ভারতে জাকির নায়েকের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
অর্ধশতকেরও বেশি লোককে জঙ্গিবাদে উসকানি দেওয়ার অভিযোগে বিতর্কিত বক্তা জাকির নায়েকের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার।

সন্ত্রাসবাদে সহযোগিতার অভিযোগে তার প্রতিষ্ঠান ইসলামিক রিসার্চ ফাউন্ডেশনকেও বেআইনি ঘোষণার কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

ঢাকার গুলশানে গত ১ জুলাইয়ে জঙ্গি হামলায় জড়িতদের মধ্যে অন্তত দুজন জাকির নায়েককে অনুসরণ করতেন, এমন অভিযোগ ওঠার পর নতুন করে আলোচনায় আসেন মহারাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া জাকির নায়েক। তার কথায় প্ররোচিত হয়ে ভারতের কয়েক ডজন তরুণ আইএসে যোগ দিতে সিরিয়ায় পাড়ি জমিয়েছে বলেও ভারতীয় গণমাধ্যমে খবর আসে।

এরপর জাকির নায়েক ও তার প্রতিষ্ঠান ইসলামিক রিসার্চ ফাউন্ডেশন (আইআরএফ) বিষয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় ও মহারাষ্ট্র রাজ্য সরকার তদন্ত শুরু করে; সৌদি আরব সফরে থাকা জাকির নায়েক তখন দেশে ফেরা স্থগিত করে আফ্রিকায় পাড়ি জমান। তিনি কবে দেশে ফিরবেন ‘তাও নিশ্চিত নয়’ বলে টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে।

কেন্দ্রীয় সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে পত্রিকাটি জানায়, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জাকির নায়েকের বিতর্কিত বক্তৃতাগুলোর একটি তালিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে।

টেলিভিশন ও বিভিন্ন স্থানে দেওয়া এসব বক্তব্যে জঙ্গিবাদে উসকানি দেওয়ার প্রমাণ মেলায় তার বিরুদ্ধে ‘বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ’ আইনে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হবে।

“জাকির নায়েকের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তি হচ্ছে আগে ঘটে যাওয়া সন্ত্রাসবাদের বেশ কয়েকটি ঘটনা। ওইসব কাণ্ডে যারা জড়িত ছিলেন তাদের অনেকেই তার বক্তব্যে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন বলে আমাদের জানিয়েছেন,” বলেন এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা।

টাইমস অব ইন্ডিয়া বলছে, যাদের জবানবন্দির ভিত্তিতে জাকির নায়েকের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদে উসকানির অভিযোগ আনা হচ্ছে তাদের মধ্যে ২০০৬ সালে আওরঙ্গবাদ অস্ত্র চালান মামলায় অভিযুক্ত ফিরোজ দেশমুখ রয়েছেন। ফিরোজ ইসলামিক রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (আইআরএফ) সাবেক কর্মী।

এছাড়া ২০১২ সালে পুনের ইয়েরওয়াদা কারাগারে খুনের শিকার ইন্ডিয়ান মুজাহেদিন দলের সদস্য কাতিল আহমেদ সিদ্দিকী, ২০১৫ সালে যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফেরার পর গ্রেপ্তার হওয়া জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের সন্দেহভাজন সদস্য আফশা জাবিন এবং ভারতে আইএসঘনিষ্ঠ হিসেবে সন্দেহ করা সংগঠন জুনদ-উল-খালিফা-ই-হিন্দ এর সদস্য মুদাব্বির শেখ, মো. ওবায়দুল্লাহ খান, আবু আনাস ও মো. নাফিস খানও রয়েছে। শেষ চারজনকে জানুয়ারিতে ভারতের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে আটক করা হয়।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য প্রচার ও জোর করে ধর্মান্তরিত করার অভিযোগে আইআরএফকেও বেআইনি ঘোষণা করার কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

সম্প্রতি কেরালা থেকে আইএস নিয়ন্ত্রিত আফগানিস্তানের খোরাসানে চলে যাওয়া ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরের ভাই অভিযোগ করেন, আইআরএফের এক কর্মী তার ভাইকে জোর করে মুম্বাই নিয়ে ধর্মান্তরিত করেন।

ভারতের আইন অনুযায়ী, আইআরএফ বেআইনি সংগঠন হিসাবে ঘোষিত হলে পুরো দেশে থাকা তাদের অফিস ও অন্যান্য কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হবে। মুম্বাইয়ে সদর দপ্তর ছাড়াও আইআরএফের অধীন শিক্ষা ট্রাস্টের মাধ্যমে মুম্বাই এবং চেন্নাইয়ে আন্তর্জাতিক ইসলামি স্কুল ও অনেক সম্পত্তি রয়েছে বলে টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে।

