টাইমস হায়ার এডুকেশন ওয়ার্ল্ড র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

ড. মোঃ আলমগীর হোসেন

টাইমস হায়ার এডুকেশন ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‍্যাঙ্কিং ২০২২ এ  প্রথম বারের মত স্থান করে নিয়েছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।  এ তালিকায় স্থান পাওয়া বাংলাদেশের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। প্রথম স্থানে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) এবং তৃতীয় স্থানে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)।

কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত তিন দিন ব্যাপি THE World Academic Summit 2021 এর প্রথম দিনে বাংলাদেশ সময় ২ সেপ্টেম্বর ভোর ৫ টায়  টাইমস হায়ার এডুকেশন ওয়ার্ল্ড  ইউনিভার্সিটি র‍্যাংকিং ২০২২ প্রকাশিত হয়। টাইমস হায়ার এডুকেশন এবছর বিশ্বের ৯৯ টি দেশ ও অঞ্চলের  ১৬৬২ টি বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা  প্রকাশ করেছে। যুক্তরাজ্যের  অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বরাবরের মত এবারও বিশ্বে সবার শীর্ষে রয়েছে! সেরা দশের তালিকায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ৮ টি বিশ্ববিদ্যালয় (ক্যালটেক, হার্ভার্ড, স্ট্যানফোর্ড, এম আই টি, প্রিন্সটন, ক্যালিফোর্নিয়া, ইয়েল এবং শিকাগো) এবং যুক্তরাজ্যের ২ টি বিশ্ববিদ্যালয় (অক্সফোর্ড এবং ক্যামব্রিজ)। এবারের রাঙ্কিং এ যুক্তরাষ্ট্রের ১৮৩, জাপানের ১১8, যুক্তরাজ্যের ১০১,  চীনের ৯৭,  ভারতের ৭১,  স্পেনের ৫২,  জার্মানির ৫০,  অস্ট্রেলিয়ার ৩৭, দক্ষিন কোরিয়ার ৩৬, কানাডার ৩২, মিশরের ২৩, পাকিস্তানের ২১,  মালয়শিয়ার ১৮,  সৌদি আরবের ১৫, সুইডেনের ১২, সুইজারল্যান্ডের ১১, অস্ট্রিয়ার ১১, বেলজিয়ামের ৯, নিউজিল্যান্ডের ৮, ডেনমার্কের ৭ টি  সহ মোট ১৬৬২টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান করে নিয়েছে।

বাংলাদেশ থেকে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এর গ্লোবাল র‍্যাঙ্ক  ১০০১–১২০০। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৮০১–১০০০ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ১২০১+ । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ২০১৬ এর র‍্যাঙ্কিং এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় গত বছরের র‍্যাঙ্কিং এ প্রথমবারের মতো জায়গা করে নিয়েছিল। তবে ২০১৭ ও ২০১৯ এর র‍্যাঙ্কিং তালিকায় আমাদের দেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়েরই অবস্থান ছিল না। তাই টাইমস হায়ার এডুকেশন ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‍্যাঙ্কিং এ সর্বদা অবস্থান ধরে রাখা ও এর উন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনসহ সবাইকেই কাজ করে যেতে হবে।

একজন ছাত্র উচ্চশিক্ষার জন্য কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবেন, শিক্ষক/ গবেষক কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াবেন বা গবেষণা করবেন, অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ কোথায় অর্থ বরাদ্দ দিতে পছন্দ করবে, নীতি নির্ধারকগণ বিশ্ববিদ্যালয় এর মান উন্নয়নে কি ধরনের পরিকল্পনা প্রণয়ন করবেন, স্কলারশিপ প্রাপ্তি, বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক মূল্যায়ন ইত্যাদিতে এই র‍্যাঙ্কিং বিশেষ ভূমিকা রাখে। সারাবিশ্বে মূলত টাইমস হায়ার এডুকেশন, কিউ এস এবং সাংহাই এই তিনটি গ্লোবাল র‍্যাঙ্কিং এর ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা থাকলেও টাইমস হায়ার এডুকেশন কর্তৃক প্রণীত বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাঙ্কিং সারা বিশ্বে ছাত্র, শিক্ষক, গবেষক, প্রতিষ্ঠান নির্বাহী, ইন্ডাস্ট্রি, এবং নীতি নির্ধারক গণ কর্তৃক সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ও সবচাইতে প্রভাবশালী র‍্যাঙ্কিং । বাংলাদেশ সরকারও বিভিন্ন স্কলারশিপ (যেমন প্রধানমন্ত্রী ফেলোশিপ) এর জন্য স্কলার নির্বাচনে একমাত্র টাইমস হায়ার এডুকেশন এর র‍্যাঙ্কিং এ প্রথম দিকে থাকা বিশ্ববিদ্যালয় সমূহে ভর্তির বিষয়টিকেই বিবেচনায় নিয়ে থাকে।

