করোনায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা: ড. সহিদুজ্জামান

bau

মহামারি করোনাভাইরাসের আবির্ভাবের পর থেকে সবকিছুই যেন থমকে গেছে। সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ মুখোমুখি হয়েছে নতুন এক বাস্তবতার। তবে করোনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত  হয়েছে দেশের শিক্ষার্থীরা, এমনটাই মনে করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অনুষদের প্যারাসাইটলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সহিদুজ্জামান

তিনি বলেন, করোনার কারণে গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে স্কুল বন্ধ হলেও শিক্ষার্থীরা যাতে বাড়িতে বসে ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নিতে পারে সে লক্ষ্যে সরকার সংসদ বাংলাদেশ টিভিতে দূরশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করেছে। তাছাড়া শহরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন ক্লাস চালু করেছে। তবে উপযুক্ত প্রযুক্তিগত সুবিধা হাতে রয়েছে এমন স্বচ্ছল পরিবারের শিশুরাই অনলাইনে শিক্ষার সুযোগ গ্রহণ করতে পারছে। এক্ষেত্রে শিক্ষার বৈষম্য বাড়বে। সারাদেশে তো নেটওয়ার্ক অতটা সবল না৷ আর অন্তত একটা স্মার্টফোন তো সবার হাতে নেই৷ অনেক গরিব ছাত্র আছে তাদের হাতে এটা নেই৷ কিন্তু এই মুহুর্তে তো আমাদের সামনে বিকল্প কিছু নেই৷

“দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার বেড়ে যেতে পারে” এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, অনেক ছেলে-মেয়ে হয়ত স্কুলে না এসে অন্য কাজ-কর্মে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে৷ এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার বেড়ে যেতে পারে। এই ঝরে পড়া রোধ করতে সরকারকে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে।

ড. মো. সহিদুজ্জামান বলেন, শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক দিকের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে এই করোনায়। শহরে ফ্ল্যাটবাড়িতে বন্দি কোমলমতি শিশুরা স্কুলের আনুষ্ঠানিক পাঠগ্রহণ ও বন্ধু-সহপাঠীদের সংস্পর্শ থেকেও বঞ্চিত। অভিভাবকরা জানাচ্ছেন, রাত জেগে গেমস খেলা, অনলাইন ক্লাসে অনাগ্রহ, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, ঘুম কমে যাওয়াসহ নানা সমস্যায় ভুগছে তারা।

সম্প্রতি পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) এবং ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) যৌথ গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রাথমিকের ১৯ শতাংশ ও মাধ্যমিকের ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী করোনার এই সময়ে নিয়মিত পড়াশোনার একদম বাইরে রয়েছে। এ গবেষণায় এমন প্রেক্ষাপটে মা-বাবাদের চিন্তাভাবনার চারটি মৌলিক দিক উঠে এসেছে। এগুলো হলো- শিক্ষার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমে যাওয়া, শিক্ষার খরচ তুলনামূলকভাবে বেড়ে যাওয়া, স্কুল খোলার সময় নিয়ে চিন্তা এবং পড়াশোনার পাশাপাশি কর্মসংস্থানজনিত উদ্বেগ।

এ বিষয়ে ড. মো. সহিদুজ্জামান বলেন, গবেষণায় যেসব তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে তা শিক্ষার জন্য অশনিসংকেত। করোনায় শিল্প, অর্থনীতিসহ অন্যান্য খাতের ক্ষতি চোখে দেখা যায়, কিন্তু শিক্ষার ক্ষতি দৃশ্যমান হতে থাকে ধীরে ধীরে। যা জাতির জন্য উদ্বেগজনক।

উচ্চশিক্ষা স্তরেও করোনার থাবায় বিপর্যস্ত শিক্ষার্থীরা। সেশনজট জেঁকে বসেছে। শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষাজীবন নিয়ে চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায়। বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে, আছে চাকরির চিন্তা। সবমিলিয়ে শিক্ষার্থীরা এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন অধ্যাপক ড. মো. সহিদুজ্জামান।

