শ্বাসতন্ত্রের পাশাপশি মস্তিষ্কে আক্রমণ করছে করোনা: গবেষণা

করোনা থেকে সেরে ওঠা এক তৃতীয়াংশ মানুষ দীর্ঘমেয়াদি স্নায়বিক ও মানসিক সমস্যায় ভুগছেন বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে। ল্যানসেন্ট সাইকিয়াট্রি জার্নালে এ বিষয়ক গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে। যাতে উঠে এসেছে, করোনা থেকে সেরে ওঠার ছয় মাসের মধ্যে ৩৪ শতাংশ রোগীর স্নায়বিক ও মানসিক সমস্যা দেখা গেছে।

গবেষকেরা যুক্তরাষ্ট্রের ৬ কোটি ৯০ লাখ মানুষের ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। এর মধ্যে ৬২ হাজার কোভিড-১৯ রোগীর তথ্যও রয়েছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ১৭ শতাংশের মধ্যে পাওয়া গেছে উদ্বেগ উৎকণ্ঠাজনিত সমস্যা। আর মেজাজ নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারার সমস্যায় ভুগছেন ১৪ শতাংশ।

গবেষণায় দেখা গেছে, কোভিড-১৯ থেকে সেরে ওঠা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে যাঁদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা ধরা পড়তে দেখা যায়, তাঁদের উদ্বেগ, হতাশা ও অনিদ্রার মতো সাধারণ সমস্যা ছিল। গবেষকেরা বলেন, তাঁদের ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিহারানোর মতো মস্তিষ্কের রোগের ঝুঁকি বাড়তে দেখা যায়।

নতুন করে গত ছয় মাসে কোভিড-১৯ আক্রান্ত ব্যক্তিদের উপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, আক্রান্তদের মধ্যে মানসিক অবসাদ, ডিমেনশিয়া, সাইকোসিস এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি তৈরি হবার সম্ভাবনা রয়েছে।

ন্যাচার জার্নালে প্রকাশিত নিউজ আর্টিকেলে বলা হয়, কোভিড-১৯ আমাদের মস্তিস্কে আক্রমণ মস্তিস্কের ক্ষতি করতে পারে। এর আগে যারা কোভিড আক্রান্ত হয়েছে তাদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশের ক্ষেত্রে মানসিক এবং মস্তিস্কের নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে। কিন্তু যারা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল কিংবা নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসা নিতে হয়েছিল তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি বেশি। কেন, কিভাবে- এই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছে গবেষকরা।

মানসিক অবসাদ এবং যে কোন কিছু নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হবার মতো বিষয়গুলো কোভিড ১৯ রোগীদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি হয়েছে। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষকরা বলছেন, কোভিড আক্রান্ত হয়ে যারা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল এবং বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েছিল তাদের ক্ষেত্রে মানসিক অবসাদ, অস্বস্তি এবং ভয় তৈরি হয়।

গবেষকরা এই সিদ্ধান্ত উপনীত হয়েছেন যে, কোভিড আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে পরবর্তীতে শ্বাসযন্ত্র-জনিত সমস্যা না হয়ে মস্তিস্ক-জনিত সমস্যা হতে পারে। যারা কোভিডে আক্রান্ত হয়েছিলেন তাদের মধ্যে ১৬ শতাংশের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরণের মানসিক সমস্যা তৈরি হয়েছিল। যেসব কোভিড আক্রান্ত রোগীর অবস্থা যত বেশি খারাপ ছিল তাদের ক্ষেত্রে পরবর্তীতে মানসিক সমস্যা এবং ব্রেইন ডিসঅর্ডার তত বেশি তৈরি হয়েছে। সূত্র: বিবিসি

অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির নিউরোলজির অধ্যাপক মাসুদ হোসেইন বলেন, এমন প্রমাণ রয়েছে যে করোনাভাইরাস সরাসরি মস্তিষ্কে ঢোকে এবং ক্ষতি করে। এর পরোক্ষ প্রভাবও থাকতে পারে। যেমন রক্ত জমাট বাঁধা, যার ফলে স্ট্রোক হতে পারে।

লন্ডনের কিংস কলেজের ইন্সটিটিউট অব সাইকিয়াট্রি, সাইকোলজি এন্ড নিউরোসায়েন্সের অধ্যাপক ডেইম টিল ওয়াইকেস বলেন, আমাদের সন্দেহ ছিল কোভিড১৯ শুধু শ্বাসতন্ত্র জনিত সমস্যা নয়। এই রোগ মানসিক এবং মস্তিষ্কের সাথে সম্পর্কযুক্ত। নতুন গবেষণায় এটি প্রমাণিত হয়েছে।

চিকিৎসকদের বক্তব্য, রোগের ছোবলের অজানা পরিণাম ও মৃত্যুভয়ের পাশাপাশি আর্থা-সামাজিক টানাপোড়েন যেমন আছে এই সব মনোবিকারের নেপথ্যে, তেমনই আবার মস্তিষ্ক ও স্নায়ুর উপর নভেল করোনাভাইরাসের প্রত্যক্ষ নিউরো-সাইকিয়াট্রিক প্রভাবও এর জন্য দায়ী। ফলে, অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার, প্যানিক অ্যাটাক, অবসাদ, পিটিএসডি, ম্যানিয়া- এইসব দেখা যাচ্ছে সব বয়সের করোনাজয়ীদের একাংশের মধ্যে। আর বয়স্ক কোভিডমুক্তদের মধ্যে এর সঙ্গেই দেখা যাচ্ছে স্মৃতিভ্রংশ, বিভ্রম ও মানসিক বিভ্রান্তির মতো গুরুতর অসুখ। সব মিলিয়ে, মারাত্মক ভাবে ব্যাহত হচ্ছে তাঁদের স্বাভাবিক জীবনের ছন্দও। সূত্র: এই সময়

  •  
  •  
  •  
  •