মাঠে সবুজের সমারোহ

নিউজ ডেস্কঃ

দেশের দক্ষিণাঞ্চল মানেই যেন সারি সারি চিংড়ি ঘের। এই অঞ্চলের লবণাক্ত এলাকায় ফসল উত্পাদনের বিষয়টি একসময় কল্পনাও করা যেত না। আর এখন সেই লবণাক্ত জমিতেই ফলছে তরমুজ, ভুট্টাসহ নানা ফসল ও সবজি। এ যেন অন্য রকম এক সবুজের সমারোহ। এভাবে অনাবাদি জমিকে আনা হচ্ছে চাষাবাদের আওতায়। ভাগ্য বদলাচ্ছে কৃষকের। কিন্তু কীভাবে সম্ভব হচ্ছে লবণাক্ত জমিতে ফসল উত্পাদন? আর কী পরিমাণ জমিই-বা আসছে চাষাবাদের আওতায়?

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, দেশে মোট ৮৪ লাখ হেক্টর অনাবাদি জমি রয়েছে। এর মধ্যে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলেই রয়েছে প্রায় ২৫ লাখ হেক্টর জমি। এ জমির প্রায় অর্ধেকই লবণাক্ত। মৃত্তিকা সম্পদ ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই)-এর সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনাসহ ১৮টি জেলার ৯৩টি উপজেলায় লবণাক্ত জমির পরিমাণ ১০ লাখ ৫৬ হাজার হেক্টর, যা গত এক দশকের তুলনায় ২৩ হাজার হেক্টর বেড়েছে। আর ১৯৭৩ সালে লবণাক্ত জমির পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ৩৩ হাজার হেক্টর। এই হিসেবে ক্রমাগত লবণাক্ত জমির পরিমাণ বাড়ছে। কিন্তু এই জমিকেই এখন আনা হচ্ছে চাষাবাদের আওতায়। যদি ১০ লাখ ৫৬ হাজার হেক্টরের বিশাল এই জমিকে চাষাবাদের আওতায় আনা যায়, তাহলে দেশের কৃষিতে রীতিমতো বিপ্লব ঘটবে। যেসব এলাকার জমিতে আগে একটি ফসল হতো, সেখানে হবে দুটি ফসল। এতে অতিরিক্ত খাদ্যশস্য উত্পাদন হবে ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, প্রতি বছর জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সাগরের লোনাপানি উপকূলীয় এলাকায় ঢুকে জমি লবণাক্ত করে তুলছে। জোয়ারের কারণেও উপকূলীয় বিস্তীর্ণ এলাকা লবণাক্ত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের পানি তীর থেকে উপকূলের ১৮০ কিলোমিটার পর্যন্ত ঢুকে পড়েছে। ফলে এ অঞ্চলের উর্বর জমি ধীরে ধীরে লবণাক্ত হয়ে চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। গত দশকে শুকনো মৌসুমে এসব এলাকায় তিল ও মুগ ডালের চাষাবাদ হতো। কিন্তু অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে তিল ও ডাল ঘরে তোলার আগেই মাঠ নষ্ট হয়ে যেতে থাকে। ফলে শুকনো মৌসুমে জমি পতিত অবস্থায় থাকত।

দক্ষিণাঞ্চলে কৃষির উন্নয়নে মহাপরিকল্পনা

দক্ষিণাঞ্চলে কৃষির উন্নয়নে সরকার ১০ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনা নিয়েছে। ২০১৪ সালে নেওয়া এ পরিকল্পনায় অগ্রাধিকারভুক্ত খাত হিসেবে ফসল, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ, পুষ্টি, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, কৃষি বাণিজ্য, কৃষি ঋণ, কৃষি খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত জনশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধি ইত্যাদি বিষয়কে চিহ্নিত করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়নে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৫৭ হাজার ৮২৬ কোটি টাকা। সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, পিরোজপুর, বরিশাল, ঝালকাঠি, ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার জেলায় মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে।

