বাকৃবিতে পূবালী ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে ঘুষের টাকা জমা দিচ্ছেন চাকরিপ্রার্থীরা!

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি:
ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে ঘুষ নেওয়ার জন্য পূবালী ব্যাংকে দুটি অ্যাকাউন্ট খোলার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বাকৃবি শিক্ষক সমিতির সাধারণ সভায় কয়েকজন শিক্ষক এমন অভিযোগ করেন।

প্রতিষ্ঠানটির কয়েকজন শিক্ষকের ভাষ্য, চাকরির জন্য ঘুষের টাকা পূবালী ব্যাংকের বাকৃবি শাখার যৌথ অ্যাকাউন্টে জমা দিচ্ছেন চাকরিপ্রার্থীরা। পরে সেই টাকা নির্দিষ্ট অনুপাতে (পারসেন্টেজ আকারে) বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ প্রশাসন, কর্মকর্তা-কর্মচারী সমিতি ও ছাত্রলীগের মধ্যে ভাগ হয়ে যাবে।

চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি বাকৃবি ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনির্বাচিত শিক্ষক সমিতির প্রথম সাধারণ সভায় কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে দুর্নীতির বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে। সেখানে দুটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের কথা বলা হয়, যার মাধ্যমে ঘুষের টাকা লেনদেন হচ্ছে বলে অভিযোগ আসে। সভায় সভাপতিত্ব করেন শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মাহফুজুল বারী।

২০১৭ সালের ১২ আগস্ট নিয়োগের সার্কুলার দেয় বাকৃবি কর্তৃপক্ষ। একই বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর ছিল আবেদনের শেষ দিন।

ওই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ৫৫টি পদে মোট ১২৩ জনকে নিয়োগ দেওয়া হবে। সেই নিয়োগের কাজ শুরু না হলেও এখন ঘুষ নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে অনেকের অভিযোগ।

২৬ ফেব্রুয়ারির সভায় সাবেক প্রক্টর ও ডেইরি সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশিদ বলেন, ‘মজার বিষয় হলো, বিশ্ববিদ্যালয় পূবালী ব্যাংকে একটা অ্যাকাউন্ট আছে, কর্মচারী বা কাদের দ্বারা ওইখানে টাকা তোলা হচ্ছে নিয়োগের জন্য। বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা আছে দায়িত্বে, তারা হেড, তারা আমার কাছে আইসা ঘুরাফেরা করছে। যেভাবেই হোক, আমি কথা বললাম। বিষয়টা যদি এই হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে টাকা নেওয়া হচ্ছে নিয়োগের জন্য, তা-ও আবার মাস্টাররোল। নতুন নিয়োগের জন্য কত টাকা নেওয়া হবে? যাকে নিয়ে জটিলতাটা ইংরেজি শিক্ষক, তাকেও নাকি বর্তমান প্রশাসনের আমলে ৭ লাখ টাকা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকতে হয়েছে।

এটা যদি খুঁজে না বের করতে পারে পূবালী ব্যাংক, তাহলে তাদের বহিষ্কার করা দরকার। তা না হলে সবাই ভাববে প্রশাসনের সকলে দুর্নীতিবাজ। আগে শোনা যেত টিফিন বাটিতে করে ভিসির বাসায় টাকা যায়।’

একই সভায় কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক মহির উদ্দীন বলেন, ‘পূবালী ব্যাংক, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শাখায় একটি নয়, দুটি অ্যাকাউন্ট খুলে মাস্টার রোল ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের জন্য টাকা নেওয়া হচ্ছে।’

সভায় সেই দুটি অ্যাকাউন্টের কথা উল্লেখ করে পোল্ট্রি বিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষক বলেন, ‘স্যার, আমাদের একজন বক্তা বললেন, আমরাও শুনছি হাটেবাজারে। পূবালী ব্যাংকে দুটি অ্যাকাউন্ট : ২৪৪৪১৪ এবং ২৪৪৪২৯। প্রশাসনের লোক এখানে আছে। প্রশাসনের লোকদের কাছ থেকে শুনতে চাই সত্য-মিথ্যা।’

পোল্ট্রি বিজ্ঞান বিভাগের ওই শিক্ষকের বক্তব্য সমর্থন করে অ্যানাটমি ও হিস্টোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমারও দাবি স্যার, এইডা।’

উপস্থিত শিক্ষক অধ্যাপক ড. জাকির হোসেন এবং অ্যানাটমি ও হিস্টোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম এই বক্তব্যের সমর্থন করেন।

পরবর্তী সময়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই সভায় উপস্থিত এক শিক্ষক অভিযোগ করে জানান, যৌথভাবে করা এই ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলোর টাকা তিনটি ভাগে ভাগ হবে। শতকরা হারে ওই ঘুষের টাকার একটা অংশ পাবে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ, আরেকটা অংশ অফিসার্স পরিষদ, তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারি পরিষদ ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারি অ্যাসোসিয়েশন এবং তৃতীয় অংশটা পাবেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা।

ওই শিক্ষক আরও অভিযোগ করেন, এই ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বাইরেও চাকরিপ্রার্থীদের টাকা দিতে হচ্ছে। না হলে অ্যাকাউন্টে টাকা জমা দিতে দিচ্ছে না। টাকা নেওয়ার জন্য দুটি অ্যাকাউন্ট করা হয়েছে। একটি কর্মকর্তা পদে চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে, অন্যটি কর্মচারী পদে চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার জন্য।

সভায় উপস্থিত আরেক শিক্ষক বলেন, ‘আমরা শুনেছি, কিছু কর্মচারী কল্যাণ সমিতি করেছে। কল্যাণ সমিতি করে (চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে) টাকা উঠাইতেছে। প্রশ্ন হলো কল্যাণের জন্য আপনি ৫০০ টাকা চাঁদা দিবেন। কিন্তু চাকরিপ্রার্থীরা কল্যাণের নামে লাখ টাকা দিবে কেন?’

ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সম্পর্কে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চাকরিপ্রার্থী বলেন, ‘পূবালী ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট সম্পর্কে তো আমি কিছু বলতে পারতেছি না। আপনারা কোনো তথ্য পাইছেন নাকি?’

‘হ্যাঁ’ উত্তর দিলে ওই চাকরিপ্রার্থী বলেন, ‘ঢাকা থেকে বলছেন, নাকি অন্য কোনো জায়গা থেকে বলছেন?’

ওই চাকরিপ্রার্থী আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি এমন, টাকা ছাড়া কোথাও কিছু হয় না। বর্তমান রেজিস্ট্রার, উপাচার্য লোক ভালো। তারা মন থেইক্যা কিছু করবার চাইলেও তো কিছু করতে পারবেন না। কারণ সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বলয়ের অধীনে। আজকে প্রত্যেক প্যাপার-পত্রিকায় আসলে যদি কিছু লেনদেন কইরাও থাহে, দেহা গেল, পরের দিন নিয়োগই পাবে না কেউ।’

বাকৃবির অফিসার্স পরিষদের সভাপতি আরিফ জাহাঙ্গীর বলেন, ‘‘ওই যে ‘একটা অ্যাকাউন্ট’ হইছে যে গোপনে? এই নম্বরটা তো আমিও খুঁচ্ছি। আমি অফিসার্স পরিষদের চেয়ারম্যান, আমার নাম আরিফ জাহাঙ্গীর। অ্যাকাউন্ট নম্বরটা আমরাও খুঁজছি, আমরাও শুনছি্ কিন্তু পাচ্ছি না।’

পূবালী ব্যাংকের সভায় উপস্থাপন করা অ্যাকাউন্ট দুটোর নম্বর শোনার পর এগুলোর সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেন আরিফ জাহাঙ্গীর। এরপর প্রতিবেদকের কাছ থেকে অ্যাকাউন্ট নম্বর নিয়ে তিনি বলেন, ‘দুইটাই কি পূবালী ব্যাংকে? ও। পূবালী ব্যাংকের ম্যানেজারকে আমরাও জিজ্ঞাসা করছি। আমাদেরকে তো বলে না।’

অ্যাকাউন্ট সম্পর্কে জানতে চাইলে বাকৃবি শাখা পূবালী ব্যাংকের ম্যানেজার উজ্জ্বল বলেন, ‘আমি একটা অ্যাকাউন্ট সম্পর্কে তথ্য দিতে পারি না। অ্যাকাউন্ট সম্পর্কে তথ্য নেওয়ার অধিকার আছে দুদক, রাজস্ব কর্মকর্তাদের।’

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আলী আকবরকে ফোন করা হলে বন্ধ পাওয়া যায়।

ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘এগুলা আমরা জানি না। এগুলা আমাদের কাজ না। আমাদের কাজ হলো পরীক্ষা হবে, ইন্টারভিউ হবে-এগুলা। এগুলা আমরা জানি না।’

 

সূত্র: প্রিয়.কম

  •  
  •  
  •  
  •  

Tags: