বরেন্দ্র বীজ ভান্ডারের আর্দশ কৃষক ইউসুফের আত্মকাহিনী
মিজানুর রহমান, তানোর সংবাদদাতা:
রাজশাহীর তানোর উপজেলার দুবইল গ্রামের আদর্শ কৃষক ইউসুফ মোল্লা (৬৯)। ছোটবেলা থেকে তার টান কৃষি সর্ম্পকিত কাজের উপরে। কৃষি কাজকেই তিনি মন দিয়ে ভালোবাসেন। আর এ ভালোবাসা থেকেই কৃষি থেকে তিনি পেয়েছেন অনেক বড়-বড় সম্মননা।
তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য; ২০০৬ সালে জাতীয় পর্যায়ে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে আদর্শ কৃষক হিসাবে সনদ। এরপরে ২০১৩ সালে পরিবেশ ও বনমন্ত্রনালয় থেকে প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক পান। এর মাঝে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি গবেষনাগার, ভীজ ভান্ডার ও বিভিন্ন দেশি বিদেশী সংস্থা থেকে কৃষি ক্ষেত্রে অবদান রাখার জন্য ৫০টির বেশি কৃষি সনদ তার সাফল্যের ঝুঁড়িতে সংগ্রহে।
আদর্শ কৃষক ইউসুফ মোল্লা তার নিজ উদ্যোগে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া ৩১২ প্রজাতির ধান বীজ সংরক্ষণে রেখেছেন। দেশের ব্যক্তি উদ্যোগে এর বেশি প্রজাতির ধান বীজ অন্য কারো সংরক্ষণে নেই। এজন্য তার নাম দেয়া হয়েছে বরেন্দ্র বীজ ব্যাংক ভান্ডার।
কৃষক ইউসুফ মোল্লা জানান, বাবার মৃত্যুর পরে মাত্র ১৫ বিঘা জমি নিয়ে তার শুরু। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে তিনি ক্ষেতে ধান রোপন, হাল চাষসহ সব ধরনের কাজ করতেন। আস্তে আস্তে ধানের উপরে তার ধারণা বাড়তে থাকে। এর মাঝে কৃষিতে দেশ এগিয়ে যেতে থাকে। এ জন্য আগের ধানগুলো মানুষের মাঝ থেকে হারিয়ে যেতে থাকে।
শুধু কৃষিতে উন্নয়নই পুরানো জাতের ধান হারিয়ে যাওয়ার একমাত্র কারণ নয়। এর পেছনে আবহাওয়ার পরিবর্তন ও ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়াও অন্যতম একটি কারণ। আবহাওয়ার কারণেও মানুষকে ধানের জাত পাল্টে ফেলতে হয়েছে।
যেসব ধান হারিয়ে যায় সেগুলোর কোনো খোঁজ রাখে না কেউ। মানুষ বেশি ফলন ও দামের আশায় নতুন জাতের ধান চাষ করতে শুরু করে। সেই থেকে তার ইচ্ছে হারিয়ে যাওয়া প্রজাতির ধানগুলো সংরক্ষণে রাখার। বর্তমান সময়ে তার সংরক্ষণে ৩১২ প্রজাতির ধানের বীজ আছে। সেই বিলুপ্ত হওয়া ধান বীজ গুলোর মধ্যে রয়েছে, সতিন, ঝিঙ্গসাল, দাত খানি, রাধুনী পাগলা, বাদশা ভোগ, চিনি সংকর, কনক লতা, কাজল লতা, হরিসংকর, সিব জটা, বান কলম, ঝগড়া সাইল, রানার সাইল, অহনা, বানডুবা, দিগাবরণ, হিদা, জলডুবা প্রভূতি।
ধান বীজ সংগ্রহের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রজাতির ফলজ, ঔষুধি অনেক গাছ লাগিয়েছেন তিনি। এছাড়াও বরেন্দ্র অঞ্চলের হারিয়ে যাওয়া মাটির থালা, গ্লাস, পাথরের তালা, মাটির বৈয়ম, ডিকি, কাঠের তৈরি বিভিন্ন আসবাবপত্র, বেহালা, বাঁশের বাঁশি, হোকা, পুরানো মডেলের কাঠের তৈরি টেলিভিশন, রেডিও, তামার গহনা এবং শত বছর আগে প্রায় ২০টি দেশে ধাতব মুদ্রা সংরক্ষণ রয়েছে তার। আর কৃষির উন্নয়নে নিজ উদ্যগে একটি কৃষি স্কুলও গঠন করেছে।
তিনি আরও জানান, বীজ সংরক্ষন ও বরেন্দ্র হারিয়ে যাওয়া মূল্যবান জিনিসগুলো অতি কষ্ট করে সংরক্ষণ করেন তিনি। ভালো জায়গা না থাকার কারণে শোবার ঘর থেকে শুরু করে রান্না ঘরেও তিনি সেগুলো সংরক্ষণে রাখেন।
এইগুলো স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করতে ভালো পরিবেশ প্রয়োজন। এজন্য একটি পাকা কৃষি পণ্য সংরক্ষণ শালা নির্মাণের স্বপ্ন আছে তার। সেটিকে জাদুঘর হিসেবেও ব্যবহার করবেন বলে জানান তিনি।

