মশা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ

মতামত

ড. মো. সহিদুজ্জামান

গ্রীষ্মের শুরুতেই মশার উপদ্রব শুরু হয়েছে। সন্ধ্যা নামতে না নামতেই শুরু হয় মশার উৎপাত। দিনের বেলায়ও মশার আক্রমণ থেকে রেহাই মিলছে না। রাতে কয়েল, মশা মারার স্প্রে, মশারি কোনো কিছু দিয়েই মশার কামড় থেকে রেহাই মিলছে না। দুপুরে বিশ্রামের জন্য বিছানায় গেলেও রাতের মতো মশারি টানাতে হয়। মশার কামড়ে চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়া, ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে মশা নিধনে তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। ঋতু পরিবর্তনের কারণে হঠাৎ করেই বেড়েছে মশার উপদ্রব। এ ছাড়া নিয়মিত ওষুধ না ছিটানো, ঝোপঝাড় পরিষ্কার না করা, ড্রেনে ময়লা-আবর্জনা জমে থাকাসহ মশার উপযুক্ত আবাসস্থল বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে মশার উপদ্রব বাড়ছে।

মশা ও মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া নিয়ে প্রতিবছরই একটি নির্দিষ্ট সময়ে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। এ সময় চলে নানা কর্মসূচি, হাতে নেওয়া হয় বড় বড় কর্মপরিকল্পনা, বৃদ্ধি হয় বাজেট। এভাবে মশা নিধনে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও কার্যত কতটুকু ফলাফল মিলছে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাতীয় সমস্যা সমাধানে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করতে দেখা গেলে আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রেই তা দেখা যায় না। বিশেষ করে মশা নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো এ ক্ষেত্রে দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে তারা একে অপরের ওপর দোষ চাপিয়ে সময় পার করে দেয়।

১৯৪৮ সালে মহামারি ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য ঢাকার লালবাগে একটি অফিস নির্মাণ করা হয়, যা মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রাথমিকভাবে সফলতা অর্জন করলেও পরবর্তী সময়ে তা আর উঠে দাঁড়াতে পারেনি। সর্বশেষ সেখানকার জনবল ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ায় মশা নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রীয় অফিসটি অকার্যকর হয়ে পড়ে বলে পত্রিকামাধ্যমে জানা যায়।

মশা নিয়ন্ত্রণ ও নিধন একটি টেকনিক্যাল ও বিজ্ঞানসম্মত বিষয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মশা ও অন্য ভেক্টর বা বাহক নিয়ন্ত্রণের জন্য একক ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা অনুসন্ধান, নজরদারি, নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষা, গবেষণা এবং প্রযুক্তির সমন্বয়ের মাধ্যমে মশা ও মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। আমাদেরও সে রকম প্রতিষ্ঠান তৈরি করা দরকার, যারা স্বাধীনভাবে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে জবাবদিহির সঙ্গে কাজ করে মশা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। টেকসই প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, ব্যবহৃত মশার ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা রেখে ক্ষমতায়িত করতে পারলে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান থেকে হয়তো ভালো ফল মিলবে। দেশের প্রতিটি জেলায় ও উপজেলায় থাকবে এর শাখা-প্রশাখা, যারা সারা বছর ধরে এক ছাতার নিচে কাজ করবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি যাদের দায়িত্বের মধ্যে আছে তারা যদি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করে, তাহলে কেন্দ্রীয়ভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই সহজ হবে।

শুধু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও মশার ওষুধ ছিটিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করা। মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির ব্যবহার। মশা নিয়ন্ত্রণে প্রথম কার্যকর পদক্ষেপ হলো, মশার নজরদারি করা বা প্রাদুর্ভাব স্টাডি করা অর্থাৎ কোন এলাকায় কোন মশা আছে এবং কী পরিমাণে আছে, তা খুঁজে বের করা। দ্বিতীয়ত, ওই সব এলাকায় মশার প্রাদুর্ভাবের সম্ভাব্য কারণ ও উৎস খুঁজে বের করা। তৃতীয়ত, মশা ও প্রজননের ধরন অনুযায়ী মশা নিধন ও নিয়ন্ত্রণে টেকসই পদ্ধতি প্রয়োগ করা। পাশাপাশি ব্যবহৃত ওষুধগুলো কতটুকু কার্যকর এবং এগুলোর বিরুদ্ধে মশা প্রতিরোধ তৈরি করেছে কি না তা-ও পরীক্ষা করে দেখা।

