দেশে কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প অঞ্চল গড়ে তোলা প্রয়োজন

Shahiduzzaman

ড. মো. সহিদুজ্জামান

বাংলাদেশ কৃষির উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল একটি দেশ যা দেশটির অর্থনীতিক সমৃদ্ধি ও জীবনমানের উন্নয়নে বিস্তর ভূমিকা রাখছে। অর্থ্যাৎ বলা যায়, এই কৃষি বাংলাদেশের মানুষের জীবিকা, কর্মসংস্থান এবং জিডিপিতে অবদান রাখার জন্য অত্যাবশ্যক। দেশের জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান সরকারী হিসেবে ১৩.৬ শতাংশ হলেও মোট শ্রমশক্তির ৪০.৬২ শতাংশ কর্মসংস্থানের যোগান আসে কৃষিখাত থেকে।

বাংলাদেশে কৃষিখাতের ক্রমবর্ধমান অগ্রগতি ও কৃষিজমির সর্বোচ্চ ব্যবহার সত্ত্বেও মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে এ খাতের অবদান আশানুরূপ নয়, উপরন্তু ধারাবাহিকভাবে কমছে। অথচ চীন মাত্র ১৩ শতাংশ আবাদি জমি ব্যবহার করেও জিডিপিতে তাদের কৃষির অবদান সর্বোচ্চ। যেসব কারণ এর পেছনে রয়েছে তার মধ্যে উৎপাদিত পণ্যে মূল্য সংযোগ বা খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের অপর্যাপ্ততাকে অন্যতম হিসেবে গণ্য করা হয়। বাংলাদেশে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের মাত্র ১ শতাংশেরও কম প্রক্রিয়াজাত করা হয়। অন্যদিকে ভারতে এর পরিমাণ প্রায় ২ শতাংশ, ভিয়েতনামে ৫, চীনে ৩৮, ফিলিপিনে ৩১, আমেরিকায় ৭০, থাইল্যান্ডে ৮১ ও মালয়েশিয়ায় ৮৪ শতাংশ।

দেশের উৎপাদিন কৃষিপণ্য বিশেষ করে মৌসুমভিত্তিক ফলমূল ও শাকসবজি প্রচুর পরিমাণে উৎপাদন হলেও স্বল্প সময়ে প্রয়োজনের তুলনায় সরবরাহ বেশি হওয়ায় কৃষকরা স্বল্প মূল্যে এসব পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হয়, সেই সাথে উৎপাদনের একটি বিরাট অংশ পচে নষ্ট হয়। বছরের কোন কোন সময় মাত্রাতিরিক্ত উৎপাদন, অনিয়ন্ত্রিত বাজার, মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেট এবং উৎপাদিত ফসল সংরক্ষণ ও সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করার সুযোগ না থাকায় কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বেশির ভাগ সময় তাদের উৎপাদন খরচটুকুও পায় না। কখনো কখনো তাদের রাস্তায় আলু, টমেটো, মুলা ইত্যাদি ঢেলে দিয়ে অসহায়ত্ব বা দেউলিয়াত্ব প্রকাশ করতে দেখা যায়।

ফসল কাটার পর বা মাঠ থেকে ফসল সংগ্রহ করার পরবর্তী ব্যবস্থাপনাটাই অনেক গুরুত্বপূর্ণ, এখানেই বেশি ক্ষতিসাধিত হয়, যাকে ‘পোস্ট হারভেস্ট লস’ বলা হয়। উৎপাদিত ফসলে বা শস্যে মূল্য সংযোজন করতে পোস্ট হারভেস্ট ম্যানেজমেন্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, এই গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটিতে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে আছি।