লন্ডন-ভিত্তিক প্রভাবশালী টাইমস হায়ার এডুকেশন ম্যাগাজিন ২০০৪ সাল থেকে কিউ এস এর সাথে যৌথভাবে বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাঙ্কিং প্রকাশ করছে। ২০০৯ থেকে কিউ এস এবং টাইমস হায়ার এডুকেশন আলাদাভাবে র‍্যাঙ্কিং করে আসছে। তবে টাইমস হায়ার এডুকেশন ২০০৯ থেকে ২০১৩ এ থমসন রয়টার্স এর সাথে এবং ২০১৪ থেকে অদ্যাবধি এলসেভিয়ের এর সাথে পার্টনারশিপে এই র‍্যাঙ্কিং প্রকাশ করে আসছে।

টাইমস হায়ার এডুকেশন এর র‍্যাঙ্কিং তালিকায় কোন বিশ্ববিদ্যালয়কে থাকতে হলে যে বিষয়গুলো মূলত খেয়াল রাখতে হবে –

(১) বিগত পাঁচ বছরে কমপক্ষে ১০০০ এবং বছরে কমপক্ষে ১৫০ টি স্কোপাস ইন্ডেক্সড প্রকাশনা থাকতে হবে।

(২) বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কেন্দ্রিকতা একাধিক বিষয়ের উপর হতে হবে ।

(৩) বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক টাইমস হায়ার এডুকেশন ডাটা পোর্টালে  নিয়মিত তথ্যাদি প্রদান করতে হবে, ইত্যাদি।

টাইমস হায়ার এডুকেশন শিক্ষা, গবেষণা, সাইটেশন, ইন্টারন্যাশনাল আউটলুক এবং ইন্ডাস্ট্রি ইনকাম এই ৫ টি পিলারের ১৩ টি নির্দেশকসমূহে প্রাপ্ত স্কোর থেকেই র‍্যাঙ্কিং করে থাকে। শিক্ষার ক্ষেত্রে মোট স্কোর (৩০%) এর মধ্যে প্রতিষ্ঠানের টিচিং রেপুটেশন (১৫%), ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত (৪.৫%), পিএইচডি ছাত্র-ব্যাচেলর ছাত্রের অনুপাত (২.২৫%), প্রদান-কৃত ডক্টরেট ডিগ্রী ও শিক্ষকের অনুপাত (৬%), শিক্ষক প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট অর্থ বরাদ্দ (২.২৫%); গবেষণার ক্ষেত্রে মোট স্কোর (৩০%) এর মধ্যে গবেষণা রেপুটেশন (১৮%), শিক্ষক প্রতি বরাদ্দ গবেষণা ফান্ড (৬%), শিক্ষক/গবেষক প্রতি প্রকাশনার সংখ্যা (৬%); এবং ইন্টারন্যাশনাল আউটলুক এর ক্ষেত্রে মোট স্কোর ৭.৫%, যার মধ্যে দেশি-বিদেশি ছাত্রের অনুপাত ২.৫%, দেশি-বিদেশি শিক্ষকের অনুপাত ২.৫%, ও মোট প্রকাশনায় বিদেশি অথর সংখ্যা/ ফরেন কোলাবোরেশন ২.৫%।

টাইমস হায়ার এডুকেশন নিন্মোক্ত তিনটি উৎস থেকে ডাটা সংগ্রহ করে এবং নির্দিষ্ট মেট্রিক্স এ স্কোর হিসাব করে র‍্যাঙ্কিং করে থাকে। (১) টাইমস হায়ার এডুকেশন পোর্টালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যাদি। (২) এলসেভিয়ের (Elsevier)  কর্তৃক রেপুটেশন সার্ভে এবং (৩) স্কোপাস ডাটাবেজ।

কোন নির্দেশক এর বিপরীতে কোন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রাপ্ত সর্বোচ্চ মানকে মোট ১০০ ধরে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রাপ্ত মানকে আপেক্ষিকভাবে হিসাব করে স্কোর তৈরি করা হয় যদিও অনেক ক্ষেত্রেই ডাটা নর্মালাইজেশন এর দরকার হয়, সেটা করা হয় সুনির্দিষ্ট নিয়মে!

