দিনাজপুর পুলিশ সুপার হামিদুল আলমের মাদকের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা
শাহ্ আলম শাহী, দিনাজপুর:
দিনাজপুর পুলিশ সুপার হামিদুল আলম মাদকের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছেন। দিনাজপুরকে ২০১৭ সালের মধ্যে মাদকমুক্ত জেলা গড়ার প্রত্যয় নিয়েছেন। এ লক্ষ্যে পুলিশ ব্যাপক অভিযানের পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলেছেন।
মাদক বিক্রেতা ও মাদকসেবীদের আত্মসপর্ননের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ দিয়েছেন এই পুলিশ সুপার । ইতোমধ্যে ১১ মাসে প্রায় পাঁচ হাজার মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করেছেন।
দিনাজপুর পুলিশ সুপার কার্যালয়ের দেওয়া তথ্য মতে, ১ জুলাই থেকে ২৮ জুলাই পর্যন্ত ‘ব্লক রেইড’ নামের বিশেষ অভিযানে প্রায় এক হাজার ২’শ জন মাদক ব্যবাসায়ীকে আটক করেছে পুলিশ। এছাড়াও গতবছর আগষ্ট মাস থেকে এবছর ২৮ জুলাই পর্যন্ত প্রায় ৫ হাজার মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করেছে।
এছাড়াও মাদক সেবনের ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে দুই হাজার ৬’শ জনকে বিভিন্ন মেয়াদের সাজা দেয়া হয়েছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো. মাহফুজ্জামান আশরাফ জানান, দিনাজপুরে ইতিপূর্বে মাদক নির্মূলে এত অল্প সময়ে এত বেশি আসামী ধরা পড়েনি।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মো. মিজানুর রহমান জানান, দিনাজপুর থেকে মাদক নির্মূলের লক্ষ্যে পুলিশ সুপারের সার্বিক দিক নির্দেশনায় ২’শ থেকে আড়াই’শ পুলিশ সদস্যের বিশেষ দল নিয়ে প্রতিটি উপজেলায় গোপনে “ব্লক রেইড” অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। জিরো টলারেন্স নীতিতে এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।
বিরামপুর সার্কেলের জ্যেষ্ঠ সহকারি পুলিশ সুপার (এএসপি) মো. হাফিজুর রহমান জানান, পুলিশ সুপার হামিদুল আলম ২০১৭ সালের মধ্যে দিনাজপুরকে মাদকমুক্ত জেলা গড়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
মাদক যেহেতু একটি সামাজিক সমস্যা তাই এ সমস্যা সমাধানে সমাজের সকল শ্রেণি পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করে এবছরের জুন পর্যন্ত মাদক ব্যবসায়ী এবং মাদক সেবীদের আত্মসমর্পনের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ দেয়া হয়েছিলো। জুলাই থেকে মাদক ব্যবসা নির্মূলের লক্ষে ‘ব্লক রেইড’ অভিযান, ‘কুইক রেসপন্স টিম’ গঠন করা হয়েছে। গ্রহন করা হয়েছে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি।
মাদক নিরাময় কেন্দ্র অশ্রুর পরিচালক কাজী জাফরুল্লাহ্ জানান, দিনাজপুরে মাদকাসক্তের এ সমস্যাটি আগে শহরের মধ্যে সীমাবন্ধ ছিলো। মাদক নিরাময় কেন্দ্রের শহরের লোকেরাই চিকিৎসা গ্রহন করতো। বর্তমানে প্রত্যন্ত গ্রামের লোকেরা চিকিৎসা নিতে আসছে। এ থেকেই মাদকের ভয়াবহতা অনুমেয়।
নতুন ভূবনের পরিচালক সিদ্দুকর রহমান জানিয়েছেন, অভিভাবকদের অসচেতনতা, সামাজিক আন্দোলনের অভাব এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান না থাকায় এ সমস্যা প্রকট হয়েছে।
দিনাজপুর পুলিশ সুপার কার্যালয়ের দেওয়া তথ্য মতে, গতবছর আগষ্ট মাস থেকে এবছর জুলাই মাস পর্যন্ত মাদক ব্যবসা ছেড়ে আত্মসমর্পন করেছে ৭৬২ জন মাদক ব্যবসায়ী। এর মধ্যে স্থানীয়দের সহযোগিতায় পুলিশ পুর্ণবাসন করেছে ২’শ ৬৮ জন মাদক ব্যবসায়ীকে। পুলিশ সুপারের নিজস্ব অর্থায়ন ও তদরকিতে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে ২৭ জনকে।
বিরল উপজেলার মেরাগাঁও গ্রামের নির্মল চন্দ্র জানান, তিনি মাদক ব্যবসায়ী ছিলেন। মাদকের পাঁচটি মামলায় তিনি নিঃস্ব হয়ে পড়েন। গতবছর পুলিশ সুপারের কাছে আত্মসমর্পন করে একটি রিক্সা ভ্যান পান। গত এক বছরে তিনি ভ্যান চালিয়ে পাশাপাশি একটি ছোট হোটেল করেছেন।
বিরামপুর পৌর শহরের চকপাড়া গ্রামের তাপসী রাবেয়া (৩২) এবং নবাবগঞ্জ উপজেলার জগন্নাথপুর গ্রামের আ. মান্নানের স্ত্রী মজিদা জানান, তাঁদের স্বামী মাদক ব্যবসায়ী ছিলো। মাদকের মামলায় তাঁরা সব কিছু হারিয়ে নিঃস্ব হতে বসেছিলো। গত বছর পুলিশের কাছে আত্মসমর্পন করে সেলাই মেশিন পান তাপসী আর মজিদা। বর্তমানের সেলাইয়ের কাজ করে স্বাবলম্বী তাঁরা। একাধিক বেকার নারী তাঁদের অধিনে সেলাইয়ের কাজ করছে।
খানসামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো.সাজেবুর রহমান জানান, শুধু আইন দিয়ে মাদক নির্মূল সম্ভব নয়। বর্তমানে মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশি ব্যপক অভিযান এবং সামাজিক যে আন্দোলন গড়ে উঠছে সে সুযোগ কে কাজে লাগিয়ে মাদক নির্মূলে সকলকে এক যোগে কাজ করতে হবে। এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে।
হাকিমপুর পৌরসভার মেয়র জামিল হোসেন জানান, মাদকের সহজলভ্যতার অন্যতম উৎস স্থানীয় খুচরা ব্যবসায়ী ও বহনকারি। এরা মূলত বেকার ও অভাবি। সামান্য কিছু অর্থের লোভে এরা মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত হয়। বর্তমানে সমাজের সকল শ্রেণিপেশার লোকদের সাথে নিয়ে এ সকল মাদকের খুচর ব্যবসায়ী ও বহনকারিদের কর্মসংস্থানের যে ধারা চালু হয়েছে সেটি অব্যাহত রাখতে পারলে অচিরেই দিনাজপুরে মাদক ব্যবসা ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আসবে।
দিনাজপুর পুলিশ সুপার হামিদুল আলম জানান, দিনাজপুর একটি সীমান্তবর্তী শান্তিপূর্ণ জেলা। তিনি অনুসন্ধানে দেখতে পান এখানে সংগঠিত অপরাধের ৯৯ ভাগই মাদকের কারনে। এছাড়াও দেশের মাদকের একটি বড় অংশের চালান যেতো দিনাজপুর সীমান্ত দিয়ে। তাই তিনি যোগদান করার পর মাদক নির্মূলের ঘোষণা দেন। এ কাজে ব্যাপক অভিযানের পাশাপাশি সমাজের সকল শ্রেণিপেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করেছেন। মাদক নির্মূলে আগামীতে আরো বড় ধরনের অভিযান চালানো হবে জানান এসপি হামিদুল আলম।

