ভার্চুয়াল বইমেলা চায় বাংলা একাডেমি

নিউজ ডেস্কঃ

গত বছর অমর একুশে বইমেলা শেষ হওয়ার পর থেকেই করোনা পরিস্থিতি পাল্টে দেয় বাংলাদেশের চিত্র। এ কারণে তখন থেকেই অনিশ্চয়তায় ছিলো ২০২১ সালের আয়োজন। তবু আশায় বুক বেঁধেছিলেন লেখক-পাঠক ও প্রকাশকরা। ধারণা ছিলো ততদিনে সঙ্কট কেটে যাবে। আর মেলার আয়োজনও হবে বরাবরের মতো।

এবার করোনার দ্বিতীয় ঢেউ নতুন করে নাড়িয়ে দিয়েছে বিশ্বকে। বাংলাদেশেও জেঁকে বসেছে শীত। এতে পরিস্থিতির অবনতির শঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। এসব অনিশ্চয়তা সামনে রেখেই যথানিয়মে মেলা আয়োজনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছিলো বাংলা একাডেমি। এ বছর নির্দিষ্ট সময়ের আগেই প্রকাশকদের থেকে চাওয়া হয় আগ্রহপত্র। এর ওপর ভিত্তি করে বইমেলার পরিকল্পনা তৈরি করে প্রতিষ্ঠানটি।

তবে বাংলা একাডেমির একটি প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে ভার্চুয়াল জগতে তৈরি হয়েছে তোলপাড়। বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে প্রস্তাব রাখা হয়, অমর একুশে বইমেলা ২০২১ হবে ভার্চুয়াল প্লাটফর্মে। গণমাধ্যমে এই সংবাদ প্রচার হওয়ার পর লেখক, প্রকাশক ও পাঠকদের মধ্যে শুরু হয় মিশ্র প্রতিক্রিয়া। ভার্চুয়াল মেলার বিরোধীতা করে গতকাল গণমাধ্যমে যৌথ বিবৃতি পাঠিয়েছে প্রকাশকদের দুইটি সমিতি ‘বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি’ এবং ‘বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি’। তাদের দাবি, বাংলা একাডেমি তাদের সঙ্গে আলোচনা না করেই এই প্রস্তাব তৈরি করেছে।

অন্যদিকে প্রকাশক ও লেখকদের কেউ কেউ বাংলা একাডেমির প্রস্তাবকে সময়োপযোগী বলে উল্লেখ করেছেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলা একাডেমি সঠিক প্রস্তাব রেখেছে বলেই মত প্রকাশ করেছেন তারা।

ভার্চুয়াল প্রস্তাবনার ব্যাপারে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বাংলা একাডেমি কেবল এই প্রস্তাবনা তৈরি করেছে। এটি চূড়ান্ত নয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়।

তবে ‘বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি’ এবং ‘বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি’র পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, বাংলা একাডেমি এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে কোনো কথ বলেনি। গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে প্রকাশক নেতারা বলেন, ‘বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ একতরফা মিটিংয়ে আসন্ন অমর একুশে বইমেলা ২০২১ স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বইমেলার সার্বিক দায়িত্বপ্রাপ্ত ‘অমর একুশে বইমেলা পরিচালনা পর্ষদ বিষয়টি ওয়াকিবহাল নয়।’

অন্যদিকে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী বলেছেন, ‘ফেব্রুয়ারিতে ভার্চুয়াল বইমেলার আয়োজন করা যায় কি না ভেবে দেখা হচ্ছে মাত্র। আর আয়োজন করলে সেটা কোন ফরমেটে হবে সেই সিদ্ধান্তটাও পরে আসবে। প্রকাশকসহ সব পক্ষ যেভাবে চায়, সেভাবেই আয়োজন হবে।’

তিনি জানান, করোনা পরিস্থিতি অনুকুলে আসার পর বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মেলার আয়োজন করা যায় কি না সে বিষয়েও ভাবা হচ্ছে। ফেব্রুয়ারিতে ভার্চুয়াল মেলা অনুষ্ঠিত হওয়ার পরও সেই আয়োজন করা যেতে পারে। আজ বাংলা একাডেমিতে এ বিষয়ে বৈঠক হতে পারে বলে জানা গেছে।

প্রকাশক সমিতির বিবৃতি উদ্বৃত করে জিজ্ঞেস করা হলে ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশ এর প্রকাশক জহিরুল আবেদিন জুয়েল আজকালের খবরকে বলেন, ‘এটা নেতাদের সিদ্ধান্ত। সব প্রকাশক যদি মেলা করতে চায়, তাহলে মেলা হবে। ’

তিনি বলেন, ‘আমার ব্যক্তিগত মত হলো করোনা পরিস্থিতিতে ফিজিক্যালি মেলার আয়োজন না করাটাই ভালো হবে। যা করতে হবে সেটার পরিণতি নিয়ে আগেই ভাবতে হবে। বইমেলা শুরু করে যদি পরিস্থিতির কারণে বন্ধ করে দিতে হয়, সেটা সবার জন্যই খারাপ হবে। কাজেই ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।’

জুয়েল মনে করেন, প্রকাশনা শিল্পকে ডিজিটালাইজড করার বড় সুযোগ এনে দিয়েছে করোনা পরিস্থিতি। এই সঙ্কটকে উৎরে যাওয়ার মাধ্যম হতে পারে ভার্চুয়াল বইমেলা। তবে অল্প সময়ের মধ্যে বাংলা একাডেমি কতটা মাঠ তৈরি করতে পারবে তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন তিনি।

জহিরুল আবেদিন জুয়েল প্রশ্ন রাখেন, ‘একটা স্টলের বইকর্মী যদি করোনায় আক্রান্ত হন তাহলে প্রতিটা কর্মীকেই কোয়ারেন্টাইনে পাঠাতে হবে। সঙ্গে প্রকাশককেও থাকতে হবে কোয়ারেন্টাইনে। তখন মেলায় স্টল চালাবে কে?’

তিনি যোগ করেন, ‘কোনো স্টলে একজন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন, এমন খবর রটে গেলে পুরো মেলার আয়োজন পন্ড হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।’

এ বিষয়ে একই মত প্রকাশ করেন অ্যাডর্ন পাবলিকেশন এর প্রকাশক সৈয়দ জাকির হোসাইন। তিনি বলেন, ‘নয়া স্বাভাবিক জীবনে, ভার্চুয়াল মেলা সময়ের দাবি। চর্চার দাবি। পেশার দাবি। জীবন-জীবিকার দাবি। মানুষকে কোনো না কোনোভাবে চলমান রাখতে হবে। ভার্চুয়াল প্লাটফর্ম এর ভালো মাধ্যম হতে পারে। প্রকাশকরা যদি চলমান থাকতে না পারি, তাহলে পাঠককে এর সঙ্গে রাখা যাবে না।’

ভার্চুয়াল মেলার আয়োজন হলে সেটা কতটা ফলপ্রসু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, এই প্রশ্নের জবাবে সৈয়দ জাকির হোসাইন বলেন, ‘এ বিষয়টা নির্ভর করবে বাংলা একাডেমির ইচ্ছা এবং দক্ষতার ওপর। বাংলা একাডেমিকে একমুখী সিদ্ধান্ত নিলে চলবে না। এর সঙ্গে সবাইকে যুক্ত রাখতে হবে। নাহলে ভার্চুয়াল মেলা কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হতে পারে। আমি আশা করব এমনটা যেন না হয়।’

তিনি বলেন, ‘এটা যেন ফিজিক্যালি মেলার চাইতে বেশি কার্যকর হয়, এমনটা আশা করি। পাঠকের কাছে যেন বই ঠিকমতো পৌঁছে সে দিকটা বাংলা একাডেমিকে খেয়াল রাখতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘বাংলা একাডেমি চাইলে ডাক বিভাগকে কাজে লাগাতে পারে। বাংলা একাডেমি ও প্রকাশক সমিতি যদি অনুরোধ করে তাহলে আমার বিশ্বাস ডাক বিভাগকে এর সঙ্গে যুক্ত করা যাবে। এর মাধ্যমে বইমেলা গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে বলে আমি মনে করি।’

ভার্চুয়াল বইমেলার ব্যাপারে দু’টি প্রকাশক সমিতির অবস্থান এবং বিবৃতির বিষয়ে তিনি তিনি বলেন, ‘আমি তাদেরকে স্বাভাবিক বোধ থেকে চিন্তা করতে অনুরোধ করবো।’

প্রকাশক সৈয়দ জাকির হোসাইন বলেন, ‘যেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা নেই, সেখানে ফিজিক্যাল বইমেলা সফল হওয়ার সম্ভাবনা আমি দেখছি না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা মেলা সফল হওয়ার অন্তরায়। সরকার যদি বলে জানুয়ারিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেবে, তাহলে আমার ধারণা একাডেমি পুনঃর্বিবেচনা করবে।’

তিনি বলেন, ‘মেলায় যে পরিমান বইকর্মীর দরকার হয়, এর জন্য আমাদেরকে আউটসোর্সিং করতে হয়। করোনা পরিস্থিতিতে বাইরের কর্মী খুঁজে পাওয়া কঠিন। আবার একজন কর্মী আক্রান্ত হলে গোটা দলকেই কোয়ারেন্টাইনে যেতে হবে।’

জাকির হোসাইন একটি বিকল্প প্রস্তাব রেখে বলেন, ‘শতভাগ ভার্চুয়াল না করে ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতিটি প্রকাশনা সংস্থার জন্য একটি করে বুথ রাখা যেতে পারে। যেখানে তাদের প্রতিটি বইয়ের একটি করে কপি থাকবে। এগুলো দেখে অর্ডার করা হবে। আবার অনলইনেও অর্ডারের ব্যবস্থা থাকবে। আর এসব বই হোম ডেলিভারির ব্যবস্থা করা হবে।’

তিনি মনে করেন, এবার ভার্চুয়াল আয়োজন করা হলে পুরো দেশকে বইমেলার অংশ হিসেবে তৈরি করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী এর প্রচার করাও সম্ভব।’

প্রকাশক সমিতির উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘এই সময়ের মধ্যে প্রকাশক সমিতিও তাদের ওয়েবসাইটে সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর পূর্ণাঙ্গ প্রোফাইল তৈরি করে নিতে পারে। এতে প্রকাশিত সকল বইয়ের তালিকা থাকবে। এই তালিকা ভবিষ্যতেও কাজে দেবে।’

ভার্চুয়াল মেলার তীব্র বিরোধীতা করে প্রতিভা প্রকাশ এর প্রকাশক মঈন মুরসালিন বলেন, ‘পেশাদার প্রকাশকরা ফিজিক্যাল মেলা চাইবেন, এটাই স্বাভাবিক। এবার ভার্চুয়ালের পক্ষে আমরা নই।’

তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রকাশক সমিতির সদস্যদের আজ বসার কথা রয়েছে।

মঈন মুরসালিন বলেন, ‘আমরা চ্যালেঞ্জ নিতে চাই। ঝুঁকি নিতে চাই। আমরা চাই আমাদের প্রাণের বইমেলা হোক। লেখক-পাঠকের সমাগম হোক। এতে প্রকশকরাও বিক্রির ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারবেন।’

করোনার ঝুঁকি মাথায় নিয়ে মেলা হোক, এমনটা চান না পাঠকপ্রিয় তরুণ লেখক ইশতিয়াক আহমেদ। বিকল্প হিসেবে ভার্চুয়াল মেলার আয়োজন হলে প্রকাশনা শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলেও মনে করেন তিনি। এতে লেখক-পাঠকের আগ্রহে ভাটা পড়বে।

প্রতি বছর বইমেলায় ইশতিয়াক আহমেদের বই প্রকাশ হয়। তরুণ এই লেখকের বই কিনতে মেলায় পাঠকের সমাগম দেখা যায়। এ বছর মেলার আয়োজন স্থগিত হলে যে বইটি লিখছিলেন সেটির কাজ বন্ধ করে দেবেন বলে জানান তিনি।

ইশতিায়াক আহমেদ বলেন, ‘বিকল্প হিসেবে ভার্চুয়াল মেলার আয়োজন হলেও সেটা জমজমাট হওয়ার কথা নয়। এতে লেখক, প্রকাশক এবং পাঠক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অনেক লেখক, পাঠক এমনকি প্রকাশকও ডিজিটাল প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত নয়।’

করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন?
ইশতিয়াক আহমেদ বললেন, ‘মেলা পিছিয়ে দেয়া যেতে পারে। গত বছর বইমেলাকে মার্চ মাসে টেনে নেওয়া হয়েছে। এ বছর আয়োজনটাই শুরু হতে পারে আরো পরে।’

তবে ওই সময় ঝড়-বৃষ্টির ঝুঁকি থেকে যায়। এমন মৌসুমে মেলায় স্টল টিকিয়ে রাখা কতটা সম্ভব?
জবাবে তিনি বললেন, ‘কোনো না কোনো একটা দিকে তো ছাড় দিতেই হবে। তবে আমার বিশ্বাস মেলার আয়োজন হলে, পাঠকের সমাগমও হবে।’

  •  
  •  
  •  
  •  

Tags: