২৭ রমজান ই কি লাইলাতুল কদরের রাত?

হালিমা তুজ সাদিয়াঃ

আমরা ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করি, পবিত্র শবে কদর মহিমান্বিত একটি রজনী। শবে কদরের অন্য নাম লাইলাতুল কদর। মুসলমানদের কাছে শবে কদর অত্যন্ত মর্যাদাময় এবং বরকতপূর্ণ একটি রাত।যে রাতে আল্লাহ তা’আলা মানবজাতির হিদায়েতের সুষ্পষ্ট নিদর্শনস্বরুপ সর্বশ্রেষ্ঠ এবং পবিত্র আসমানী কিতাব ‘আল-কোরআন’ অবতীর্ণ করেছেন তার প্রিয় হাবীব হযরত মুহাম্মদ (সা) এর উপর।

শবে কদরের ফজিলত অপরিসীম। আল্লাহ কোরআনে ঘোষণা করেছেন,

“নিশ্চয়ই আমি তা (কোরআন) অবতীর্ণ করেছি কদরের রাতে। আর কদরের রাত সম্বন্ধে তুমি কি জানো? কদরের রাত হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। সে রাতে ফেরেশতারা ও রুহ অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক কাজে তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে। শান্তিই শান্তি, বিরাজ করে উষার আবির্ভাব পর্যন্ত। (সূরা আল-কদর, আয়াত ১-৫)”

“রমজান মাস! যে মাসে কোরআন নাজিল হয়েছে মানবের দিশারি ও হিদায়াতের সুস্পষ্ট নিদর্শনরূপে।’ (আল কোরআন, সুরা-২ আল বাকারা (মাদানি), রুকু: ২৩/৭, আয়াত: ১৮৫, মঞ্জিল: ১, পারা: ২ সাইয়াকুল, পৃষ্ঠা ২৯/৭)”

হাদিসে আছে, শবে কদরের রাতে ফেরেশতারা ও জিবরাঈল (আ) পৃথিবীতে অবতরণ করে উপাসনারত সব মানুষের জন্য রহমতের দোয়া করতে থাকেন (মাযহারি)।

লাইলাতুল কদর সম্পর্কে #নবিজী (সা) বলেছেন, যে ব্যক্তি এ রাত ইবাদতের মাধ্যমে অতিবাহিত করবে, আল্লাহ তাঁর পূর্বেকৃত সব গুনাহখাতা মাফ করে দেবেন। (বুখারি)

আমাদের অনেকের ই কিছু ভুল ধারণা আছে ” ২৭ রমজানই শবে কদরের রাত্রি” কিন্তু এ ধারণাটি সঠিক নয়। লাইলাতুল কদরের নির্দিষ্ট কোনো তারিখ নেই।

রাসুলুল্লাহ (সা.) কখনও বলেন নি যে, ২৭ রমজানের রাতই শবে কদরের রাত। তবে ২১ রমজান থেকে নিয়ে ২৯ রমজন পর্যন্ত বেজোড় যে কোন রাতই শবে কদর হতে পারে।

লাইলাতুল কদরের তারিখের ব্যাপারে নবী করীম (সা.) এরশাদ করেছেন, আমাকে লাইলাতুল কদর দেখানো হয়েছে, অতঃপর আমাকে তা ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে। অতএব তোমরা শেষ দশ রাতের বেজোড় রাতসমুহে তা খোঁজ করবে। (বুখারি, হাদিস নং :৭০৯)

রাসুল (সা.) আরও বলেন, ‘রমজানের শেষ দশদিনে তোমরা কদর তালাশ করো। (মুসলিম, হাদিস নং: ১১৬৯)

একদা হজরত উবায়দা (রা.) নবী করীম (সা.) কে লাইলাতুল কদরের রাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তখন নবীজী সেই সাহাবিকে বললেন রমজানের বেজোড় শেষের দশ দিনের রাতগুলোকে তালাশ করো। (বুখারি, হাদিস নং: ২০১৭)

হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যদি কেউ লাইলাতুল কদর খুঁজতে চায় তবে সে যেন তা রমজনের শেষ দশ রাত্রিতে খোঁজ করে। (মুসলিম, হাদিস নং : ৮২৩)

তাই ২১, ২৩, ২৫, ২৭, ২৯ রমজানের রাতগুলোকেই বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। ২৭ রমজান ই যে শবে কদরের রাত্রি এ ধারণাটি পোষণ করা উচিত না।