টাইমস হায়ার এডুকেশন এর র‍্যাঙ্কিং পদ্ধতি থেকে দেখা যায় তারা স্কোপাস ইন্ডেক্সড প্রকাশনাতে (শিক্ষক/গবেষক প্রতি প্রকাশনা সংখ্যা, সাইটেশন সংখ্যা, বৈদেশিক গবেষকদের সাথে যৌথ গবেষণায় প্রকাশনার সংখ্যা) সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে এবং যা র‍্যাঙ্কিং সংশ্লিষ্ট মোট স্কোরের ৩৮.৫%। তাই স্বাভাবিকভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাফিলিয়েশনে কিভাবে স্কোপাস ইন্ডেক্সড প্রকাশনা বাড়ানো যায় সেদিকে আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে। এর পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার সুনাম গুরুত্ব পাচ্ছে যা র‍্যাঙ্কিং সংশ্লিষ্ট মোট স্কোরের ৩৩%। আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের প্রতিষ্ঠান ও এর অর্জনকে তুলে ধরার পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যান্য নির্দেশক/সূচকে যাতে আমরা আরো ভাল করতে পারি তার বিভিন্ন মেয়াদি পরিকল্পনাও নিতে হবে। যেমন গবেষণা বরাদ্দ বাড়ানো, বিদেশি ছাত্র ভর্তি বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া, পি-এইচ, ডি ছাত্র বেশী ভর্তি করা ও যথাসময়ে ডিগ্রি প্রদানের উদ্যোগ নেয়া, ইন্ডাস্ট্রির সাথে সহযোগিতা বাড়িয়ে কিভাবে গবেষণা খাতে বেশি অর্থায়ন করা যায় তার উদ্যোগ সহ মাঝে মাঝে র‍্যাঙ্কিং সংশ্লিষ্ট সেমিনার এবং ওয়ার্কশপ আয়োজন করে করনীয় নির্ধারণ করা।

২০১৯–২০২০ এ  বিশ্ববিদ্যালয়ের  ইন্সটিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেল (আইকিউএসি)- এ অতিরিক্ত পরিচালক পদে কাজের সুযোগে (প্রায় ৯.৫ মাস) বিভিন্ন র‍্যাংকিং সংস্থার সাথে যোগাযোগ, এদের র‍্যাংকিং মেথডলজি নিয়ে উৎসুক  মনে টুকটাক ঘাটাঘাটি করতে গিয়ে সহকর্মী প্রফেসর ড. হারুন অর রশিদ, অতিরিক্ত পরিচালক,  আইকিউএসি কে নিয়ে পরিকল্পনা ও সে অনুযায়ী সামনের দিকে এগুতে থাকা,  ফিসারিজ ম্যানেজমেন্ট এর  প্রফেসর ড. হারুনুর রশিদ এর  স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহন আর মাননীয় ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. লুৎফুল হাসান স্যারের সার্বক্ষণিক  উৎসাহ, অনুপ্রেরণা এবং যে কোন প্রয়োজনে তাঁর তৎক্ষণাত কার্যকর ভুমিকায় এবং সকল সন্মানিত শিক্ষক সহকর্মীর অধিকতর কনট্রিবিউশনে মাত্র দুই বছরের প্রচেষ্টায় আজকের এই সফলতা। তবে এটা শুরু মাত্র। যেতে হবে বহুদুর!! আমাদের সম্পদের সীমাবদ্ধতার মধ্যেই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনায় এবং সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এগিয়ে যেতে হবে সামনের দিকে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. লুৎফুল হাসান সুযোগ্য ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বে আজকের এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তিনি বাকৃবি ‘র এই অবস্থানকে আরও সামনের দিকে এগিয়ে নিতে কাজ করে যাচ্ছেন।  শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই সহ সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় টাইমস হায়ার এডুকেশন এর পরবর্তী বছরে আমরা যাতে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারি এই প্রত্যাশা  সকলের। অভিনন্দন, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক-শিক্ষিকা, ছাত্র-ছাত্রী, কর্মকর্তা-কর্মচারি, অ্যালামনাই সহ বাকৃবি পরিবারের সকল সদস্যদের।

লেখকঃ প্রফেসর, ফসল উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগ ও পরিচালক, ফ্যাবল্যাব
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

  •  
  •  
  •  
  •