উপসর্গ থাকা সত্ত্বেও করোনা পরীক্ষার ফল নেগেটিভ? বৈজ্ঞানিক কি কারণ থাকতে পারে

Shahiduzzaman

ড. মোঃ সহিদুজ্জামান

করোনার অতিমারীতে বিশ্ব এক চরম সংকটময় অবস্থা অতিবাহিত করছে। প্রতিনিয়ত ভাইরাস তার রূপ বদলাচ্ছে। পরিবর্তন হচ্ছে তার গতি প্রকৃতি। ভাইরাসের পরিবর্তনের সাথে সাথে আমরা কতটুকু পরিবর্তন হতে পারছি। প্রযুক্তি ও অভ্যাসগত পরিবর্তন কতটুকু হচ্ছে তা করোনা থেকে বেঁচে থাকার জন্য এখন মূখ্য বিষয়।

করোনার প্রকোপ বাড়ার সাথে সাথে ভাইরাসটির সনাক্তকরণ চাহিদাও বেড়ে যাচ্ছে। যেহেতু আরটি- পিসিআর একমাত্র উপযুক্ত পরীক্ষা পদ্ধতি তাই করোনা রোগী সনাক্তকরণে আরটি -পিসিআর পরীক্ষার চাহিদাও তুঙ্গে। কিন্তু বহু মানুষের করোনার যাবতীয় উপসর্গ থাকার পরেও রিপোর্ট নেগেটিভ আসছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ভুল রিপোর্ট থাকায় হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে না সময়ে। তাই কোভিডের প্রভাব অনেক গুরুতর হয়ে যাচ্ছে।

যদিও আরটি-পিসিআর টেস্ট করোনা ভাইরাস সনাক্তকরণে অদ্যবধি সেরা পরীক্ষা। কিন্তু তার মানেই এই নয়, যে ফল সব সময় ঠিক হবে। কোন কোন পরিস্থিতিতে ভুল রিপোর্ট আসতে পারে সেটিও বিবেচ্য বিষয়।

শরীরের ভাইরাসের সংখ্যা বা পরিমান (ভাইরাল লোড)

করোনাভাইরাস শরীরের প্রবেশের পর থেকে সাধারণত ৫ দিনে সংক্রমণ দেখা যায়। এর আগে করোনার সংখ্যা বা পরিমান যদি শরীরের কম থাকে অর্থ্যাৎ যদি শরীরে ভাইরাল লোড কম থাকে তাহলে তা সনাক্ত নাও হতে পারে। তাই রিপোর্ট প্রথমে নেগেটিভ এলেও হয়তো কয়েক দিন পর ফের পরীক্ষা করালে পজিটিভ আসতে পারে। তবে, অনেক নতুন রূপ পরিবর্তিত ভাইরাসের ক্ষেত্রে সংক্রমণ হতে পারে ৫ দিনের আগেই। তাই রিপোর্ট ভুল আসার পিছনে এটাই অন্যতম বড় কারণ নয়।

পরীক্ষা পদ্ধতি

একটি নির্ভূল পরীক্ষা পদ্ধতির জন্য নমুনা সংগ্রহ থেকে শুরু করে আরটি-পিসিআর পযন্ত প্রতিটি ধাপ গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক সময়ে, সঠিক পদ্ধতি ও সঠিক জায়গা থেকে নমুনা সংগৃহীত না হলে রিপোর্ট ভুল আসতে পারে। এছাড়া সংগৃহীত নমুন সঠিকভাবে সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাত করে নির্ভূলভাবে আরটি-পিসিআর মেশিনে কাজ করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ ।

আরটি-পিসিআর পরীক্ষায় স্যাম্পল থেকে নিউক্লেইক অ্যাসিড বার করে তার সম্প্রসারণ করা হয়। করোনার সংক্রমণের জন্য দায়ী যেটা, সেটা ধরার জন্য। এই সম্প্রসারণ করা হয় বারে বারে (বা একেক সাইকেলে) একটা সীমা বজায় রেখে (সিটি ভ্যালু)। রক্তে ভাইরাল লোড যত বেশি হবে, তত কম বার সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন হবে সেটা ধরার জন্য। পিসিআর কিট অনুযায়ী এই সিটি ভ্যালু নির্দিষ্ট করা হয়ে থাকে। এর বেশি বার সম্প্রসারণ করার প্রয়োজন পড়লে, ধরে নিতে হবে, রক্তে যে ভাইরাল লোড রয়েছে, তা নেহাতই কম। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, কোভিড রিপোর্ট ভুল আসার অন্যতম কারণ হতে পারে সিটি ভ্যালু।

ভাইরাসের রূপ পরিবর্তন

আরটি-পিসিআর টেস্ট কিটগুলি তৈরি হয়েছিল করোনার প্রথম ঢেউয়ের সময়। তখনকার ভাইরাস সঠিকভাবে ধরা পড়ত এই পরীক্ষায়। কিন্তু এখন ভাইরাস আর আগের মতো নেই। রূপ পরিবর্তন করে এখন অনেক বেশি ভয়ানক রূপ নিয়েছে করোনা। তাই অনেকগুলো নতুন স্ট্রেইন আরটি-পিসিআর টেস্টে ঠিক মতো ধরা না-ও পড়তে পারে।

ল্যাবে বায়োসিকিউরিটি বা জৈব নিরাপত্তা ভাল না হলে এবং সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকলে -যেমন কাজ করার সময় পজিটিভ নমুনা থেকে ভাইরাস বা ভাইরাসের অংশ (আরএনএ) নেগেটিভ নমুনায় সংক্রমিত হলে তা থেকে পজিটিভ (ফলস্ পজিটিভ) রিপোর্ট আসতে পারে।

কী করণীয়

যদি আপনার কোভিডের যাবতীয় উপসর্গ থাকে তা হলে নেগেটিভ রিপোর্ট আসা সত্ত্বেও নিভৃতবাসে থাকুন। এবং রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা ঘন ঘন মাপুন। জ্বর থাকলে দেহের তাপমাত্রা মাপুন। মনে সংশয় থাকলে আরেকবার টেস্ট করাতে পারেন।

বাংলাদেশ করোনা সনাক্তকরণে যে কিটটি ব্যবহার করে আরটি-পিসিআর করা হচ্ছে সেটি বায়েটেক এর সানসিউর কিট। করোনাভাইরাসের যে দুটি জিন অংশকে টার্গেট করে এই কিটটি ব্যবহার করা হচ্ছে সেই অংশে যদি মিউটেশন বা পরিবর্তন হয়ে থাকে তাহলে নেগেটিভ রিপোর্ট আসতে পারে। এরকম কোন পরিবর্তন হয়েছে কি না তা জানার জন্য গবেষণা প্রয়োজন। প্রয়োজন করোনার দেশীয় স্ট্রেইন সনাক্ত করণ এবং এর পুরো জিন সিকোন্সসিং।

বর্তমানে বাংলাদেশে আরটি-পিসিআর পরীক্ষা করার ল্যাবেরোটরি দুই শতাধিক। কিন্তু দেশে সংক্রমণের স‌ংখ্যাও যে হারে বাড়ছে, তাতে আরটি-পিসিআর পরীক্ষার চাহিদা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে ল্যাবগুলি। ধারাবাহিকভাবে ল্যাবের গুণগত মান বিচার, তদারকি এবং প্রয়োজনীয় সাপোর্টও গুরুত্বপূর্ণ।

করোনা রোগী সনাক্তকরণে প্রতিটি কাজ নির্ভূলভাবে করতে হবে। এজন্য যেমন দক্ষ বা প্রশিক্ষিত জনবল দরকার তেমনি কাজের লোড অনুযায়ী প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল, আরটি-পিসিআর ল্যাব ও কাজের সুযোগ সুবিধা বাড়ানোও দরকার।

 

  •  
  •  
  •  
  •  
ad0.3

Tags: , , ,