প্রাপ্তবয়স্ক মশা যেহেতু কামড় দেয়, তাই এর গুরুত্ব বেশি বলে মনে হলেও মশা নিয়ন্ত্রণে প্রাপ্তবয়স্ক মশার চেয়ে যে লার্ভা (বাচ্চা) নিধন বেশি জরুরি, তা মানুষ অনুধাবন করতে পারে না। লার্ভা হয়তো কামড়াতে পারে না বলেই এমন ধারণা হতে পারে। কিন্তু মশা মারার চেয়ে মশার প্রজনন রোধ জরুরি। মশা তার জীবনচক্রের প্রথম ১০ দিন পানিতে কাটায়, তারপর যখন প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠে, তখন তাদের মারা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে মাথা মোটা ও গায়ে লোমবিশিষ্ট পাখাবিহীন ঘাসফড়িংয়ের শরীরের মতো দেখতে ছোট ছোট এই বাচ্চাগুলোকে সহজেই মারা যায়। তাই পানিতে থাকা অবস্থায় মশার প্রজনন স্থান নির্ণয় ও নির্মূল করা মশা নিয়ন্ত্রণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর অংশ। জমে থাকা পানি পরীক্ষা করে সেখানকার মশার লার্ভা নষ্ট করতে হবে এবং এসব জায়গায় যাতে পানি জমে থাকতে না পারে বা মশার প্রজনন না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে দেশে ছাদবাগানের প্রবণতা বেড়ে গেছে। এসব বাগানের টবে বা পাত্রে জমে থাকা পানিও মশার বংশবৃদ্ধিতে উপযুক্ত পরিবেশ হিসেবে কাজ করে।

মশার উপদ্রব কমানোর জন্য নিয়মিত ঝোপঝাড় পরিষ্কার করা, ড্রেনের ময়লা পরিষ্কার করা, ছাদবাগানের টবে পানি যেন না জমে থাকে সেদিকে খেয়াল রাখা এবং এক দিন পর পর পানি পরিবর্তন করা। মশা নিধনের জন্য অন্তত সাত দিন পর পর ফগিং বা কেমিক্যাল স্প্রে করা প্রয়োজন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অরগানোফসফরাস ও পাইরিথ্রইডস গ্রুপের বালাইনাশকের বিরুদ্ধে মশার প্রতিরোধ সক্ষমতা গড়ে ওঠার রিপোর্ট রয়েছে। আমাদের দেশে ব্যবহৃত বালাইনাশকের প্রতি মশার প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে ওঠাও অস্বাভাবিক কিছু নয়। এ ছাড়া কৃষিকাজে পোকা-মাকড় দমনে অপরিমিত কীটনাশক বা বালাইনাশক ব্যবহারে মশার প্রতিরোধক্ষমতা বেড়ে যেতে পারে। তাই মশা নিধনে অবশ্যই নতুন নতুন বালাইনাশক ব্যবহার করতে হবে। পাশাপাশি এসব বালাইনাশকের ওপর মশার প্রতিরোধক্ষমতা প্রতিহত করার জন্য সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। যেমন—অরাসায়নিক বালাইনাশকের ব্যবহার, জৈব নিয়ন্ত্রক, পরিবেশের ব্যবস্থাপনা ও জনসচেতনতা। আমরা অনেকেই মনে করি, মশা নিয়ন্ত্রণ মানে মূলত স্প্রে করা; কিন্তু মনে রাখতে হবে স্প্রে করা হলো সমন্বিত মশা নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ছোট একটি অংশ মাত্র। এ জন্য মশা নিয়ন্ত্রণে মোট বাজেটের বেশির ভাগ মশার প্রজনন রোধে ব্যবহার করতে হবে।

বৈশ্বিক উষ্ণায়নে কীট-পতঙ্গের প্রজনন বেড়ে যেতে পারে। মশার ঋতুতে দেশজুড়ে মশার বিস্তারের একটি মানচিত্র তৈরি করতে হবে। কোন এলাকায় কোন জাতের মশা পাওয়া যায় তার একটি পরিষ্কার চিত্র থাকা প্রয়োজন। প্রতিবছর একবার হলেও মশায় ব্যবহৃত বালাইনাশকের প্রতিরোধ সক্ষমতা তৈরি হয়েছে কি না তা মনিটরিং করা প্রয়োজন।

মশার ধরন, প্রজাতি, সংখ্যা, জীবনচক্র, বংশবিস্তার, বালাইনাশক এবং মশাবাহিত রোগ সংক্রমণ নিয়ে গবেষণা করেন কীটতত্ত্ববিদরা। কিন্তু দেশে কীটতত্ত্ববিদের সংকট রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা সূত্রে জানা গেছে, দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনে কোনো কীটতত্ত্ববিদ নেই। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানেও (আইইডিসিআর) একই অবস্থা। স্থানীয় পর্যায়ে মাত্র ২৩-২৪ জেলায় কীটতত্ত্ববিদ আছেন। তবে তাঁদের বড় অংশ টেকনিশিয়ান থেকে পদোন্নতি পেয়ে কীটতত্ত্ববিদ হয়েছেন। তাই দেশের বিভিন্ন শিক্ষা ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের কীটতত্ত্ববিদের সহযোগিতা নেওয়া বা তাঁদের বিশেষজ্ঞ মতামত এবং সেবা নিয়ে কেন্দ্রীয় মশা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা প্রয়োজন। এসব প্রতিষ্ঠানে থাকবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও দক্ষ টেকনিশিয়ান, যাঁরা মশা নিধন ও নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ে কাজ করবেন। মশা ও মশাবাহিত রোগ যেমন—ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া আমাদের জাতীয় সমস্যা। তাই এই সমস্যার সমাধানে সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে আরো জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে। গড়ে তুলতে হবে কার্যকর একক ও স্বাধীন মশা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠান। এর জন্য আমরা উন্নত দেশগুলোকে অনুসরণ করতে পারি।

লেখক : গবেষক ও অধ্যাপক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

সুত্র: কালের কন্ঠ

  •  
  •  
  •  
  •