শবে কদরের গুরুত্ব সম্পর্কে, ইবনে মাজাহ শরিফে উল্লেখ রয়েছে, হজরত রাসুল (সা.) বলেন, যে লোক শবে কদর থেকে বঞ্চিত হয় সে যেন সমগ্র কল্যাণ থেকে পরিপূর্ণ বঞ্চিত হল।

আবু দাউদ শরিফে উল্লেখ রয়েছে, হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদর পেলো কিন্তু ইবাদত-বন্দেগীর মাধ্যমে কাটাতে পারলো না, তার মতো হতভাগা দুনিয়াতে আর কেউ নেই।

লাইলাতুল কদর উপলক্ষে আমাদের করণীয়

১. কদরের ফজিলত পাওয়ার উদ্দেশ্যে কিছু নফল ইবাদত করা, নফল নামাজ আদায় করা। কোরআন তেলাওয়াত করা, তাছবীহ তাহলীল পাঠ করা কর্তব্য। দুই দুই রাকআত করে নফলের নিয়ত করে যেকোনো সূরাই সূরা ফাতেহার সঙ্গে মিলিয়ে নামাজ পড়া যাবে। তাতে কোনো অসুবিধা নেই। উত্তম হলো নফল নামাজ ধীরে সুস্থে লম্বা লম্বা ক্বেরাত দিয়ে পড়া এবং ধীরস্থিরে রুকু-সিজদা আদায় করা।

২. লাইলাতুল কদর হলো বছরের শ্রেষ্ঠ রাত। এ রাতের শ্রেষ্ঠ দোয়া হলো ক্ষমা চাওয়ার দোয়া। এ রাতে মহানবী (সা.) ক্ষমা চাওয়ার দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন যে, তুমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাও, ক্ষমা পাওয়ার জন্য দোয়া করো। হাদীস শরীফে আছে হযরত আয়েশা (রা.) মহানবী (সা.) কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ইয়া রাসূল আল্লাহ! যদি আমি বুঝতে পারি শবে কদর কোন রাত, তাহলে ঐ রাতে আমি কি বলব? আল্লাহর কাছে কি চাইব? প্রিয় নবী (সা.) তদুত্তরে বলেন তুমি বলবে, ‘হে আল্লাহ আপনি বড়ই ক্ষমাশীল। ক্ষমা করতে আপনি ভালবাসেন, তাই আমাকে ক্ষমা করে দিন। ’ আরবি দোয়া হলো- আল্লাহুম্মা ইন্নাকা, আফুউন তুহেববুল আফওয়া, ফাওফু আন্নি (ইবনে মাজাহ)।

তাই শবে কদরের উদ্দেশ্যে আল্লাহর ইবাদাত করা বা আমলগুলো শুধু ২৭ রমজানেই নয় বরং রমজানের শেষ দশ দিনের প্রত্যেক বেজোড় রাতে শবে-কদর তালাশ করতে হবে। এজন্য মহানবী (সা.) রমজানের শেষ দশ দিনে ইতেকাফ করতেন। আর উম্মতের জন্য শরীয়তে ইতেকাফের বিধান কিয়ামত পর্যন্ত জারি রেখে গিয়েছেন যেন তারা ইতেকাফের মাধ্যমে লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব দিয়ে প্রত্যেকটি বেজোড় রাতে এবাদত করতে পারেন।  এ রাতের মহান নিয়ামত কোরআন   বিরাজমান থাকবে  চিরদিন। মানব জীবনে সাফল্য এই কোরআনের আমলের উপরই নির্ভরশীল। এই রাতের মর্যাদা মূল্যায়ন তখনই যথার্থ হবে যখন আমরা কোরআনের নির্দেশিত পথে চলবো, আর কোরআনের বাহক মুহম্মদ (সা.) এর পূর্ণাঙ্গ আনুগত্য করবো। এ রাতের সর্বাপেক্ষা মহৎ প্রাপ্তি হলো কোরআনের হক আদায় করা এবং আল্লাহর বান্দাদেরকে কোরআন প্রদর্শিত পথে পরিচালিত করার জন্য নিজেদেরকে সর্বদা প্রস্তুত করা।

আল্লাহ যেন সবাইকে লাইলাতুল কদর তালাশ করার তৌফিক দান করুন। সে অনুয়ারী আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন!
—————————————————-
হালিমা তুজ সাদিয়া
শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।

  •  
  •  
  •  
  •  
ad0.3

Tags: , ,