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে উদ্ভাবিত স্বল্প খরচের টেকসই প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ফলমূল ও শাকসবজি সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করে বিপুল পরিমাণ পণ্যে পচন রোধ করা সম্ভব। ঋতুভেদে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের সঠিক ব্যবহার করা গেলে এ শিল্পের রফতানি বাড়ানো সম্ভব। এতে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা সম্ভব তেমনি এ শিল্পের মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে বেকারত্বের হার অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
ইউরোপ ও আমেরিকার ইন্ডিয়ান মার্কেট, চায়নিজ মার্কেট বা এশিয়ান মার্কেটগুলোতে গেলে বোঝা যায় কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প কোথায় চলে গেছে বা কত দূর এগিয়ে গেছে। এসব প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের বেশির ভাগই আসে এশিয়া থেকে। টমেটো, আম, আনারস, কাঁঠাল, লিচু, কুমড়া, কলা, আলু, গাজর, আদা, রসুন, পেঁয়াজ, ফুলকপি, বাঁধাকপি ইত্যাদি ও দুগ্ধজাত পণ্যের কতই না বাহার। এ ছাড়া বিভিন্ন সুপারমার্কেটে বাহারি রকমের খাদ্যপণ্য পাওয়া যায়, যেগুলোর কাঁচামাল আমাদের কৃষির প্রধান অংশ। কৃষিপ্রধান দেশ হয়েও অতি সম্ভাবনাময় এই খাতে আমরা বৈদেশিক অর্থ উপার্জনে আমরা এখনও পিছিয়ে আছি, যা নিতান্তই দুর্ভাগ্যজনক। দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা না বোঝার মতোই। সরকার যদিও বিভিন্নভাবে উৎসাহিত করছেন। তবে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ও প্রযুক্তি না থাকায় এই শিল্প বেড়ে উঠছে না।

অ্যাগ্রো প্রসেসিং খাতের বিরাজমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো দূর করা এবং বিদ্যমান সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে কারিগরি দক্ষতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পণ্যের গুণগত মান ও রপ্তানি বৃদ্ধির লক্ষ্যে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন জরুরি হয়ে পড়েছে। নতুন পলিসি গ্রহণ করে এই শিল্পের মাধ্যমে উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা সম্ভব। সরকার এ লক্ষ্যে কৃষি খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প উন্নয়ন নীতিমালা ২০২১ প্রণয়ন করলেও তেমন কোন অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।

পুঁজিবাদ ব্যবসায়ী, স্থানীয় ব্যবসায়ীদের এ খাতে আকর্ষণ করা যেতে পারে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে, প্রয়োজনে এই খাতে আগ্রহী কোনো দেশের সহযোগিতার মাধ্যমে গড়ে উঠতে পারে শিল্প-কারখানা। তরুণ উদ্যোক্তাদের এ খাতে অনুপ্রাণিত করা যেতে পারে।

বিপুল পরিমাণ এসব ফসলের জন্য হিমাগার নিতান্ত কম বা অপ্রতুল। আবার হিমাগারে সংরক্ষণ করতে যে অর্থ ব্যয় হয়, কৃষকরা বেশির ভাগ সময় তা পুষিয়ে নিতে পারে না। সরকারের ভূর্তুকির পাশপাপাশি সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগে নতুন নতুন হিমাগার তৈরি করতে হবে। কৃষকরা যাতে কয়েক মাস সংরক্ষণ করতে পারে, সে জন্য ছনের ঘর, মাটির হিমাগারসহ কৃষকবান্ধব, পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহৃত যন্ত্র, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহৃত কাঁচামাল এবং উন্নত প্রযুক্তির বিভিন্ন কলাকৌশলের প্রদর্শনীর মাধ্যমে এ খাতে উদ্যোক্তা বৃদ্ধি ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যেতে পারে। মানুষের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন ও নানাবিধ প্রক্রিয়াজাতকরণ খাদ্যের দিকে সাধারণ মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা যেতে পারে।