আইআরএফ নিষিদ্ধ হলে মহারাষ্ট্র সরকার ‍মুম্বাইয়ের ওই স্কুলটি অধিগ্রহণ কিংবা অন্য কাউকে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দিতে পারবে, যেন সেখানকার শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। একই ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে স্কুলটির চেন্নাই শাখাতেও।

বিতর্কিত এ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জঙ্গি দলগুলোর জন্য সদস্য সংগ্রহ ও অন্য ধর্মাবলম্বীদের জোর করে ধর্মান্তরিত করারও অভিযোগ রয়েছে।

গত মাসে প্রতিষ্ঠানটির কর্মী আরশিদ কুরেশিকে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের সদস্য সংগ্রহের অভিযোগে গ্রেপ্তার করে মুম্বাই পুলিশ। তার বিরুদ্ধে কেরালার একদল তরুণকে মগজধোলাই করে আইএসে যোগ দিতে প্ররোচনার অভিযোগ আনা হয়েছে।

পুলিশের বরাত দিয়ে এনডিটিভি তখন জানিয়েছিল, আরশিদ ২০০৪ সাল থেকে ইসলামিক রিসার্চ ফাউন্ডেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেন এবং মাসে তিনি ৪৪ হাজার রুপি বেতন পান বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এ বছরের শুরুতে নারী ও শিশুসহ কেরালার যে ২১ জন নিখোঁজ হয়েছেন তারা আইএসে যোগ দিয়েছেন বলে ধারণা করছে ভারতীয় গোয়েন্দারা। নিখোঁজদের একজনের বাবা ছেলের ‘আইএসে যোগদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায়’ আরশিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে কেরালায় তার বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়।

গ্রেপ্তার আরশিদকে জিজ্ঞাসাবাদের পর ভারতের মুসলমান তরুণদেরকে ‘জঙ্গিবাদে উৎসাহ’ দিতে জাকির নায়েকের ভূমিকা সম্পর্কে আরও অনেক কিছু জানা যাবে বলে ধারণা গোয়েন্দা সংস্থার। চিকিৎসা শাস্ত্রে লেখাপড়া করা নায়েক বিভিন্ন সময়ে ইসলাম ধর্ম, জঙ্গিবাদ, জিহাদ নিয়ে বক্তব্যের জন্য বিতর্কিত হয়েছেন; নিষিদ্ধ হয়েছেন যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে।

গত বছর উসকানিমূলক কথাবার্তা বলার অভিযোগে ভারতের কর্নাটক রাজ্যে তাকে নিষিদ্ধ করা হয়৷ আর গুলশানের খুনিদের আগ্রহের বিষয়টি উঠে আসার পর নায়েকের বিরুদ্ধে ভারতে শুরু হয় নতুন তদন্ত। বিতর্কিত এ বক্তার ব্যাংক হিসাবে গত তিন বছরে তিনটি দেশ থেকে প্রায় ৬০ কোটি রুপি জমা হওয়ার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছিল ভারতীয় পুলিশ।

গত সপ্তাহে কেরালা থেকে নিখোঁজ দুই ভাইয়ের বাবা-মা জাকির নায়েকের বিরুদ্ধে পুলিশে অভিযোগ জানিয়ে বলেছেন, তাদের দুই সন্তান মুম্বাইয়ে বিতর্কিত এ বক্তার সঙ্গে দেখা করার পর খ্রিস্টান থেকে ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হন। চলতি বছরের ‍মে-জুনের দিকে ওই দুই তরুণ ইসা ও ইয়াহিয়া শ্রীলঙ্কা হয়ে আইএস অধ্যুষিত অঞ্চলে পাড়ি জমিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

১৯৬৫ সালে মুম্বাইয়ে জন্ম নেওয়া জাকির নায়েক কিষানচাঁদ চেলারাম কলেজের পর টোপিওয়ালা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজে মেডিসিন বিষয়ে পড়ালেখা করেন। পরে বিওয়াইএল নায়ার চ্যারিটেবল হাসপাতালেও তিনি লেখাপড়া করেন।

১৯৮৭ সালে ইসলামী বক্তা আহমেদ দিদাতের সংস্পর্শে আসেন নায়েক। এর কয়েক বছর বাদে ১৯৯১ সাল থেকে শুরু করেন ধর্ম প্রচারের কাজ। এরই ধারাবাহিকতায় গড়ে তোলেন ইসলামিক রিসার্চ ফাউন্ডেশন (আইআরএফ); এই ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধানেই চলে পিস টিভির কার্যক্রম।

ওই টিভিতে তিনি ধর্ম নিয়ে যে আলোচনা করেন, তা নিয়ে বিতর্ক হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। তার বক্তৃতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দক্ষিণ এশিয়ার বহু তরুণ জঙ্গিবাদে ঝুঁকছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। গুলশান হামলার পর বাংলাদেশে তার পিস টিভির ডাউন লিংক বাতিল করা হয়েছে।

  •  
  •  
  •  
  •