বাড়ছে বাল্যবিবাহ

করোনার কারণে স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাল্যবিবাহের হার বাড়তে পারে বলে মনে করেন ড. মো. সহিদুজ্জামান। তিনি বলেন, করোনায় গরিব মানুষের ছেলেমেয়েদের স্কুলের ফিরানো অনেকটাই অসম্ভব হবে। বিশেষ করে নবম ও দশম শ্রেণীর মেয়েদের ক্ষেত্রে অন্য ধরণের ঘটনা ঘটে গেছে। করোনার প্রথম দফায় এ বছরের মার্চে যখন শহর থেকে মানুষ গ্রামে ফিরেছে। তখনই শহরগামী তরুণরা বিয়ে করেছে। বেশিরভাগই অল্প বয়সী নবম-দশম শ্রেণীর মেয়ে।

শিশুশ্রমও বাড়তে পারে

করোনার কারণে শিশুশ্রমও বাড়তে পারে বলে মনে করেন তিনি। এ বিষয়ে ড. মো. সহিদুজ্জামান বলেন, স্কুল গুলি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীরাও হতাশ হয়ে পড়েছে। ছেলেরা অনেকেই দিনমজুরসহ বিভিন্ন কাজে জড়িয়ে পড়েছে। এরকম সংখ্যা অনেক।

শিক্ষার্থীরা শারীরীক ও মানসিকভাবেও সংকটে পড়েছেন

ড. মো. সহিদুজ্জামান বলেন, স্কুল বন্ধ থাকার কারণে শিক্ষার্থীরা শারীরীক ও মানসিকভাবেও সংকটে পড়েছেন শিক্ষার্থীদের শিক্ষণ প্রক্রিয়া ব্যহত হবার পাশপাশি তাদের মধ্যে বিভিন্ন রকমের আসক্তি দেখা দিয়েছে, যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যে আঘাত হেনেছে। দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে একদিকে যেমন তাদের দৈনন্দিন রুটিনে পরিবর্তন এনেছে, অন্যদিকে বেড়েছে ভবিষ্যত নিয়ে আশঙ্কা ও দুঃশ্চিন্তা।

এসব সমস্যা সমাধানে সরকারকে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সঠিক সমন্বয় ও কর্ম পরিকল্পনাই পারে শিক্ষা খাতকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে, এমনটাই মনে করেন ড. মো. সহিদুজ্জামান।

এ পরিস্থিতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা উচিত কি না? এ বিষয়ে তিনি বলেন, একটি জাতির উন্নয়নে শিক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, আবার শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যের বিষয়টিও বিবেচনার বিষয়। এক্ষেত্রে যদি স্বাস্থ্যবিধি মেনে বিশ্ববিদ্যালয় খোলা সম্ভব হয় তাহলে তা করা উচিত।

 

তবে এজন্য শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যের বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বের সাথে দেখতে হবে।

 

স্কুল কলেজের ক্ষেত্রে একটি এলাকার সকল স্কুল একসাথে না খুলে কিছুদিন কয়েকটি স্কুল আবার পরের কিছুদিন অন্য স্কুল খোলা রেখে শিক্ষা কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া যায় কি না এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের ভাবা উচিত। দরকার হলে এক স্কুলে সব ব্যাচ একসাথে না এনে সময় ভাগ করে আলাদা আলাদা ব্যাচের ক্লাস পরীক্ষা নেওয়া যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রেও একই ধরণের পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে একসঙ্গে অনেক শিক্ষার্থী গাদাগাদি করে বাস করে তাই করোনা ঝুঁকি এখানে বেশি তাই সকল ব্যাচ একসাথে না এনে যেসব ব্যাচের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা ক্লাস রয়েছে তাদের এনে কার্যক্রম চালানো যায়, যাতে তারা দীর্ঘ সেশনজটে না পড়েন।

উল্লেখ্য করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। প্রাণঘাতী ভাইরাসটি নিয়ন্ত্রণে না আসায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটি কয়েক দফা বাড়িয়ে সর্বশেষ ২৯ মে পর্যন্ত করা হয়েছিল। কিন্তু দেশে চলমান লকডাউনের সময়সীমা বৃদ্ধি করায় আবারো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

  •  
  •  
  •  
  •  
ad0.3

Tags: , ,