রংপুরে তীব্র শীতে বীজতলা নষ্টের আশংকায় কৃষক
সনজিৎ কুমার মহন্ত, রংপুর প্রতিনিধি:
রংপুর অঞ্চলের কৃষকরা ব্যস্ত বোরো বীজতলা পরিচর্যায়। এ বছর ২০১৫-১৬ মৌসুমে ২৮ হাজার ৯৮২ হেক্টর জমিতে বীজ তলা তৈরি করা হয়েছে। যা গত বছরের চেয়ে ৩২১ হেক্টর বেশি। এখনও আবহাওয়া অনুকূল থাকায় কোথাও বীজতলার বড় ধরনের কোন ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তাই ভালো ফলন এবং সর্বত্র সুলভ মূল্যে বোরো চারা পাওয়া যাওয়ায় এ বছর চারা সংকটের আশংকা করছেন না বোরো চাষীরা।
তবে কিছুদিনের মধ্যে এ অঞ্চলের প্রকৃতিতে তীব্র শীত অনুভূত হওয়ার আশংকা থাকায় কৃষি বিভাগ থেকে বীজতলা রক্ষায় কৃষকদের করণীয় সম্পর্কে আগাম সতর্ক করা হচ্ছে ।
রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ ইউনিয়নের শালমারা গ্রামের কৃষক আলহাজ্ব মোঃ সুলতান আহমেদ বলেন পারিবারিক ভাবে ১৪ শতক এবং ১৫ শতক মিলে মোট ২৯ শতক জমিতে বীজতলা তৈরি করেছেন। একটিতে ৮ কেজি বিআর -২৮ অন্যটিতে ১০ কেজি হাইব্রীড বীজ বোপন করেছেন। শুধু বীজ কেনা বাবদ খরচ হয়েছে প্রায় ৪ হাজার টাকা। বীজ তলার বয়স চলছে প্রায় মাস খানিক। তিনি আশা করছেন আগামী ১৫ জানুযারী জমিতে চারা রোপন করবেন। এ জন্য এখন জমি প্রস্তুতের কাজ চলছে। তিনি আরো বলেন, সাধারণত ১ কেজি বীজে ২৫ থেকে ৩০ শতক পর্যন্ত জমিতে চাষ করা সম্ভব।
সদর উপজেলার রামনাথ মৌজার কৃষক কামুরুজ্জামান বকুল বলেন, প্রতিবছর নিজস্ব বীজ থেকে বোরো চারা করেন। এ মৌসুমে ডিসেম্বরের শুরুর দিকে ৪০ কেজি (বিরি-২৮ )বীজ তলা করেছেন। যদি বাজার থেকে শুধু বীজ কিনতেন তাহলে ১০ কেজি বীজের জন্য দাম লাগতো সাড়ে ৫শ টাকা আর যদি বিএডিসির বীজ হতো তাহলে দাম পড়তো ৩৬০ টাকা বলে তিনি দাবি করেন। প্রতি বছর তিনি চারা বিক্রির উদ্দেশ্যে বীজ তলা তৈরি করেন। এতে নিজস্ব ১শ শতক জমি আবাদ করার পরও বাড়তি চারা বিক্রি করে আর্থিক ভাবে লাভবান হওয়া যায়। তবে তিনি বলেন, আবহাওয়া ভালো থাকায় এবার সকলের বীজতলা ভালো হয়েছে। তাই চারার দাম কম। ২৫ শতক জমির জন্য চারার দাম সর্বোচ্চ বিক্রি হচ্ছে ৩শ থেকে ৪শ টাকা। এ পর্যন্ত তার খরচ হয়েছে প্রায় ৬ হাজার টাকা।
নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জ উপজেলার গাড়া গ্রামের কৃষক আলমগীর হোসেন বলেন, প্রতি বছর এ সময় বোরো চারার দাম কিছুটা কম যায়। কারণ এ সময় সকলের প্রস্তুতি থাকে। অবশ্য বৈরি আবহাওয়ার জন্য বীজতলা যদি নষ্ঠ না হয়। কিন্তু এখনও যে সব জমিতে শরিষা, আলু এবং তামাক আছে সেই ফসল উঠে গেলে অনেকেইে বোরো আবাদ করবে। তখন (ফেব্রুয়ারী মাসে) চারার দাম দোন প্রতি (১ দোন=২৫শতক) ৮শ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হবে। এদিকে বিভিন্ন জেলায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, অনেক কৃষক ভালো দাম পাওয়ার আশায় জমিতে বোরো আবাদ শুরু করে দিয়েছেন।
আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে,রংপুর অঞ্চলে ২৩ হাজার ৬৫২ হেক্টর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বীজতলা অর্জিত হয়েছে ২৮ হাজার ৯৮২ হেক্টর। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৫ হাজার ৩৩০ হেক্টর বেশি। জেলা ভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা এবং অর্জিত জমির পরিমাণ হচ্ছে রংপুর জেলায় ৬ হাজার ২২৬ হেক্টর বীজতলার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে অর্জিত হয়েছে ৭ হাজার ৩৫০ হেক্টর। এর মধ্যে হাইব্রীড ২ হাজার ২৩০ হেক্টর, উফশী ৫ হাজার১২০ হেক্টর। গাইবান্ধা জেলায় ৬ হাজার ৩ হেক্টর বীজতলার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে অর্জিত হয়েছে ৮ হাজার ৭৫ হেক্টর। এর মধ্যে হাইব্রীড ১ হাজার ৩২৫ হেক্টর, উফশী ৬ হাজার ৬৫৫ হেক্টর এবং স্থানীয় ৯৫ হেক্টর। কুড়িগ্রাম জেলায় ৫ হাজার ১৯৫ হেক্টর বীজতলার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে অর্জিত হয়েছে ৬ হাজার ৩৩৮ হেক্টর। এর মধ্যে হাইব্রীড ১ হাজার ৪৯৫ হেক্টর, উফশী ৪ হাজার ৬৫০ হেক্টর এবং স্থানীয় ১৯৩ হেক্টর। লালমনিরহাট জেলায় ২ হাজার ৩৯৯ হেক্টর বীজতলার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে অর্জিত হয়েছে ২ হাজার ৭৩০ হেক্টর। এর মধ্যে হাইব্রীড ৮শ ৯৫ হেক্টর এবং উফশী ১ হাজার ৯২৩ হেক্টর এবং নীলফামারী জেলায় ৩ হাজার ৮২৯ হেক্টর বীজতলার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে অর্জিত হয়েছে ৪ হাজার ৪৮৯ হেক্টর। এর মধ্যে হাইব্রীড ১ হাজার ৬৭৬ হেক্টর, উফশী ২ হাজার ৮১৩ হেক্টর ।
সূত্র মতে, রংপুর অঞ্চলে প্রকারভেদে আদর্শ বীজতলা আছে ১৬ হাজার ৯০৬ হেক্টর শুকনা আছে ১শ ৪১ হেক্টর এবং সাধারণ আছে ১১ হাজার ৯৩৫ হেক্টর।
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যান বিশেষজ্ঞ খোন্দকার মেসবাহুল ইসলাম বলেন, আগামীতে প্রকৃতিতে বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করতে পারে। তাই আগে থেকে কৃষকদের প্রস্তুতি থাকা সহ বিভিন্ন প্রতিরোধ মূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। কৃষকদের বীজতলা বৈরী আবহাওয়া থেকে রক্ষা করার জন্য পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা, আক্রান্ত বীজতলা পানি দিয়ে কিছুক্ষণ ডুবিয়ে রাখা এবং প্রয়োজনে চারার মধ্যে জমানো শিশির কঞ্চি অথবা শক্ত কিছু দিয়ে ফেলে দেয়ার কথা বলা হচ্ছে।
তিনি দাবি করেন সাধারণত এই তিন ধরনের ব্যবস্থা নিলে বৈরী আবহাওয়া থেকে বীজতলা রক্ষা করা সম্ভব। যদি এর পরও কৃষক উপকৃত না হন তাহলে অবশ্যই স্থানীয় কৃষি অফিসে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।
তিনি আরো বলেন, এ বছর (২০১৫-১৬)মৌসুমে রংপুর অঞ্চলে বোরে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ৫ লাখ ২ হাজার ৫২৯ হেক্টর এবং চাল উৎপাদনের লক্ষ্যামাত্রা হচ্ছে ২০ লাখ ৯৭ হাজার ২৩৪ মেট্রিক টন।