সেসব অঞ্চলে গ্যাস নেই সেখানে গ্যাসের অপেক্ষায় বসে থাকলে চলবে না। গ্যাসের বিকল্প চিন্তা করেই এসব অঞ্চলে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা অসম্ভব কিছু নয়। বিকল্প জ্বালানির জন্য সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে কাজ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে টার্গেট দিয়ে প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও প্রয়োগে চাপ দিতে হবে। মোট কথা এ খাতে সরকার ও সংশ্লিষ্টদের জোরালো দৃষ্টি দিতে হবে।

মৌসুমে উৎপাদিত ফসল যাতে নষ্ট না হয় এবং কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে জন্য দ্রুত হলেও আঞ্চলিক সাবস্টেশন করে উৎপাদিত কৃষিপণ্য প্রাথমিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করে তা কেন্দ্রীয় কারখানায় সরবরাহের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পাশাপাশি প্রতিবন্ধকতাগুলো দ্রুত কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করতে হবে।

দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কৃষি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ বিষয়ে কারিগরি ও উচ্চশিক্ষা প্রদান করা হয়ে থাকে এবং হয়ে থাকে গবেষণা। এই শিক্ষা ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে যৌথভাবে প্রস্তাব দেওয়া যেতে পারে। তারা আগ্রহী কম্পানিগুলোকে লাভজনক উপায়, টেকসই প্রযুক্তি ও ঝুঁকিমুক্ত পন্থা প্রস্তাবের মাধ্যমে এ খাতে এগিয়ে আসার উদ্যোগ নেবে। এর মাধ্যমে এসব বিষয়ভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন এগিয়ে যাবে, তেমনি তৈরি হবে দক্ষ গ্র্যাজুয়েট ও বিজ্ঞানী। অনেক তরুণ মেধাবী গড়তে পারবে তাদের ক্যারিয়ার এবং অনন্য অবদান রাখতে পারবে এ খাতে। এভাবেই উন্নত বিশ্ব চলে।

সম্ভাবনাময় কোনো খাতকে গড়তে কিছু প্রতিবন্ধকতা থাকতেই পারে, তবে তা কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজন সঠিক সিদ্ধান্ত ও উন্নত কর্মপরিকল্পনা। আমাদের প্রতিটি সেক্টরে অনেক বিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি রয়েছেন, যাঁরা দেশে-বিদেশে কাজ করছেন। কিন্তু দেশের কিছু সুবিধাভোগীর কারণে তাঁদের কাছ থেকে উপযুক্ত সেবা নেওয়া সম্ভব হয় না। সরকারের উচিত এই সেক্টরের বিকাশে অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ স্টেকহোল্ডারদের মেধা, বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো, যেমনটি করছে চীন, মালয়েশিয়া, ভারত এমনকি পাকিস্তান। এক্ষেত্রে একটি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, আমলা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত জাতীয় কমিটি বা টিম গঠন করা যেতে পারে, যেখানে থাকবে ফুড প্রকৌশলী, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, কৃষি অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা। তাঁরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এই খাতে বিপ্লব ঘটানো সম্ভব। এতে কৃষিজাত পণ্যের অপচয় যেমন রোধ হবে, তেমনি কৃষকরা ন্যায্য মূল্য পাবে, গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হবে এবং বেকারত্ব কমিয়ে দেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রা ত্বরান্বিত হবে।

কৃষি খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প কৃষিখাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কৃষি খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প বাংলাদেশের উৎপাদন খাতে প্রায় ৮ শতাংশ অবদান রাখে এবং দেশের অন্যান্য শিল্পের তুলনায় এ খাত উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনে সক্ষম। তাই বর্তমানে দেশের সংকটাপন্ন অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের দিকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরী। এছাড়া যেহেতু রপ্তানিভিত্তিক উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার যথেষ্ট অবকাশও রয়েছে কৃষিভিত্তিক এই শিল্পের মাধ্যমে, তাই দেশের সামগ্রিক টেকসই উন্নয়নে কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প বিকাশের কোন বিকল্প নেই।

লেখকঃ অধ্যাপক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ
szaman@bau.edu.bd

  •  
  •  
  •  
  •  
ad0.3