পাবনার শফিকুল দেশসেরা প্রাথমিক শিক্ষক নির্বাচিত

পাবনা প্রতিনিধি:
সারাদেশের মধ্যে সেরা প্রাথমিক শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন সাঁথিয়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শফিকুল ইসলাস রিপন।

জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহের বিভিন্ন ক্যাটাগরিভিত্তিক প্রতিযোগিতায় তাকে সেরা শিক্ষক নির্বাচিত করা হয়। শিশুদের মাঝে তিনি খুঁজে পেয়েছেন জীবনের আনন্দ। চেষ্টার সবটুকু ঢেলে দিতে চান আগামী প্রজন্মের সুস্থতা ও সমৃদ্ধতার ধারায়। পুরস্কার পেয়ে এমনই অভিব্যক্তি ব্যক্ত করেন তিনি।

গত রোববার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ‘জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহ-২০১৭’ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেন তিনি। এ খবরে তার সহকর্মী ও শিক্ষার্থীসহ সকলের মাঝেই বইছে আনন্দের বন্যা।

শফিকুল ইসলাম সাঁথিয়া বাজার এলাকার বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক আমজাদ হোসেন ও গৃহিনী শেফালী বেগমের ছেলে। একজন শিক্ষকের ছেলে হয়ে নিজেও শিক্ষক হিসেবে দেশ সেরা শিক্ষক নির্বাচিত হওয়ায় তার নিজের আনন্দের যেন শেষ নেই। শিক্ষক হিসেবে রিপনের চাকরি জীবন শুরু হয় ১৯৯৯ সালের ৬ জুন সাঁথিয়ারই হুইখালি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।

পরবর্তীতে ২০০৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারিতে তিনি যোগ দেন ১১৬ বছরের পুরনো সাঁথিয়ার মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তার স্ত্রী রোখসানা আক্তারও স্থানীয় বোয়ালমারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক।

শফিকুল ইসলাম রিপন এসএসসি পাস করেন সাঁথিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। এইচ এস সি পাস করেন ঢাকার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্সসহ মাস্টার্স পাস করেন তিনি। বরাবরই ভালো ফলাফল ছিলো তার।

শিক্ষক বাবার ছেলে নিজেও জড়িয়ে যান শিক্ষকতায়। শিশু শিক্ষার্থীদের মাঝেই খুঁজে নিয়েছেন জীবনের আনন্দ, আত্মার আনন্দঘন স্পন্দন। ইংরেজিতে অনর্গল কথা বলতে পারা দক্ষ ইংরেজি শিক্ষক রিপন সরকারি উদ্যোগে ভারতে অডিও ভিজ্যুয়াল ম্যাটেরিয়াল ডেভেলপমেন্ট শীর্ষক সপ্তাহব্যাপী প্রশিক্ষণের সুযোগ লাভ করেন।

শিশু শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার পাশাপাশি বিভিন্ন সৃজনশীল কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেন তিনি। সঙ্গীত চর্চা, কবিতা আবৃতি, ছবি আঁকানোসহ বিভিন্ন ধরনের কাজে শিক্ষার্থীদের ব্যস্ত রাখেন তিনি। সমাজে বাল্যবিবাহ, যৌতুক, মাদক প্রভৃতি বিষয়ে সামাজিকভাবেও নিজের ভূমিকা তুলে ধরেন, চেষ্টা চালান মানুষের বোধের জায়গাটিকে বাড়ানোর। সমাজ হোক আলোকিত, সুস্থ ও কল্যাণের ধারায় কাজ করুক মানুষ, শিক্ষক রিপনের এমন ভূমিকায় স্থানীয়ভাবেও তিনি নিজেকে করে তোলেন সকলের প্রিয়ভাজন।

শ্রেণিকক্ষে তার পড়ানোর ভঙ্গিমা আকৃষ্ট করে শিশুদের, কচিকাঁচাদের যেন মনে দোলা দেয় তার মমতাঘেরা আচরণ।

শিক্ষার্থীরা জানান, রিপন স্যারের ক্লাস করতে তাদের অনেক ভালো লাগে, এজন্য তারা প্রতিদিনই স্কুলে আসে, পড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন সৃজনশীল সাংস্কৃতিক কাজে তাদের ব্যস্ত রাখেন তিনি।

বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্টে রাজশাহী বিভাগীয় চ্যাম্পিয়ন এবং শিশু একাডেমী আয়োজিত জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতায় সারাদেশে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছিল সাঁথিয়ার মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এ ছাড়াও জেলাভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অসংখ্য পুরস্কার পায় বিদ্যালয়টি। এসবই হয় সহকারী শিক্ষক শফিকুল ইসলাম রিপনের সার্বিক তত্বাবধায়নে।

এ বিষয়ে তার সহকর্মী সহকারী শিক্ষক জুলকার নাইন বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ শিক্ষা লাভ করেও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে চাকরি নিয়ে এক সময়ে সকলকে অবাক করেছিলেন রিপন। এখন দেশের সেরা শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত হয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন কাজকে এবাদত মনে করে একাগ্রতা থাকলে সবই সম্ভব। একটি গ্রামের স্কুল থেকে নিজেকে জাতীয়ভাবে তুলে ধরে তিনি প্রমাণ করে দিলেন শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হয়ে।

নির্বাচিত সেরা শিক্ষক শফিকুল ইসলাম রিপন জানান, একজন ভালো শিক্ষক সঠিক সময়ে ক্লাসে আসবে ও দায়িত্ব পালন করবে। শিশুরা সৃজনশীল যে কাজগুলো পছন্দ করে সেগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষকতার পাশাপাশি সামাজিক কল্যাণমূলক কাজে নিজেকে জড়িয়ে রাখাও একটা দায়িত্ববোধ ও দায়বদ্ধতা।

এই সেরা হবার ঘোষণার মধ্য দিয়ে তার দায়িত্ব আরো বেড়ে গেলো বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আয়নুল হক বলেন, সহকর্মীর এমন প্রাপ্তিতে আমরা গর্বিত। আমরা চাই প্রতিটি স্কুলের শিক্ষক এই উদাহরণ থেকে নিজেদেরকে এগিয়ে নেবেন।

জেলা প্রাথমিক সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা খন্দকার মনছুর রহমান জানান, শফিকুল ইসলাম রিপনের সেরা শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত হওয়ায় খুশি তারা। তাদের প্রত্যাশা প্রতিবছরই যেন পাবনা থেকে এমন গৌরব ওঠে আসে।

  •  
  •  
  •  
  •