবেশ করছে ক্ষতিকর কোন অণুজীব?

বাংলাদেশে সাধারণত তিন উপায়ে মাছ চাষ করা হয়ে থাকে: ১. এক্সটেনসিভ; ২. সেমি-ইনটেনসিভ এবং ৩. ইনটেনসিভ

এক্সটেনসিভ পদ্ধতিতে মাছ চাষ করতে বাইরে থেকে কোনপ্রকার খাবার সরবরাহ করা হয় না। পুকুরে উৎপাদিত প্লাঙ্কটন, বেন্থস, শামুক, শেওলা ইত্যাদি খেয়ে মাছ বেঁচে থাকে। সেমি-ইনটেনসিভে সামান্য খাদ্য বাইরে থেকে সরবরাহ করা হয়ে থাকে তবে ইনটেনসিভ কালচারে পুকুরের পানির গুণাগুণ নিয়ন্ত্রণ করা হয় এছাড়া পরিমিত পরিমাণ সম্পূরক খাদ্য সরবরাহ করা হয়। এ পদ্ধতিতে মাছের উৎপাদন বেশি হলেও খাদ্য হিসেবে মাছকে যেসব উপাদান সরবরাহ করা হয় তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। মাছের খাদ্যে কি কোন ক্ষতিকর উপাদান থাকে? যদি থেকে থাকে তবে সেসব উপাদান কি মাছের মাধ্যমে আমাদের শরীরে প্রবেশ করতে পারে?

সবুজ বাংলাদেশ ২৪ ডট কমের এমন কিছু প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের একোয়াকালচার ডিপার্টমেন্টের সহকারী প্রফেসর মোঃ ফজলে রোহানী।

মাছের খাদ্যে কোন ক্ষতিকর উপাদান থাকে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, মাছের খাদ্য উৎপাদনের সময় যেনো কোন ধরণের ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহার না করা হয় সেজন্য নির্দিষ্ট গাইডলাইন রয়েছে, ফিড মেনুফেকচারিং কোম্পানিগুলো সেসব নির্দেশনা মেনেই মাছের খাদ্য উৎপাদন করে থাকে। তবে অধিক লাভের আশায় যেন কোন কোম্পানি ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহার না করে সেজন্য কর্তৃপক্ষের উপযুক্ত নজরদারি রাখা উচিত।

মাছের খাদ্যে অনেক সময় মাইক্রো উপাদান ব্যবহার করা হয় সেসব কি মাছের মাধ্যমে মানুষের দেহে প্রবেশ করে রোগ সৃষ্টি করতে পারে? এমন প্রশ্নের জবাবে ফজলে রোহানী বলেন, যেসব মাইক্রো উপাদান ব্যবহার করা হয় সেসব মাইক্রো নিউট্রিয়েন্ট হিসেবে কাজ করে তবে এর একটি নির্দিষ্ট লিমিট আছে। লিমিট পেরিয়ে গেলে মাছের দেহে বায়োএকুমুলেশন হতে পারে যা পরবর্তীকালে মানুষের দেহেও প্রবেশ করতে পারে। তবে মানুষের দেহেও বিভিন্ন মেটালস এর একটি সহনীয় মাত্রা রয়েছে সেটি অতিক্রম না করলে খুব বেশি ঝুঁকি নেই।

অনেক সময় কৃষিজমিতে ব্যবহার করা রাসায়নিক, পেস্টিসাইড বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে নদীতে এসে পড়ে এটি মাছের জন্য কতটা ক্ষতিকর জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা তো অবশ্যই মাছের জন্য ক্ষতিকর। এ ধরণের দূষণের ফলে মাছের আচরণে নানা অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা যায়, মাছ স্ট্রেসে পড়ে, গ্রোথ কমে যায় এমনকি বেশি পানি দূষণের ফলে মাছ মারাও যেতে পারে।

বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রি থেকে নিষ্কাশিত বর্জ্যের দ্বারাও একই ধরণের সমস্যা পরিলক্ষিত হয়। এসব উৎস থেকে ধরা মাছ খেলে কি মানুষের দেহে কোন রোগ সৃষ্টি হতে পারে কি না জানতে চাইলে ফজলে রোহানী বলেন, এখন পর্যন্ত এধরণের কোন ঘটনা ঘটে নি। তবে যেসব উৎস থেকে মাছ ধরে বাজারজাত করা হয় সেসব স্থান দূষণমুক্ত হওয়া উচিত।

বাজার থেকে আমরা যে মাছটি কিনে আনি সেটি আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য কতটা নিরাপদ? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মৎস্য চাষ ও বিপণন পদ্ধতি অনুযায়ী বাজার থেকে কিনে আনা মাছ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হওয়ার কথা না তবে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের কিছু কিছু এলাকার বাজার পর্যবেক্ষণে সেখানকার মাছে ক্রোমিয়ামের মাত্রাটা অন্যান্য স্থানের তুলনায় একটু বেশি দেখা গেছে। তবে মাত্রাটি অসহনীয় পর্যায়ে না। আমরা প্রাথমিকভাবে অনুমান করেছি সেসব এলাকার কলকারখানা বর্জ্য থেকে এই কন্টামিনেশন হতে পারে তবে এটার জন্য আরও গবেষণা দরকার।fish

পটকা মাছ খেয়ে অনেক সময় মৃত্যুর সংবাদ শোনা যায়, এর কারণ কি?

পটকা মাছে সাধারণত এক ধরণের টক্সিন থাকে যার নাম টেট্রোডোটক্সিন (Tetrodotoxin)। মাছটি সঠিকভাবে প্রসেস না করে খেলে এই টক্সিন মানবদেহে প্রবেশ করে যা মৃত্যুর কারণও হতে পারে। এছাড়া সঠিক তাপমাত্রায় বয়েল না করার কারণেও টক্সিন মাছের মাধ্যমে মানুষের দেহে প্রবেশ করতে পারে।

দেশে দিন দিন মাছের উৎপাদন বাড়ছে এমন অবস্থায় সুষ্ঠুভাবে মাছের বিপণন করা একটি চ্যালেঞ্জ বলে উল্লেখ করে ফজলে রোহানী বলেন, মাছের উৎপাদন বাড়লেও দেখা যাচ্ছে প্রান্তিক মাছ চাষিরা তেমন লাভবান হচ্ছেন না। দেখা যাচ্ছে যারা সরাসরি মাছ চাষে জড়িত না তারাই চাষিদের থেকে বেশি লাভ করছেন এছাড়া আমাদের দেশের মাছ চাষের জন্য মাছের খাদ্যের মূল্য তুলনামূলক বেশি তাই চাষিরা লাভবান হতে পারেন না এদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তপক্ষের নজর দেওয়া উচিত। এছাড়া করোনা মহামারির পর থেকে দেশের চিৎড়ি শিল্প ক্রমশ আন্তর্জাতিক বাজার হারাচ্ছে এক্ষেত্রে এখনি উপযুক্ত পদক্ষেপ না নিলে সম্ভাবনাময় এ খাত ধ্বংস হয়ে যাবে।

রোহান ইসলাম, নিজস্ব প্রতিবেদক

  •  
  •  
  •  
  •