পালটাতে শুরু করেছে চিত্র :এই অবস্থা থেকে উত্তরণে গত ২০১১-১২ সালে এসআরডিআইয়ের লবণাক্ততা ব্যবস্থাপনা ও গবেষণাকেন্দ্র গবেষণার মাধ্যমে বেশ কয়েকটি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে, যা গত কয়েক বছরে কৃষকের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে খামার পুকুর, কলস সেচ, দ্বিস্তরবিশিষ্ট মালচ, পলিব্যাগের চারা রোপণের মাধ্যমে তরমুজের চাষ, বপন বা রোপণের সময় পরিবর্তনের মাধ্যমে গম চাষ ইত্যাদি। ইতিমধ্যে গবেষণাকেন্দ্রের মাধ্যমে ঢ্যাঁড়শ, মিষ্টি কুমড়া, চিচিঙ্গা, ঝিঙা, শসা, বাঙ্গি, তরমুজের লবণ সহনশীল বিভিন্ন প্রকার জাত বাছাই করা হয়েছে। এসব প্রযুক্তি, বিশেষ করে খামার পুকুর প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি ছোট পুকুরে জমিয়ে রেখে শুকনো মৌসুমে তরমুজের মতো উচ্চমূল্যের ফসল চাষাবাদ করা সম্ভব হচ্ছে। সম্ভব হচ্ছে ডিবলিং ও ট্রান্সপ্লান্ট পদ্ধতির মাধ্যমে ভুট্টা চাষ। এছাড়া লবণসহিষ্ণু জাতের ধান আবাদের পরিমাণ বাড়ছে।

খুলনা অফিস থেকে স্টাফ রিপোর্টার এনামুল হক জানান, ধান আর সবজি চাষ পালটে দিয়েছে খুলনার কৃষকের জীবনচিত্র। যে জলাবদ্ধতা আর লবণাক্ততা একসময় মানুষের দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, খুলনার সেই বিলপাড়ের হাজারো মানুষের মুখে এখন সোনালি হাসির ঝিলিক। বিলগুলোতে এখন একদিকে যেমন মাছ ও ধান চাষ হচ্ছে, তেমনি হচ্ছে হরেক রকম সবজির চাষ। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আজ থেকে মাত্র কয়েক বছর আগেও খুলনা জেলার ডুমুরিয়া, ফুলতলা, রূপসা, দীঘলিয়া, তেরখাদা, দাকোপ, বটিয়াঘাটা, পাইকগাছা ও কয়রা উপজেলার অধিকাংশ মানুষ ঘেরে মাছ চাষের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। এসব মাছের ঘেরের পাড়ে কোনো ফসল চাষ করা হতো না। পতিত অবস্থায় পড়ে থাকত ঘেরের পাড়ের জমি। এখন মাছের ঘেরের পাড়ে চাষ হচ্ছে সবজি।

রূপসা উপজেলা কৃষি অফিসের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুর রহমান বলেন, অন্যান্য ফসলের তুলনায় লাভবান হওয়ায় কৃষকেরা ঘেরের পাড়ে সবজি চাষে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। এখন ঘেরে মাছ চাষের পাশাপাশি দিনে দিনে ধান ও সবজি চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি মনিরুল ইসলাম মিনি জানান, সাতক্ষীরা চিংড়ি চাষ প্রধান জেলা হলেও পিছিয়ে নেই শাকসবজি উত্পাদনে। বিভিন্ন উপজেলায় ঘেরের আইলেও প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষকেরা সবজি আবাদ করছেন। চলতি ২০২০-২০২১ মৌসুমে শুধু ঘেরের আইলেই সবজি আবাদ হয়েছে ৭৫৬ হেক্টর জমিতে।

এসআরডিআইয়ের খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অমরেন্দ্রনাথ বিশ্বাস গতকাল  বলেন, এতদিন লবণাক্ততার কারণে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শুকনো মৌসুমে কৃষকেরা ফসল আবাদ করতে পারতেন না। কিন্তু এখন বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে সেসব লবণাক্ত জমিতেই ফসল চাষ সম্ভব হচ্ছে। তিনি বলেন, অনাবাদি এসব জমি এখন আবাদের আওতায় আসছে।

সূত্র জানিয়েছে, বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে ইতিমধ্যে ৩-৪ লাখ হেক্টর অনাবাদি লবণাক্ত জমির ফসল চাষাবাদের আওতায় এসেছে। এ প্রসঙ্গে মৃত্তিকা সম্পদ ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই)-এর মহাপরিচালক বিধান কুমার ভান্ডার ইত্তেফাককে বলেন, মাটির গুণমান উন্নয়নের কারণেই লবণাক্ত জমিতে ফসল হচ্ছে। একসময় আবাদ হতো না এমন অনেক জমি এখন চাষাবাদের আওতায় চলে এসেছে। তিনি বলেন, মাটি, পানি ও উদ্ভিদের নমুনা বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সুষম সার ব্যবহার করে কীভাবে ফসল উত্পাদন করা যায়, সেই কাজই করছে এসআরডিআই। আমরা গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে সুষম সার ব্যবহারের সুপারিশ করছি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গবেষণার মাধ্যমে মাটির গুণমান বাড়ানো সম্ভব হলে ভবিষ্যতে কোনো জমিই চাষাবাদের বাইরে থাকবে না।

  •  
  •  
  •  
  •