জানুয়ারিতে পাওয়া যাবে অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন
নিউজ ডেস্কঃ
যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি ও ফার্মা জায়ান্ট অ্যাস্ট্রাজেনেকার উদ্ভাবিত করোনাভাইরাস ভ্যাকসিন নিরাপদ ও কার্যকর। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম স্কাই নিউজের খবরে বলা হয়েছে, স্বতন্ত্র পর্যালোচনায় বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। গবেষণা প্রতিবেদনটি মঙ্গলবার প্রকাশিত হয়েছে মেডিসিন জার্নাল দ্য ল্যানসেটে।
এর ফলে এই ভ্যাকসিনের চূড়ান্ত ধাপে একজন অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর যে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছিল এবং তারই প্রেক্ষিতে ট্রায়াল স্থগিত রেখে পুণঃগবেষণা চালানোর ফলে চিকিৎসকমহলে যে সংশয় সৃষ্টি হয়েছিল তা কাটলো। এবং আগামী জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশ এই টিকা পাওয়ার যে আশা করা হচ্ছে তা আরো উজ্জল হল।
যদিও ওই স্বেচ্ছাসেবী যার মৃত্যু ভ্যাকসিনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় হয়েছিল বলে সন্দেহ সৃষ্টি হয় সে ব্যাপারে আগেই পরীক্ষা-নিরীক্ষায় জানা গিয়েছিল যে, তার মৃত্যু ভ্যাকসিনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় নয়, আগে থেকেই অন্য রোগে আক্রান্ত থাকায় সেই রোগই মৃত্যুর কারণ।
তারপরেও অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন ট্রায়াল স্থগিত রেখে আরো ব্যাপক ভিত্তিক ডেটা কালেকশন এবং গবেষণা করেন বিশ্বখ্যাত ভাইরোলজিস্ট অক্সফোর্ডের অধ্যাপক ড. সারাহ গিলবার্টের নেতৃত্বাধীন গবেষকরা। সর্বশেষ মঙ্গলবার মেডিসিন জার্নাল দ্য ল্যানসেটে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি ও ফার্মা জায়ান্ট অ্যাস্ট্রাজেনেকার উদ্ভাবিত করোনাভাইরাস ভ্যাকসিন নিরাপদ ও কার্যকর বলে উল্লেখ করায় গবেষকরা বলছেন, করোনা মহামারিতে এই সফলতার বড় ধরনের প্রভাব থাকবে। অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের চূড়ান্ত পর্বের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের এটিই প্রথম পিয়ার-রিভিউড বিশ্লেষণ।
এদিকে করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় আগামী জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশ পাচ্ছে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তৈরি করোনার ভ্যাকসিন। এ লক্ষ্যে জরুরি প্রয়োজনে ও জনস্বার্থে করোনা মোকাবিলায় অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তৈরি ভ্যাকসিন ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া থেকে প্রথম ধাপে তিন কোটি ডোজ ভ্যাকসিন কেনার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
অন্যদিকে বিজ্ঞানীরা ভ্যাকসিনের বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নিজেদের মধ্যে তথ্য বিনিময় করছেন। তাদের প্রত্যাশা, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যুক্তরাজ্যে ভ্যাকসিনটি ব্যবহারের অনুমোদন পাবে।
এরইমধ্যে যুক্তরাজ্য ও ব্রাজিলে প্রায় ১২ হাজার স্বেচ্ছাসেবক ভ্যাকসিনটির ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অংশ নিচ্ছেন। পরীক্ষার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এটি ৭০ দশমিক চার শতাংশ কার্যকর। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া যে গোষ্ঠী দুটি ডোজ নিয়েছেন তাদের ক্ষেত্রে কার্যকারিতার হার ৬২ দশমিক এক শতাংশ। কিন্তু দুর্ঘটনাবশত যে গোষ্ঠী প্রথমবার অর্ধেক ডোজ এবং পরে পূর্ণাঙ্গ ডোজ নিয়েছেন তাদের ক্ষেত্রে কার্যকারিত ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ছুঁয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে পরীক্ষার ফলাফলের তথ্য অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে।
অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন গ্রুপের পরিচালক ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রধান তদন্ত কর্মকর্তা অধ্যাপক অ্যান্ড্রিউ পোলার্ড বলেন, আজ আমরা চূড়ান্ত পর্বের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মধ্যবর্তী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছি। এতে দেখা গেছে, করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে নতুন ভ্যাকসিনটির সুরক্ষা ও কার্যকারিতা ভালো। পোলার্ড আরো বলেন, ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অংশ নেওয়া স্বেচ্ছাসেবকদের প্রতি আমাদের অশেষ কৃতজ্ঞতা। তারা এই মাইলফলক অতিক্রম করার ক্ষেত্রে আমাদের সঙ্গে গত আট মাস কাজ করেছেন।
খবরে বলা হয়েছে, এই ভ্যাকসিনটির উৎপাদনে খরচ কম এবং অল্প ব্যয়ে বিপুল সংখ্যক ডোজ উৎপাদন করা যাবে। ফাইজার-বায়োএনটেকের ভ্যাকসিনের মতো এটিতে অতিরিক্ত শীতল তাপমাত্রায় রাখতে হবে না। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ভ্যাকসিনোলজি বিভাগের অধ্যাপক সারাহ গিলবার্ট প্রতিবেদন প্রকাশের দিনকে ‘সম্ভবত ২০২০ সালের সেরা দিন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের আগে একাধিক প্রয়োগে ভ্যাকসিনটি কার্যকর বলে দেখা গেছে। এখন আমরা স্পষ্টভাবে কার্যকারিতা প্রমাণ পেয়েছি পিয়ার-রিভিউড প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ায়। সারাহ গিলবার্ট আরো বলেন, এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার পর্যালোচনা বাকি। আমরা আশা করছি দ্রুতই ভ্যাকসিনটি মানুষের জীবন বাঁচানো শুরু করবে। যুক্তরাজ্য অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের দশ কোটি ডোজ কেনার অর্ডার দিয়ে রেখেছে।
আর অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তৈরি ভ্যাকসিন কিনতে বাংলাদেশ সরকারের খরচ হবে এক হাজার ৫৮৯ কোটি ৪৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। ফলে প্রতি ডোজ ভ্যাকসিনে খরচ হবে ছয় দশমিক ২৫ ডলার (প্রায় ৫৬০ টাকা)। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বেক্সিমকো ও ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে বাংলাদেশে করোনার ভ্যাকসিন আনা হচ্ছে। আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে এ ভ্যাকসিন দেশে আসা শুরু হতে পারে। প্রথমে তিন কোটি ডোজ আনা হবে।
ভ্যাকসিন রাখা হবে বেক্সিমকোর গুদামে। ভারত যে দামে ভ্যাকসিন পাবে সিরাম ইনস্টিটিউট বাংলাদেশকেও একই দামে তা দেবে বলে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ভ্যাকসিন প্রত্যেক মানুষের জন্য দু’টি করে ডোজ দেওয়া হবে। দেড় কোটি মানুষকে ২৮ দিন পর পর এ ডোজ দেওয়া হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন সাপেক্ষে বাংলাদেশে আমদানি করতে চুক্তিতে শর্ত রয়েছে। এ
জন্য গত বুধবার পিপিএ-২০০৬ এর ধারা ৬৮ (১) অনুযায়ী জরুরি প্রয়োজনে ও জনস্বার্থে করোনা মোকাবিলায় ভ্যাকসিন (অক্সফোর্ড এস্ট্রোজিঙ্কা ভ্যাকসিন, সার্স-কভ-২ এজেডডি ১২২২) সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন ক্রয়ের নীতিগত অনুমোদন দেয় অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১০ নভেম্বর অর্থ বিভাগে ভ্যাকসিন ক্রয় ও আনুষাঙ্গিক ব্যয়সহ মোট এক হাজার ৫৮৯ কোটি ৪৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা বরাদ্দ চাওয়া হলে অর্থ বিভাগ থেকে ১৫ নভেম্বর প্রাথমিক বরাদ্দ হিসাবে ৭৩৫ কোটি ৭৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ পাওয়া যায় যা রাজস্ব বাজেটে অন্তর্ভূক্ত। অর্থের উৎস জিওবি। ভ্যাকসিন ক্রয়ে ক্রয় কার্যালয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রধান মহাপরিচালক কৃর্তক ক্রয় পরিকল্পনা অনুমোদন করা হয়েছে।

