আমনের দামে ধরাশায়ী রংপুরের কৃষক
সনজিৎ কুমার মহন্ত, রংপুর প্রতিনিধি:
শেষ পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূল থাকায় চলতি মৌসুমে রংপুরে আমন ধানের বাম্পার ফলন হলেও হাসি নেই কৃষকের মুখে। ধানের ন্যায্য দাম না পেয়ে শংকায় দিন কাটছে কৃষকের।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রংপুর অঞ্চলে ধানের বাম্পার ফলন হলেও ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় এবারও ধরাশায়ী হচ্ছেন কৃষক। সরকারিভাবে ধান ক্রয়ের সিদ্ধান্ত না নিলে এবং কৃষকের খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাম নির্ধারণ না করলে এর প্রভাব পড়বে ইরি-বোরো আবাদে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফলনে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেলেও চাল আমদানী বন্ধ না করলে এবারও লোকসান গুনবে চাষীরা।
জেলা কৃষি বিপনন অধিদপ্তর জানায়, চলতি মৌসুমে আমন আবাদে কৃষকের মণ প্রতি ৭শ’ ২০ টাকা থেকে ৭শ’ ৪০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়েছে। এদিকে বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রকারভেদে প্রতি মণ ধানের বর্তমান দাম ৫শ’ ৪০ থেকে ৬শ’ ২০ টাকা মাত্র।
কৃষকরা জানিয়েছেন, বীজ বপন, শুরুর দিকে অনাবৃষ্টির ফলে সেচ দিয়ে চারা রোপণ, কাটা-মাড়াই মিলে প্রতি মণ ধান উৎপাদনে যে খরচ হয়েছে ন্যায্য দাম না পেলে লোকসানের মুখে পড়বেন তারা।
নগরীর সাহেবগঞ্জ এলাকার কৃষক আব্দুল কুদ্দুস বলেন, আমি এবার সাড়ে ৪ দোন জমিতে ধান আবাদ করেছি। বীজ বপন, পরিচর্যাসহ প্রতি দোন জমিতে খরচ হয়েছে প্রায় ৮ থেকে সাড়ে ৮ হাজার টাকা। কিন্তু বর্তমানে যে দাম তা নিয়ে চিন্তায় আছি।
একই এলাকার কৃষক মজনু জানান, এবার প্রথম দিকে বৃষ্টির পানি না থাকায় সেচ দিয়ে আমন রোপণ করা হয়েছে। বৃষ্টি না থাকায় মাজরা, পামরি ও কারেন্ট পোকার আক্রমণ ছাড়াও মজুরির দাম বৃদ্ধি পাওয়ার পরও ধানের আবাদ টিকিয়ে রেখেছি। অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে এবার উৎপাাদন খরচ হয়েছে বেশি।
কৃষকদের অভিযোগ, সরকার বেশি দামে বিদেশ থেকে চাল কিনে কম দামে বিক্রি করে বিপুল অংকের টাকা অপচয় করছে। অথচ ব্যবসায়ীরা কম দামে ধান কিনে বেশি দামে চাল বিক্রি করছে । কিন্তু সরকার যদি ধান কিনে চাল করত তা হলে বিদেশ থেকে বেশি দামে চাল কিনে কম দামে বিক্রি করতে হতো না। এতে সরকারের কোটি কোটি টাকা লোকসান গুনতে হতো না।
রংপুর কৃষি বিপনন অধিদপ্তরের মার্কেটিং অফিসার এ এস এম সরওয়ার হাসান জানান, গত বছর এই সময়ে আমনের বাজার মূল্য ছিল প্রকারভেদে ৬ শ’৮০ টাকা থেকে ৮শ’ টাকা পর্যন্ত। অথচ এ বছর সেই ধানের বাজার ৫শ’ ৪০ থেকে সাড়ে ৬শ’ ২০ টাকা। যা কৃষকের জন্য মারাত্মক ক্ষতি।
রংপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত বছর জেলায় ১ লাখ ৬০ হাজার ২০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ করে চাল উৎপাদন হয়েছে ৪ লাখ ৮০ হাজার ৭১৭ মেট্রিকটন ।
চলতি মৌসুমে ১ লাখ ৬২ হাজার ৫৭৬ হেক্টর জমিতে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে আবাদ করা হয় ১ লাখ ৫৯ হাজার ৪০৩ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে হাইব্রীড জাত ৭ হাজার ৮২৫ হেক্টর, উফসী ১ লাখ ৫০ হাজার ২৩৮ হেক্টর এবং স্থানীয় জাত ১ হাজার ৩৪০ হেক্টর। উল্লেখিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে চালের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৪ লাখ ৪২ হাজার ৮৯৭ মেট্রিকটন ।
রংপুর কৃষি উন্নয়ন ফোরামের সভাপতি আজিজুল্লাহ বলেন, সরকার কৃষকের ভাগ্য নির্ধারণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলে প্রান্তিক কৃষকরা দেশে কৃষির বিপ্লব ঘটিয়ে দিতে পারে। আর এর ফল ভোগ করবে সবাই। তিনি বলেন, কৃষক ধানের ন্যায্য মূল্য না পেলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বোরো মৌসুমে। এ জন্য ভারতীয় চাল আমদানীতে শুল্ক বৃদ্ধি করাসহ কৃষকদের কাছ থেকে ধান ক্রয়ের বিষয়ে সরকারের আরও যত্নবান হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তা নাহলে এবারও ধরাশায়ী হবেন কৃষক।
এ বিষয়ে মিঠাপুকুর উপজেলা রাইচ মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম বলেন, মিল মালিকরা ধান না কিনলে কৃষক লাভবান হতে পারবেন না। সরকার বর্তমানে ২০ শতাংশ শুল্কারোপ করে ভারত থেকে চাল আমদানী করলেও তা পর্যাপ্ত নয়। এজন্য তিনি শুল্কারোপ বৃদ্ধির দাবি জানান।

