বিলাসিতা বন্ধ ও পরিবেশ বান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব

মতামত

তাসনিম ইলিন ইসলাম

এখন একটা সংকট সময় পার করছে গোটা বিশ্ব। এই সংকট হচ্ছে জ্বালানিসংকট।  আর এর মূল কারণ হচ্ছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ।

বর্তমানে বাংলাদেশে দৈনিক তাপমাত্রা ৩৩° থেকে ৩৮° সেলসিয়াসে রয়েছে, এমতাবস্থায় লোডশেডিং শব্দটি যেন আতংকের নাম। হঠাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ার ফলেই এমতবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। দেশে জ্বালানিসংকট নিরসনে লোডশেডিংয়ে সমাধান দেখছে সরকার। বিশ্ববাজারে এলএনজি ও জ্বালানি তেলের চড়া দামের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের এমন সিদ্ধান্ত বলে জানা যায়।

এমন পরিস্থিতিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পাশাপাশি বিলাসিতা পরিহার করে বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।

বিভিন্ন প্রাকৃতিক উৎস যেমন: সূর্যের আলো ও তাপ, বায়ু প্রবাহ, জলপ্রবাহ, জৈব শক্তি (জৈবভর), ভূ-তাপ, সমুদ্র তরঙ্গ, সমুদ্র-তাপ, জোয়ার-ভাটা, শহুরে আবর্জনা, হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল ইত্যাদি নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়।

বর্তমানে পরিবেশ বান্ধব বিদ্যুৎ হিসেবে বহুল প্রচলিত রয়েছে সৌর বিদ্যুৎ। গ্রামে কিছু বাড়িতে এবং ঢাকা শহরের উঁচু বিল্ডিগুলোতে দেখা যাচ্ছে সৌর বিদ্যুতের শেড। কিন্তু, তাও খুব সীমিত আকারে ব্যবহার করা হচ্ছে।

গ্রামে যেসব বাড়ীতে গরু লালন-পালন করা হয়, সেখানে গরুর গোবর থেকে যে বায়োগ্যাস উৎপাদিত হয় তা ব্যবহার করে তারা রান্না এবং ঘরে লাইট জ্বালিয়ে থাকেন। এতে অনেকটাই বিদ্যুতের সাশ্রয় হচ্ছে।

কিন্তু, বেশিরভাগ মানুষই বিদ্যুতের অপচয় করে থাকেন। বিশেষক্ষেত্রে সরকারী প্রতিষ্ঠান সমূহে। সরকারী অফিস আদালতে অনেক অবকাঠামোগত পরিবর্তন হওয়ায় এবং সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি পাওয়ায় বৈদ্যুৎ খরচ যে অনেকাংশে বড়ে গেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।  সরকারী অফিসসমূহে সবগুলে রুমেই বর্তমানে এসির ব্যবস্থা রয়েছে। তারসাথে রয়েছে যাচ্ছেতাই ব্যবহারও। প্রয়োজন নেই তবুও ২৪ ঘন্টাই ফ্যান ঘুরে, এসি চলে কোথাও কোথাও। এসব প্রতিষ্ঠানে পরিমিত বিদ্যুতের ব্যবহার বিদ্যুয় সাশ্রয়ের পাশাপাশি অনেক খরচ কমিয়ে দিতে পারে।  এমতাবস্থায়, ১০ কক্ষে ১০ জন না বসে, এক কক্ষে ১০ জন বা ৫ জন করে বসেও কাজ করতে পারেন।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে ছুটি শেষে লাইট, ফ্যান বন্ধ করা, হলসমূহের সিঁড়িতে দিনের বেলাতে যাতে লাইট না জ্বলে, এমনকি স্ট্রিট লাইটগুলোও দিনের বেলাতে যাতে না জ্বলে সেদিকে কর্তৃপক্ষের জোর দৃষ্টি দেওয়া উচিত। অনেকসময় ট্রেনে দিনের বেলাতেও লাইট জ্বলতে দেখা যায়।

ব্যক্তিমালিকাধীন প্রতিষ্ঠানসমূহে কিছুটা হলেও বিদ্যুতের অপচয় কম। কিন্তু, সাধারণ জনগণের সরকারী সম্পদের যথাযথ ব্যবহারের প্রতি রয়েছে উদাসীনতা। তার ফলই এখন আমাদের ভোগ করতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে, একদিন আমাদের তীব্র বিদ্যুৎ সংকটে ভুগতে হবে। এটা একটি জাতীয় সমস্যা, এখানে সবার সহযোগিতা লাগবে।

শপিংমলগুলো অফিস আওয়ারের পরে চালু করা যেতে পারে। প্রতিটি দোকানেই কাপড়কে আকর্ষণীয় করে তুলতে ৫/৬ টা লাইট ব্যবহার করা হয়। সেক্ষেত্রে প্রতিটি দোকানে ১ টা লাইট কম ব্যবহার করলেও সারাদেশে অনেক হাজার লাইট কম জ্বলবে।

চার্জ এবং ব্যাটারি চালিত অটোরিকশাগুলোর ব্যবহার আপাতত কমানো যেতে পারে সাময়িক সময়ের জন্য।

পুরোদেশে প্রায় লক্ষাধিক এটিএম বুথ আছে। এখানে এসি চালানোর প্রয়োজন আছে কি না তা ভাবা দরকার, যেখানে ন্যাশানাল ক্রাইসিস চলছে। সাময়িক ভাবে নোটিশ দিয়ে এগুলো বন্ধ করা প্রয়োজন।

অন্যান্য দেশের মত অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে এখন কৃচ্ছ্রসাধন তথা সরকারি ব্যয় কমানোর পথেও হাঁটছে পাকিস্তান সরকার। তারই অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য ও সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য বরাদ্দ গাড়ির জ্বালানি তথা পেট্রল কোটা (৩৫-৪০%) কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ।

বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আলোকসজ্জা বন্ধের সিদ্ধান্ত অনেক বিদ্যুতের সাশ্রয় করবে। পাশাপাশি  দেশে অগনিত পানির ফোয়ারা আছে। এরা প্রচুর বিদ্যুৎ টানে। এগুলো বন্ধ করা যেতে পারে। রাস্তার বড়বড় টিভিগুলো বন্ধ রাখা দরকার।

সর্বোপরি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে এখন থেকে মনোযোগী হতে হবে আমাদের সকলকেই। সৌর বিদ্যুৎ, বায়োগ্যাস বা অন্যান্য নবায়নযোগ্য সহজলভ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুতের উৎপাদনে সবাইকে আগ্রহী হতে হবে। এবং সকল প্রকার বিলাসিতা, অপব্যয়ী মনোভাব দূর করতে পারলেই আমরা এই জাতীয় সমস্যা থেকে শীঘ্রই মুক্তি লাভ করতে পারবো।

লেখকঃ শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

  •  
  •  
  •  
  •