তরমুজের বাম্পার ফলন: লাভ বেশি, চাষীর মুখে হাসি

নিজস্ব প্রতিবেদক
পটুয়াখালীর বাউফলে এ বছর আগেভাগেই তরমুজের বাম্পার ফলনের আশা করছিলেন চাষীরা। এই এলাকার তরমুজ মজাদার এবং ‘রাঙ্গা তরমুজ’ নামে সুপরিচিত। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, রবি ফসলের সঙ্গে চলতি মৌসুমে ৫০ হেক্টরে ক্ষীরা, ১৬০ হেক্টরে বাঙ্গি ও ৯শ’ ৫০ হেক্টরে তরমুজের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে এই তরমুজের। আগেরবার করোনার লকডাউনে পরিবহন ও বিপণন সমস্যায় লাভের মুখ দেখেননি চাষীরা। এবার উপজেলার চরকচ্ছবিয়া, চরওয়াডেল, রায়সাহেবের চর, চরঈশান, মমিনপুর চর, বাসুদেবপাশা, চরশৌলাসহ বিভিন্ন চরের তরমুজের বাম্পার ফলন হয়েছে।

এদিকে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস প্রতিরোধে লকডাউনে সারাদেশের মানুষের আনন্দ উল্লাস অম্লান হলেও খুশির বন্যা বইছে বরগুনার আমতলী উপজেলার তরমুজ চাষীদের মধ্যে। আবহাওয়া অনুকূল, প্রচন্ড তাপপ্রবাহ ও পরিবহন সঙ্কট না থাকায় ভাল দামে তরমুজ বিক্রি করেছেন তারা। বিগত বছরের তুলনায় চারগুণ বেশি লাভবান হয়েছেন চাষীরা। এতে পরিবারে বইছে খুশির বন্যা। এ বছর তরমুজ চাষে প্রায় দুই শ’ ১০ কোটি টাকা বিক্রি করেছেন বলে দাবি করেন উপজেলা কৃষি অফিসার সিএম রেজাউল করিম।

গলাচিপা উপজেলার চরকাজলের বাবুল খান জানান, এ বছর তিনি বাউফলের চরকচ্ছবিয়ায় ১৫ একর জমি লিজ নিয়ে ক্ষীরা ও শসাসহ সিনজেনটার ড্রাগন জাতের তরমুজের চাষ করেছেন। দীর্ঘ ১৬-১৭ বছরের তরমুজ চাষের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। তাই চাষীরা তার কাছ থেকে তরমুজ চাষের বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ নিচ্ছেন । তার খেতে ১৫ হাজারের মতো মাদায় তরমুজ গাছ রয়েছে। শিলা বৃষ্টির মতো বৈরী আবহাওয়া না হলে এবং আড়তে দাম ভাল পেলে তিনি তরমুজে লাভবান হবেন ।

একই চরের চাষী বাউফলের বাকলা তাঁতেরকাঠি গ্রামের ফিরোজ চৌধুরী জানান, অন্যান্য এলাকার তুলনায় মিষ্টি ও স্বাদে বাউফলের চরের রাঙা তরমুজের সুনাম রয়েছে। আগেরবারের ধকল কাটিয়ে উঠতে সিনজেনটার একজন ডিলালের কাছ থেকে ড্রাগন জাতের বীজ সংগ্রহ করে সামান্য টমেটো, ক্ষীরা ও বাঙ্গিসহ ৭ একর জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন। টমেটো ও ক্ষীরা শেষে ইতোমধ্যে বাঙ্গি তুলতে শুরু করেছেন। ফল বেড়ে ওঠায় সপ্তাখানের মধ্যেই তরমুজ কাটা শুরু হবে তার খেতের।

তিনি আরও জানান, ড্রাগন জাতের ১০০ গ্রামের প্যাকেট বীজ আগেরবার ২ হাজার ২শ’ ৩০ টাকায় পাওয়া গেলেও এবারের মূল্য কিছুটা বেশি ছিল। বীজ সংগ্রহে আগের মতো সিন্ডিকেটের কারসাজি না থাকলেও সার-ওষুধের দাম বেড়েছে। বস্তা প্রতি (৫০ কেজি) ৮শ’ ৫০ টাকা মূল্যে ইউরিয়া সার পাওয়া গেলেও ড্যাব সার কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৫শ’ টাকায়। ড্যাব সারের দাম আগের তুলনায় বস্তাপ্রতি প্রায় সাড়ে ৩শ’ টাকা বেড়েছে। আগের চেয়ে দাম বেড়েছে টিএসপি, দস্তা, জিপসাম, এমওপিসহ এসিআইয়ের বিরি ফায়ার, সিনজেনটার এমিস্টার টপ, গ্রোজিন, ক্যারাটে, ম্যাগমা, রেডিমেট গোল্ড, ক্রুজার, থিউবিট, ভর্টিমেঘ ও স্কোরের মতো কীটনাশকের। এ বছর বৃষ্টিপাত মোটেই না থাকায় সেচের খরচ পড়েছে বেশি।

কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ বছর আমতলীতে তরমুজের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৯শ’ ৯০ হেক্টর। ওই লক্ষমাত্রা অর্জিত হয়েছে। কৃষি বিভাগের হিসাব মতে, প্রতি হেক্টরে ৩৫-৪০ মেট্রিক টন তরমুজ উৎপাদন হয়েছে। প্রতিটন ৩০ হাজার টাকা দামে ৬৯ হাজার ৬৫০ মেট্রিকটন তরমুজ বিক্রি হয়েছে প্রায় ২শ’ ১০ কোটি টাকা। যা গত বছরের তুলনায় ছিল চারগুণ। গত বছর ১ হাজার ৫শ’ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছিল। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে গত বছর তরমুজ চাষীরা লোকসান দিয়েছেন। এ বছর তরমুজের বাম্পার ফলন ও ভাল দামে তরমুজ বিক্রি করায় গত বছরের তুলনায় চারগুণ লাভবান হয়েছে বলে জানান চাষীরা। এদিকে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে গত ৫ এপ্রিল দেশব্যাপী লকডাউন ঘোষণা করে সরকার। ওই লকডাউন ঘোষণায় তিনদিন তরমুজ ব্যবসায় ধস নেমে অর্ধেকে আসে তরমুজের মূল্য। কিন্তু প্রচন্ড তাপপ্রবাহ, অনুকূল আবহাওয়া ও পণ্য পরিবহন সঙ্কট না থাকায় তিনদিন পরেই ঘুরে দাঁড়ায় তরমুজের বাজার। ব্যবসায়ী ও চাষীরা আবার লাভবান হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। বর্তমান লকডাউনে তরমুজ চাষী ও ব্যবসায়ীদের ওপর কোন প্রভাব ফেলছে না। উল্টো ঘুরে দাঁড়িয়েছে তরমুজ বাজার। ১০০ টাকার তরমুজ বর্তমানে ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। রমজান মাস শুরু হওয়ায় তরমুজের দাম আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

কুকুয়া ইউনিয়নের চুনাখালী গ্রামের ওহাব মৃধা, বাহাউদ্দিন হাওলাদার ও রাজ্জাক মৃধা বলেন, তিনজনে যৌথভাবে ৩৬ একর জমিতে তরমুজ চাষ করেছি। এতে খরচ হয়েছে ১০ লাখ টাকা। ফলন ও ভাল মূল্য পাওয়ায় ৩১ লাখ টাকা বিক্রি করছি। তারা আরও বলেন, এ বছর লকডাউনে তরমুজ চাষীদের ভাগ্য বদলে দিয়েছে।

আমতলীর আঠারোগাছিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম সোনাখালী গ্রামের তরমুজ চাষী আলমগীর আকন, কামাল হাওলাদার, শহীদুল গাজী, লিমন গাজী ও মাহাতুল মল্লিক বলেন, এ বছর লকডাউনে তরমুজের ওপর কোন প্রভাব পড়েনি। উল্টো লকডাউন তরমুজ চাষীদের ভাগ্য বদলে দিয়েছে। তারা আরও বলেন, অনায়াসে পরিবহন চলাচল করতে পারায় ভাল দামে তরমুজ বিক্রি করতে পেরেছি।

আমতলী বাঁধঘাট চৌরাস্তায় তরমুজ ব্যবসায়ী রিপন চন্দ্র মৌয়ালি ও বাবুল মৃধা বলেন, তরমুজের প্রচুর চাহিদা। চাহিদা মতো ক্রেতাদের তরমুজ দিতে পারছি না। তারা আরও বলেন, দামও অনেক বেশি। দাম বেশি হলেও ক্রেতারা অনায়াসে কিনে নিয়ে যাচ্ছে।

আমতলী গাজীপুর বন্দরের তরমুজ ব্যবসায়ী মোঃ সোহেল রানা বলেন, লকডাউনে তরমুজ পরিবহনে দুই তিনদিন সমস্যা হয়েছিল। কিন্তু এখন আর সেই সমস্যা নেই। অবাধে তরমুজ বিক্রি করতে পারায় চাষীরা বেশি দাম পাচ্ছেন।

  •  
  •  
  •  
  •  

Tags: