আমাজন রেইন ফরেস্ট কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণের চেয়ে নির্গমন করছে বেশি

হালিমা তুজ সাদিয়াঃ

দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন নদী বিধৌত অঞ্চলে অবস্থিত বিশাল বনভূমি- আমাজন। প্রায় ৭০ লাখ বর্গকিলোমিটার অববাহিকা পরিবেষ্টিত এই অরণ্যের ৫৫ লাখ বর্গ কিলোমিটার এলাকাটি আর্দ্র জলবায়ু দ্বারা প্রভাবিত। ৯টি দেশ জুড়ে এই অরণ্য বিস্তৃত যার ৬০ ভাগ ব্রাজিলে, ১৩ ভাগ পেরুতে এবং বাকি অংশ রয়েছে কলম্বিয়া, বলিভিয়া, গায়ানা, সুরিনাম এবং ফরাসি গায়ানায়। পৃথিবী জুড়ে যে রেইন ফরেস্ট রয়েছে তার অর্ধেকই আমাজনে। এই জঙ্গলে প্রায় ৩৯০ বিলিয়ন বৃক্ষ রয়েছে যেগুলো ১৬ হাজারের বেশি প্রজাতিতে বিভক্ত। পৃথিবীর প্রায় ২০ ভাগ অক্সিজেনের জোগান দেয় আমাজন এজন্য একে পৃথিবীর ফুসফুস বলা হয়। তবে আশঙ্কার কথা, গত এক দশকে সবচেয়ে বেশি হারে উজাড় হয়েছে ব্রাজিলের আমাজন নদী অববাহিকার রেইন ফরেস্ট বা চিরহরিৎ বন।

বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো এটি নিশ্চিত করেছেন যে, অ্যামাজন রেইন ফরেস্ট বর্তমানে কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণের চেয়ে বেশি হারে নির্গত করছে যা বছরে এক বিলিয়ন টনের বেশি।

আমরা সকলেই জানি- গাছ তার খাদ্য তৈরির জন্য বাতাস থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড শুষে নেয়। বিশালাকার বনটি পূর্বে কার্বন সিংক হিসেবে কাজ করতো কিন্তু বর্তমানে বনটি তার নব্যতা হারিয়ে আরো অতিরিক্ত কার্বন, কার্বন-ডাই-অক্সাইড রুপে নিঃসরণ করছে। এক্ষেত্রে বেশিরভাগ কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গমনের কারণ হিসেবে বিজ্ঞানী’রা চিহ্নিত করেছেন, আগুন দ্বারা বন পোড়ানো, কৃষিকার্য সম্পাদনের জন্য জমি পরিষ্কার করার উদ্দেশ্যে অবৈধভাবে গাছ কাটা। ফলশ্রুতিতে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, খরা দেখা দিচ্ছে যার প্রভাব পরছে জলবায়ুতে। এসব কারণেই দক্ষিণ-পূর্ব অ্যামাজন বর্তমানে কার্বন সিংকের পরিবর্তে কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গমনের উৎস হয়ে উঠেছে।

ওকলাহামা ইউনিভার্সিটির স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত এক তথ্যে চমকে দিয়েছে একদল ফরাসি বিজ্ঞানীকে। গবেষক দলের মুখপাত্র, ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর আর্গোনমিক রিসার্চের অধ্যাপক জঁ পিয়ের উইনেরন এই প্রসঙ্গে একটা পরিসংখ্যান পেশ করেছেন। যা সম্প্রতি দশকে, বিশেষ ভাবে ২০১০-২০১৯ সালের মধ্যে আমাজন কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ করেছে ১৬.৬ বিলিয়ন টন। সেই তুলনায় কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে উঠতে পেরেছে মাত্র ১৩.৯ বিলিয়ন টন!

এটা দেখে এই বিজ্ঞানীরা তো বটেই সারা পৃথিবীর পরিবেশবিদেরাই আতঙ্কিত হয়ে উঠেছে। বিশ্বের বৃহত্তম ক্রান্তীয় অরণ্যের যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে বিশ্ব উষ্ণায়ন এবং বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইড কমানোর জন্য হাতে আর কিছু থাকবেনা।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের ফলে অ্যামাজনের ক্ষমতা হারিয়ে যাচ্ছে, এখন সতর্কবাণী যে- জীবাশ্ম জ্বালানী ব্যবহারে পূর্বের তুলনায় আরো বেশি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে কেননা জীবাশ্ম জ্বালানিতে উচ্চ পরিমাণে কার্বন থাকে এবং এটি ব্যবহারে মারাত্মক পরিবেশ দূষণ ঘটে। জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের কারণে বাতাসে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায় কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ।

পরিবেশবিদরা জানিয়েছেন, ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি বলসোনারো (Jair Bolsonaro) ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হওয়ার পর থেকেই আমাজন অরণ্য আরও বেশি বেহাল হয়ে উঠেছে। কেননা তিনি বন উজাড় করার জন্য উৎসাহিত করেছেন।

ব্রাজিলের জাতীয় মহাকাশ গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান- লুসিয়ানা গাট্টি বলেন, “ বন দহনের ফলে কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণের চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি কার্বন-ডাই-অক্সাইড উৎপন্ন হয়। ২০% এর চেয়ে কম বনভূমি উজার হলে সেখানে ১০ গুণ বেশি কার্বন নির্গমন দেখায় কিন্তু আমাজনের কিছু কিছু জায়গাগুলিতে বর্তমানে বন উজাড়ের পরিমান ৩০% বা তারও বেশি। গাট্টি আরো বলেন, “অ্যামাজন’কে বাঁচাতে আমাদের বিশ্বব্যাপী চুক্তি দরকার। কিছু ইউরোপীয় দেশ বলেছে যে, ব্রাজিল এবং অন্যান্য দেশের সাথে ইস্রায়েলি বাণিজ্য চুক্তি বন্ধ করে দিবে যদি- ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট বলসোনারো অ্যামাজনীয় ধ্বংসকে মোকাবেলায় করতে পদক্ষেপ না নেয়।

  •  
  •  
  •  
  •  
ad0.3

Tags: , ,