রাবির হাজারো শিক্ষার্থীর অভিভাবক ‘সু-পুত্র’ প্রাধ্যক্ষ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি:

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে হলের প্রাধ্যক্ষ হাজারো শিক্ষার্থীর অভিভাবক। এর একজন বন্ধুবৎসল প্রাধ্যক্ষ হল লাইফটাকে কতটা রঙিন করে দিতে পারেন তা করে দেখিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সৈয়দ আমীর আলী হলের প্রাধ্যক্ষ আমিনুল ইসলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের এই সহযোগী অধ্যাপক দায়িত্ব নেয়ার পরেই পাল্টে গেছে হলের পরিবেশ। তার কাজে প্রশংসা করে খোদ উপাচার্য এম আব্দুস সোবহান বলেছেন, ‘আমি আমীর আলী হলে সু-পুত্র বসিয়েছি। এ ধরনের লোক প্রত্যেক জায়গায় বসাতে পারলে এ বিশ্ববিদ্যালয়কে দেশের রোল মডেল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে তৈরি করতে সক্ষম হতাম।’

বেশ জোরালো প্রশংসা। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে এর প্রমাণও মিলল। এরই মধ্যে শিক্ষার্থীদের জন্য হলে রেডিও ডিভাইস, ওয়াইফাই সুবিধা, পাঠাগার সুবিধা, লাইব্রেরির বই বৃদ্ধি, খাবারের মানোন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের ব্যায়ামের জন্য জিমনেসিয়াম, মুক্তমঞ্চ তৈরিসহ নানামুখি উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।

শিক্ষার্থীদের সবচে বেশি নাড়া দিয়েছে যে বিষয়টি তা হল, অভিযোগ বক্স। দায়িত্ব নেয়ার পরপরই হলে বসিয়েছেন বক্সটি। শিক্ষার্থীদের পরিচয় গোপন রেখেও যে কোনো অভিযোগ করতে পারে এখানে। সে অনুযায়ী নেয়া হচ্ছে পদক্ষেপও। তার এমন পদক্ষেপে হলের আবাসিক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দূরত্বও কমিয়েছে অনেকে। বন্ধুসুলভ আচরণে মুগ্ধ আবাসিক শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও।

এ বিষয়ে হলের আবাসিক ছাত্র মনোবিজ্ঞান বিভাগের আব্দুর নূর সরকার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তার ওয়ালে লিখেছেন, আপনাকে (আমিনুল ইসলাম) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সৈয়দ আমীর আলী হলে প্রাধ্যক্ষ হিসেবে পেয়ে আমরা আবাসিক শিক্ষার্থীরা ধন্য। কেননা আপনি কখনো হলের প্রাধ্যক্ষ পরিচয় দেন না, আপনি আমাদের বলেন- আমি তোমাদের সেবক। আপনার সাথে হলের ডাইনিং এ বসে খাওয়ার সুযোগ হয়েছে।

এদিকে শুধু হল নয় নিজ বিভাগে সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের সাথেও বন্ধুবৎসল আচরণে মুগ্ধ শিক্ষক শিক্ষার্থীরা। এ বিষয়ে প্রাধ্যক্ষ আমিনুল ইসলাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অনেক বেশি সম্ভাবনার। তবে আমাদের শিক্ষকরাই তাদের সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারছেন না। শিক্ষক শিক্ষার্থী সম্পর্কটার অনেক বড় দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এখন শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কটা মধুর হওয়া সময়ের দাবি।

বিভিন্ন সময়ই এই শিক্ষককে দেখা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে হলের ঝোঁপঝাড় পরিষ্কারে নেমে গেছেন, কখনো খেলাধুলায় মেতে উঠছেন। আবার হলের খাবারের মান বৃদ্ধিতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ডাইনিংয়ে বসে খাচ্ছেনও প্রায়ই। কেন করছেন এতকিছু- জানতে চাইলে এই সহযোগী অধ্যাপক বলেন, আমরা যখন বিদেশে পিএইচডি করতে যাই, তখন নিজেদের খরচ মেটাতে কখনও কখনও তাদের পরিচ্ছন্নকর্মী, কখনও ট্যাক্সি ড্রাইভার হতে হয়। আমাদের দেশের লোকই সেখানে গিয়ে এই কাজগুলো করছেন অথচ দেশে আসলে নিজেদের কাজটাকে নিচু মনে করছি। এটাতেই দেশের কর্মস্থলে বড় ধরনের একটা গ্যাপ তৈরি হচ্ছে।

ড. অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম ১৯৮৫ সালে বগুড়া জেলার ধুনট উপজেলার কোনাগাতি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। লেখাপড়ার প্রত্যেক স্তরেই কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ বিভাগ সমাজবিজ্ঞান থেকে ইংরেজি মাধ্যমে ২০০৭ সালে স্নাতক ও ২০০৮ সালে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ২০০৮ সালেই প্রভাষক পদে যোগদান করেন নিজ বিভাগেই।

প্রভাষক হিসেবে যোগদানের পরই গবেষণা শুরু করেন দেশের প্রবীণদের সামাজিক অবস্থা, সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে। পরে ২০১৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ স্টাডিজ ইনস্টিটিউট থেকে ‘Role and status of Rural Elderly in Bangladesh: Patterns and Changes’ শিরোনামে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।

ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্কে আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘যেহেতু আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলের দায়িত্বে আছি সেহেতু শিক্ষার্থীদের কোন কাজকে ছোট করে না দেখার শিক্ষাটা দিতে চাইছি। যাতে আমার শিক্ষার্থীরা যেখানেই যান এই শিক্ষাটাকে কাজে লাগাতে পারেন। এই বার্তাটা আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল হলে এমনকি সারা দেশেই ছড়িয়ে দিতে চাই।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য আবাসিক হলগুলোতে শিক্ষার্থীদের যথার্থ সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে তিনি হল কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষার্থীদের পরস্পর সহযোগিতার আহ্বান জানান।

  •  
  •  
  •  
  •  

Tags: