শুকিয়ে মরছে গাছ, পচে যাচ্ছে তরমুজ
পটুয়াখালী প্রতিনিধি:
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে সাম্প্রতিক সর্বনাশা শিলা-বৃষ্টির কারণে পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলা চন্দ্রদ্বীপসহ চরাঞ্চলের বিভিন্ন ইউনিয়নের কয়েকশ হেক্টর জমির তরমুজ, বাঙ্গি ও ক্ষীরা ফসলের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। ভারি বর্ষণ ও শিলা বৃষ্টির ফলে বাম্পার ফলন হওয়া ক্ষেতের পর ক্ষেতে তরমুজ, বাঙ্গি ও ক্ষীরা পঁচে যাচ্ছে। বিক্রির পূর্ব মূহুর্তে ফসলের এমন ক্ষতি হওয়ায় কৃষকদের মাথায় হাত পরেছে। কান্নায় ভেঙে পরেছেন অনেকে।
এদিকে বৃষ্টির পর শেষ সম্বলটুক রক্ষায় কৃষি বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের না পেয়ে বিভিন্ন কোম্পানির ডিলারদের পরামর্শ নিয়ে সিনজেনটার গ্রোজিন, ম্যাগমা, ক্যারাটে, থিউবিট, ভার্টিমেঘ ও স্কোরের মতো ভিটামিন (হরমোন) কিংবা কীটনাশকের ব্যাবহার করেও সুফল পাচ্ছে না।
১৮টি চর নিয়ে গঠিত উপজেলার চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বৃষ্টির পানি সরে যাওয়ার পর তরমুজ গাছ হলদে হয়ে মরে যাচ্ছে এবং তরমুজে পঁচন ধরেছে। কৃষকরা প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন শেষ সম্পতটুকু রক্ষার জন্য। কৃষকদের অভিযোগ বৃষ্টিতে তরমুজ, বাঙ্গি ও ক্ষীরার ওপর এমন দুর্যোগ ঘটে গেলেও কৃষি অফিসের সংশ্লিষ্ট উপসহকারিদের মাঠে দেখা যায়নি। ফলে তারা বিভিন্ন কোম্পানির ডিলারদের পরামর্শ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক ও ওষুধ ব্যবহার করছেন।
ওই ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কৃষক রুহুল আমিন বয়াতি জানান, তিনি ২০ একর জমিতে ড্রাগন জাতের তরমুজ চাষ করেছেন। ১২-১৪ দিন পরই ক্ষেত থেকে তরমুজ কাটা শুরু করতেন। ঠিক সেই মুহূর্তে ভারি বর্ষণে সব শেষ হয়ে গেছে।
বাকলা তাঁতের কাঠি গ্রামের ফিরোজ চৌধুরী ও রাধু মৃধা চরওয়াডেলের পাঁচখাজুরিয়া ও চর কচ্ছবিয়ায় মোট ২০ একর জমিতে বাঙ্গি, ক্ষীরা এবং তরমুজ চাষ করেছিলেন। তিনি ৬ হাজার মাদায় ১২ হাজার তরমুজের চারা লাগিয়েছিলেন। আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় ফলনও ভাল হয়েছিল। কিন্তু ভারি ভর্ষণে সর্বোস্ব শেষ হয়ে গেছে।
ডিয়ারা কচুয়ার ইসমাইল ব্যাপারি, জামাল মাঝি, জিন্নাহ হাওলাদার, সেলিম হাওলাদার এবং খাইরুন হাওলাদার ৭০ একর জমিতে তরমুজ, বাঙ্গি ও ক্ষীরা চাষ করেছিলেন। ফাগুনের ঘন কুয়াসার দুশ্চিন্তা কাটিয়ে ফসলের বাম্পার ফলন হওয়ায় তাদের মধ্যে আনন্দের বন্যা বইতে শুরু করেছিল। ১০-১২ দিনের মধ্যেই তরমুজ ও বাঙ্গি বাজারে তুলবেন বলে তাদের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তিু তাদের সকলেরই বিধিবাম। লঘুচাপের প্রভাবে ভারিবৃষ্টিপাত তাদের সকল আশা-আকাঙ্খা কেরে নিয়েছে।
এদিকে সাংবাদিকদের দেখে অনেক কৃষকরাই হাউ-মাউ করে কেঁদে ওঠে। দেখা গেছে, কৃষকরা দিশেহারা হয়ে তরমুজ গাছ চাঙ্গা করতে লোকজন নিয়ে ড্রামভর্তি পানিতে হরমোন (সিনজেনটার গ্রোজিন, ম্যাগমা) ও ওষুধ মিশিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু রোদ ওঠার পরপরই তরমুজ গাছ বিবর্ণ হয়ে মরে যাচ্ছে।
কৃষক রুহুল আমিন বয়াতি বলেন, আমি ১২-১৩ লাখ টাকা খরচ করছি। কোম্পানির মাইনষের কতায় দেওইর (বৃষ্টিপাত) পর গাছ চাঙ্গা করনের লইগ্যা গ্রোজিন, ম্যাগমা, ক্যারাটে, থিউবিট, ভার্টিমেঘ, স্কোর এসব ভিটামিন (হরমোন) ওষুধ দিছি। হ্যাতে কোনো উপকার অয় নাই। তরমুজে পচনও লাগজে আবার ক্ষ্যাতের মাডি হুগাইয়া চাপ ধইরগ্যা গাছও মরছে। আল্লায় জানে কি অইবে আমাগো মতো তরমুজ চাষিগো।
তিনি জানান, চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নে প্রায় অর্ধশত কৃষক লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে তরমুজ, বাঙ্গি ও ক্ষীরার চাষ করেছিলেন। একই অবস্থা পার্শ্ববর্তি দশমিনা, গলাচিপা ও রাঙ্গাবালি উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের আবাদি তরমুজসহ বিভিন্ন প্রকার রবি ফসলের।
বাউফল কৃষি অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মাঠে নেই এমন অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সারোয়ার জামান বলেন, কয়েক হাজার হেক্টর জমিতে ফ্যালন, মুগ, ভূট্টা, খেসারি, আলু, চিনাবাদাম, মরিচসহ বিভিন্ন রবি ফসলের সঙ্গে ৭৫ হেক্টরে ক্ষীরা, ৮০ হেক্টরে বাঙ্গি ও ১৫০ হেক্টর জমিতে তরমুজের চাষ করা হয়েছিল। বৃষ্টিপাতের ফলে তরমুজসহ নিচু জমির ফসলের ক্ষতি হয়েছে। কৃষি কর্মকর্তারা মাঠে গিয়ে ক্ষেতের পানি নিস্কাশনসহ তরমুজ চাষিদের নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছেন।

